× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শাহরিয়ারের আলাদিনের চেরাগ নৌকা প্রতীক

রাজশাহী অফিস

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৬:১৪ পিএম

শাহরিয়ারের আলাদিনের চেরাগ নৌকা প্রতীক

২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলের একপর্যায়ে নির্বাচনী আলোচনা শুরু হলে দলীয় টিকিট পেতে বিএনপির এক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন শাহরিয়ার আলম। কিন্তু সুবিধা করতে না পেরে তরী ভেড়ান সমালোচিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের কাছে। ক্রীড়াঙ্গনে বিনিয়োগের সুবাদে তাদের মধ্যে সখ্য গড়ে উঠেছিল আগে থেকেই। তাই সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাজশাহী-৬ আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন পেতে তেমন কোনো কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তাকে। এর আগে শাহরিয়ারের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। এমনকি নির্বাচনী এলাকা বাঘা-চারঘাটসহ রাজশাহীতেই তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অপরিচিত মুখ।

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে শাহরিয়ার আলমের কোনো জমি ছিল না। ক্ষমতায় বসে তিনি একরের পর একর জমির মালিক বনে গেছেন। রাজশাহীর পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষি ও বাণিজ্যিক জমিসহ অ্যাপার্টমেন্ট গড়েছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পরিচয় কাজে লাগিয়ে ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছেন রাশিয়া, চীনসহ পশ্চিমা দেশসমূহে। শাহরিয়ারের পাশাপাশি শিক্ষার্থী দুই সন্তানও গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। যার সবই তার নির্বাচনী হলফনামায় দেওয়া রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এর বাইরেও শাহরিয়ার নামে-বেনামে সম্পদ গড়েছেন। যেসব তথ্য তার হলফনামায় দেওয়া নেই।

২০০৮ সালের হলফনামা অনুযায়ী, কৃষি, ব্যবসা, ও সম্মানী ভাতা থেকে বার্ষিক প্রায় কোটি টাকা আয় শাহরিয়ার আলমের। বায়িং হাউস, গার্মেন্টসসহ ফুড ইন্ডাস্ট্রির মতো ১৯টি প্রতিষ্ঠানের তিনি এমডি, চেয়ারম্যান নয়তো স্বত্বাধিকারী। ঋণ ছিল প্রায় সোয়া তিন কোটি টাকার। নগদ ও ব্যাংকে ছিল প্রায় দুই কোটি টাকা। তবে এ সময় তার স্ত্রী ও সন্তানের তেমন কোনো সম্পদ ছিল না।

সময়ের ব্যবধানে শাহরিয়ারের সন্তানদের সম্পদ ও আয় বেড়েছে কয়েকশ গুণ। দুই ছেলে সাদমান ও আহনাফের ব্যাংকে রয়েছে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা। এছাড়া দুই সন্তানের নামে রয়েছে পৌনে দুই কোটি টাকার শেয়ার।

২০২৩ সালে শাহরিয়ার তার বার্ষিক আয় দেখান প্রায় ৮ কোটি টাকা। বিভিন্ন কোম্পানিতে শেয়ারের মাধ্যমে তিনি বিনিয়োগ করেছেন প্রায় সাড়ে ৬৬ কোটি টাকা। নগদ টাকা রয়েছে প্রায় সাড়ে ২১ কোটি। কৃষি ও অকৃষি জমি গড়েছেন প্রায় ১৭ একর। এছাড়া ঢাকার গুলশানে নিজের নামে দুটি, সন্তানের নামে একটি এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে নিয়েছেন ৩ হাজার ৬০০ বর্গফুটের রাজকীয় ফ্ল্যাট। অথচ ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া হলফনামার তথ্যমতে, তখন শাহরিয়ার আলমের স্থাবর কোনো সম্পদই ছিল না। সন্তানদের নামেও ছিল না উল্লেখ করার মতো কোনো সম্পদ। তার বাবা মো. শামসুদ্দিন রেলের কর্মচারী ছিলেন। শাহরিয়ারের বারিন্দ মেডিকেল কলেজটি তিনিই দেখভাল করেন।

২০১০ সালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চৌধুরীহাট বাজারের পূর্বপাশে ২৫ বিঘা জমি কেনেন শাহরিয়ার আলম। নাম দেন নর্থ বেঙ্গল অ্যাগ্রো ফার্মস লিমিটেড। এই কেনা জমির সঙ্গে আরও প্রায় ১০ বিঘা দখল করে বাগানবাড়ি করেন তিনি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই সম্পদ দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেন তিনি। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার গোগ্রাম ইউনিয়নের বসন্তপুর মোড়ের পাশেও এক দাগে ৪০ বিঘা জমি কেনেন শাহরিয়ার। জমির মালিক ছিলেন বাঘা উপজেলার বাঘা পেট্রোল পাম্পের মালিক গোলাম মোস্তফা। তার অভিযোগ, মূল্য পরিশোধ না করেই শাহরিয়ার জমির দখল নিয়েছেন। লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায়ও ২০১৭ সালে ১৩ বিঘা জমি কেনেন শাহরিয়ার আলম।

বাঘা ও চারঘাট এলাকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঘা-চারঘাট এলাকায় শাহরিয়ারের কথাই ছিল শেষ কথা। নিজের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে তিনি যেমন বিরোধী দলের নেতাদের দমন করেছেন, ঠিক তেমনই আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মীকে নির্যাতন করেছেন। এ কাজে তিনি পুলিশ বাহিনীকেও অবৈধভাবে কাজে লাগাতেন। নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে নেতা বানাতেন। এভাবে তিনি আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়িয়েছেন। এলাকায়ও পোশাক কারখানা স্থাপনসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে স্বল্পমূল্যে কিনেছেন কোটি কোটি টাকার জমি।

বাঘা এলাকার গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘ন্যাশনাল ব্যাংক গোদাগাড়ী শাখায় আমার ৬ কোটি টাকা ঋণ ছিল। ঋণ পরিশোধ করতে জমি বিক্রির উদ্যোগ নিই। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যক্তির সঙ্গে সাড়ে ১১ কোটি টাকা দাম চূড়ান্ত করে বায়নানামাও নিই। সেকথা জানতে পেরে শাহরিয়ার আলম বলেন, জমিটা তিনি কিনবেন। তিনি ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে ৬ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেন এবং আমাকে নগদ ৫০ লাখ টাকা দিয়ে জমিটা রেজিস্ট্রি করে নেন। কথা ছিল বাকি ৫ কোটি কয়েক দিনের মধ্যেই পরিশোধ করবেন। কিন্তু পরে তিনি আর টাকা দেননি।’

চারঘাটের একমাত্র সিনেমা হল (লিলি সিনেমা হল) ছিল চারঘাট-বাঘা আঞ্চলিক মহাসড়কের মেরামতপুর এলাকায়। ২০১৪ সালে শাহরিয়ার প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর বল প্রয়োগ করে নামমাত্র মূল্যে সিনেমা হলের জায়গাটি কিনে সেখানে গার্মেন্টস গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। ২০২২ সালে চারঘাট সদরে উপজেলা ভূমি অফিসের পূর্বপাশে বিশ্বনাথ রমেকার কাছ থেকে ৩৩ শতাংশ জমি কেনেন তিনি। এ ছাড়া বাঘা, লালপুর ও ঈশ্বরদীতে বিভিন্ন নামে-বেনামে তার আরও জমি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে।

নাটোরের লালপুরে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার কন্যা সিলভিয়া পারভীন লেনিকে দ্বিতীয় বিয়ে করে প্রথম স্ত্রী আয়েশা আক্তার ডালিয়াকে তালাক দেন শাহরিয়ার। এরপর দ্বিতীয় স্ত্রী লেনির মা রোকসানা মর্ত্তুজা লিলিকে ২০২১ সালে প্রভাব খাটিয়ে তিনি মেয়র বানান। স্ত্রীকে সেখানে বিশাল বাড়ি করে দিয়েছেন। উপহার দিয়েছেন ঢাকার গুলশানে শেখ রেহানার বাড়ির সামনে ৩ হাজার ৬০০ স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাট। 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ২০০৮ সালে এমপি হওয়ার পর শাহরিয়ার তার এপিএস সিরাজুল ইসলামের মাধ্যমে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন টিআর-কাবিখাসহ সরকারি সব অনুদান ও প্রকল্প। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগেও করেন বাণিজ্য। চাকরি, বদলিসহ বিভিন্ন কাজেও এপিএসের মাধ্যমে নেন মোটা অঙ্কের টাকা।

এপিএসের মাধ্যমে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম পর্যায়ে চারঘাটে ১১৮ টন গম/চালের আওতায় ১৮ প্রকল্প ও বাঘা উপজেলা ২২ প্রকল্পের বিপরীতে ১৬৮ টন চাল/গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। একইভাবে দ্বিতীয় পর্যায়ে বরাদ্দ দেওয়া হয় আরও ২৫০ টন চাল/গম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাঘা-চারঘাট এলাকায় ২৩০ প্রকল্পের আওতায় দুই পর্যায়ে ৬০০ টন চাল/গম বরাদ্দ করা হয়। এভাবে গত ২০২২-২৩ অর্থবছরেও দুই পর্যায়ে ৫২টি প্রকল্পের আওতায় চারঘাট ও বাঘা উপজেলায় ১০০ টন চাল/গম বরাদ্দ হয়। প্রতিবছরই প্রায় ১ কোটি টাকা হারে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশে। কিন্তু সিংহভাগ বরাদ্দই তছরুপ হয়েছে।

ঠাকুরগাঁওয়ে শাহরিয়ার আলমের বাগানবাড়িতে পুকুর ও বাগানের পাশাপাশি আবাদ হয় ধান, লাউ, পেঁপে, আম, সুপারি, ড্রাগনসহ নানা সবজি। রয়েছে বিভিন্ন জাতের বনসাই। সালন্দর ইউনিয়নের শিংপাড়ার বাসিন্দা জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘এ বাগানবাড়িতে এলাকার কোনো মানুষ কোনো দিন ঢুকতে পারেনি। এটা বলে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর জায়গা। এই এলাকার কয়েকজন মানুষের জমি ন্যায্যমূল্য না দিয়ে ভয় দেখিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা চাই, যাদের জমি জবরদখল করে নেওয়া হয়েছে, তাদের ফেরত দেওয়া হোক, না হয় ন্যায্যমূল্য দেওয়া হোক।’ আরেক বাসিন্দা মজিবর রহমান বলেন, ‘সরকারি জমিও এই বাগানবাড়ির ভেতরে আছে। সেখানে পুকুর খনন করা হয়েছে। এলাকার মানুষ ভয়ে কথা বলেনি এতদিন।’

সালন্দর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলে এলাহী মুকুট চৌধুরী বলেন, ‘বাগানবাড়িটি বানানো হয় ২০১০ সালে। স্থানীয় কিছু লোকের জমি ও সরকারি কিছু জমি নিয়ে এটা বানান সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।’

নর্থ বেঙ্গল অ্যাগ্রো ফার্মস নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রতিমন্ত্রীর বাগানবাড়িতে। সেটির ম্যানেজার তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের এ পরিস্থিতিতে প্রতিমন্ত্রীর লোকজন তেমন আর খোঁজখবর নেন না এখানকার।’ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে প্রতিমন্ত্রী গা ঢাকা দেন এবং ভারত চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠরা। তার এপিএস সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা