× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেননি শামীম ওসমান তার পরিবার ও অনুসারীর অনেকে

নারায়ণগঞ্জ (শহর) প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১২:৪৪ পিএম

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৩:৩৮ পিএম

আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেননি শামীম ওসমান ও তার পরিবারের সদস্যরা। প্রবা ফটো

আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেননি শামীম ওসমান ও তার পরিবারের সদস্যরা। প্রবা ফটো

গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লুট হওয়া এবং গত ১৫ বছরে লাইসেন্স দেওয়া সব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেওয়ার সময় বেঁধে দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সে সময়ের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলায় জমা পড়েছে ১৩৬টি আগ্নেয়াস্ত্র। তবে এখনও জমা পড়েনি ৫৫টি আগ্নেয়াস্ত্র। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান, তার পরিবার ও অনুসারী সদস্যদের কাছে থাকা অন্তত অধিকাংশ আগ্নেয়াস্ত্র জমা পড়েনি। এসব অস্ত্র অবৈধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসনসূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলায় ৭৩৭টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত টানা চার মেয়াদে মোট ৩২১টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে দেওয়া ১৯১টি অস্ত্রের লাইসেন্স স্থগিত করেছে জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে ১০২টি শটগান ও বন্দুক, ৬৭টি পিস্তল, ১৪টি রাইফেল ও আটটি রিভলবার। এ সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে জেলার বিভিন্ন থানায় ১৩৬টি অস্ত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এখনও ৫৫টি অস্ত্র জমা পড়েনি।

অস্ত্র জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন শামীম ওসমান, তার ভাই সেলিম ওসমান, ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন ও শ্যালক তানভীর আহম্মেদ টিটু। অস্ত্র জমা না দেওয়ার তালিকায় নাম রয়েছে এ আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য সারাহ বেগম কবরীরও।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গত বছরের ১৮ অক্টোবর শামীম ওসমানের নামে পয়েন্ট ২২ বোরের একটি রাইফেলের লাইসেন্স দেওয়া হয়। তিনি এ রাইফেলের লাইসেন্স একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর নবায়নও করেছেন। গত বছরের ২৬ অক্টোবর একটি এনপিবি পিস্তলের লাইসেন্স নেন তিনি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণার পর বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে অস্ত্র দুটি জমা দেননি। সে কারণে তার অস্ত্র দুটি অবৈধ হিসেবে বর্তমানে জেলা প্রশাসনের তালিকায় তালিকাভুক্ত হয়েছে।

তার ভাই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমানও তার আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেননি। ২০২০ সালের ১ মার্চ তার নামে একটি পিস্তল ইস্যু করা হয়। তার নামে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আরেকটি পিস্তলের লাইসেন্সও দেওয়া হয়। সেটিও তিনি জমা দেননি।

শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন এখনও তার শটগানটি জমা দেননি।

তার শ্যালক ও বিসিবির সাবেক পরিচালক তানভীর আহম্মেদ টিটুর নামে ২০১৫ সালের ১৫ নভেম্বর পয়েন্ট ২২ বোরের একটি রাইফেলের লাইসেন্স দেওয়া হয়। গত বছরের ৫ নভেম্বর পয়েন্ট ২২ বোরের একটি এনপিবি পিস্তলেরও লাইসেন্স পান তিনি। অস্ত্র দুটি তিনি এখনও জমা দেননি।

শামীম ওসমানের বেয়াই (ছেলের শ্বশুর) ফয়েজউদ্দিন আহমেদ লাভলুও তার লাইসেন্সপ্রাপ্ত শটগানটি এখনও জমা দেননি।

১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন শামীম ওসমান ও তার বাহিনী। তার নেতৃত্বে বাহিনীর সদস্যদের গুলি করার একটি ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়েছে। ওইদিন শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন, শ্যালক টিটু, বেয়াই লাভলু, তার ছেলে মিনহাজুল আবেদীনসহ বাকি অনুসারীদের গুলি করতে দেখা গেছে।

শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক শাহ নিজাম ও যুবলীগ ক্যাডার নিয়াজুল ইসলাম খানও সেদিন গুলি চালান। এর আগে ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি হকার ইস্যু কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে লক্ষ করে গুলি চালান নিজাম ও নিয়াজুল। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলা থেকে তাদের দুজনকে পুলিশ অব্যাহতি দিলেও গত বছরের সেপ্টেম্বরে নিয়াজুলের পিস্তলের লাইসেন্স বাতিল করেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাহমুদুল হক।

এ ছাড়া শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমান ও তার বাহিনীর কাছেও একাধিক অবৈধ অস্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রায়ই তারা অস্ত্রহাতে শহরে মহড়া দিতেন। যদিও আজমেরী ওসমানের কোনো অস্ত্রের লাইসেন্স ছিল না। গত বছর তিনি জেলা প্রশাসনের কাছে একটি শটগান ও পিস্তলের লাইসেন্সের আবেদন করলেও অনুমোদন পাননি।

অন্যদিকে সারাহ বেগম কবরীর নামে ২০১৩ সালের ২৭ মে একটি রিভলবারের লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। এটি বর্তমানে জেলা প্রশাসনের অবৈধ ঘোষিত তালিকায় রয়েছে।

অস্ত্র জমা না দেওয়ার তালিকায় আছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, তার স্ত্রী তারাব পৌরসভার সদ্যসাবেক মেয়র হাছিনা গাজী, বড় ছেলে গাজী গোলাম মুর্তজা ও ছোট ছেলে গাজী গোলাম আসরিয়াও। ২০১৭ সালে তাদের নামে চারটি শটগানের লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। তাদের নামে পিস্তলের লাইসেন্সও ছিল। পিস্তলগুলোও তারা জমা দেননি।

রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আরিফুল হক ভূঁইয়াও তার নামে ইস্যু করা পয়েন্ট ২২ বোরের পিস্তলটি জমা দেননি। তিনি ২০১৩ সালের ৪ এপ্রিল অস্ত্রটির লাইসেন্স পেয়েছিলেন। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর এটি নবায়নও করেন।

অস্ত্র জমা দেননি জাতীয় পার্টির নেতা ও ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন। তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি। নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে তার নামে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল একটি শটগানের লাইসেন্স দেওয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, ‘যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেননি, তাদের ওই অস্ত্রগুলো অবৈধ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ অভিযান চলছে।’

আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিয়েছেন যারা

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর গত ১৫ বছরে নারায়ণগঞ্জে যাদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠজন। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপন করেন। নেতাদের মধ্যে অনেকে বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলে খবর রয়েছে। তবে অনেকে তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে থানায় অস্ত্র জমা দিয়েছেন।

অস্ত্র জমা দেওয়ার তালিকায় আছেন ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল। তার নামে থাকা এনপিবি পিস্তলটি তিনি জমা দিয়েছেন। ২০১৬ সালের ২৭ মার্চ তিনি এটির লাইসেন্স পান।

আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিয়েছেন বন্দর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টির নেতা এহসানউদ্দিন আহমেদ। তার নামে পয়েন্ট ২২ বোরের একটি রাইফেলের লাইসেন্স ছিল।

সোনারগাঁ উপজেলার সনমান্দি ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাহিদ হাসান জিন্নাহ তার পয়েন্ট ৩২ বোরের রিভলবারটি জমা দিয়েছেন। ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর তিনি অস্ত্রটির লাইসেন্স পান।

তবে তার নামে থাকা একটি বন্দুকও রয়েছে, সেটি তিনি জমা দেননি। ২০০৯ সালের ১২ জানুয়ারি আগ্নেয়াস্ত্রটির লাইসেন্স পেয়েছিলেন তিনি।

আড়াইহাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও গোপালদী পৌরসভার সদ্য সাবেক মেয়র এম এ হালিম সিকদার তার শটগানটি জমা দিয়েছেন। তাকে ২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর অস্ত্রটির লাইসেন্স দেওয়া হয়। তার নামে ইস্যু হওয়া পিস্তলটিও তিনি জমা দিয়েছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম আবু সুফিয়ান তার পয়েন্ট ৩২ বোরের পিস্তল জমা দিয়েছেন। ২০১০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর লাইসেন্স পান তিনি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও শামীর ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা অ্যাডভোকেট মোহসীন মিয়া তার শটগানটি জমা দিয়েছেন। তিনি ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অস্ত্রটির লাইসেন্স পান। ২০২১ সালের ১৮ মার্চ একটি এনপিবি পিস্তলের লাইসেন্স নেন তিনি। সেটিও জমা পড়েছে।

শামীম ওসমানের স্ত্রীর চাচাত ভাই ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এহসানুল হাসান নিপু তার শটগানটি জমা দিয়েছেন। ২০১৩ সালের ২২ আগস্ট তিনি সেটির লাইসেন্স পান। ২০১৮ সালের ২৬ আগস্ট তিনি একটি পিস্তলের লাইসেন্স নেন। এটিও তিনি জমা দিয়েছেন।

অস্ত্র জমা দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু, ছয় নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মতিউর রহমান ও আট নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রুহুল আমিন। তাদের তিনজনের নামেই শটগানের লাইসেন্স ছিল।

আব্দুল করিম বাবু তার পিস্তলটিও জমা দিয়েছেন। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর তিনি পিস্তলটির লাইসেন্স পেয়েছিলেন।

রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদ আলমাছ তার শটগানটি জমা দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি হত্যা মামলা থাকলেও ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আগ্নেয়াস্ত্রটির লাইসেন্স পান তিনি। নিজের লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র ছাড়াও অস্ত্রধারী তিন বডিগার্ড নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন আওয়ামী লীগের এই নেতা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা