আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:৪৭ এএম
আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৪:২০ পিএম
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করছেন টিম সন্দ্বীপের সদস্যরা। প্রবা ফটো
চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের ছোট্ট একটি ইউনিয়ন আজিমপুর। সেখানকার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নাম ‘এসো ঈদের খুশি বিলাই’। ঈদ উপলক্ষে নিম্ন আয়ের মানুষদের ঈদসামগ্রী দেওয়ার লক্ষ্যেই এই সংগঠনটি কাজ করে। ফেনীতে বন্যা হলে ওই এলাকার প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সংগঠনটির তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা ফেনীর জন্য খাদ্য সহায়তা নিলে প্রবাসীরা আর্থিক সহযোগিতা করবেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রবাসীদের জানানো হয়, সন্দ্বীপের সকল স্বেচ্ছাসেবী মিলে ‘টিম সন্দ্বীপ’ নামে একটি সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানে তারা টাকা দিয়ে দেবে। আজিমপুর প্রবাসী ঐক্য পরিষদ ও এসো ঈদের খুশি বিলাইÑ এই দুই সংগঠনের উদ্যোগে টিম সন্দ্বীপের ফান্ডে এক লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়।
শুধু এই দুই সংগঠনই নয়, ইরামন ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন থেকে দেওয়া হয় এক লাখ ত্রিশ হাজার, কালাপানিয়ার জুড়িধনপাড়া বায়তুর রহমত জামে মসজিদের মুসল্লি ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় ৪৭ হাজার ৫০২ টাকা, পূর্ব মাইটভাঙ্গা দুর্গা মন্দিরের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় ১০,৬৫০ টাকা। এভাবে সন্দ্বীপের শিল্পোদ্যোক্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে সম্মিলিতভাবে ফেনী ও নোয়াখালীর বন্যাদুর্গতদের জন্য গড়ে তোলেন একটি তহবিল। মাত্র এক সপ্তাহে যে তহবিলে জমা পড়েছে ২২ লাখ ৭১ হাজার ৯৩৩ টাকা। এর বাইরে বন্যার্তদের জন্য সন্দ্বীপের ব্যবসায়ীরা উপহার দেন ৩,৫৮৪ পিস নতুন জামা কাপড়, যার সর্বনিম্ন বাজারমূল্য সাড়ে ১২ লাখ টাকা। গাউসিয়া কমিটির পক্ষ থেকে দেওয়া হয় ৭০ কার্টন পানি। বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির তরফ থেকে ওষুধ ও স্যানেটারি ন্যাপকিন দেওয়া হয় টিমের সদস্যদের হাতে। সব মিলিয়ে সেসবের বাজারমূল্য দুই লাখ টাকার মতো বলে জানিয়েছেন টিমের সদস্যরা।
টিম সন্দ্বীপের উদ্যোগে মোট ৩৭ টনের মতো ত্রাণসামগ্রী নিয়ে তৈরি অর্ধশতাধিক স্বেচ্ছাসেবী। এই স্বেচ্ছাসেবীদের ব্যয় আবার বহন করতে হয়েছে নিজেদের পকেট থেকে। সংগৃহীত তহবিলের
কোনো টাকা তাদের জন্য খরচ করা হয়নি। দুই দিনে ফেনী ও নোয়াখালীর ১৫টি পয়েন্টে ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি পরিচালনা করে টিম সন্দ্বীপের স্বেচ্ছাসেবকরা। সোমবার চট্টগ্রামের একটি কমিউনিটি সেন্টারে অংশীজন ও সাংবাদিকদের সামনে আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরেন টিম সন্দ্বীপের সমন্বয়করা। সবার পক্ষে আয়-ব্যয় তুলে ধরেন হান্নান তারেক। তিনি বলেন, ‘তহবিল গঠন থেকে শুরু করে ত্রাণ প্যাকেট করা পর্যন্ত দুই শতাধিক তরুণ সক্রিয়ভাবে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছে। এর বাইরে সন্দ্বীপের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই তহবিল গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। সব মিলিয়ে এক হাজার আট পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার ও আরও এক হাজার মানুষের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে তহবিল থেকে। এই মুহূর্তে তহবিলে ৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা জমা আছে।’
তরুণদের এমন উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন মুন্না বলেন, ‘সব স্বেচ্ছাসেবীকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে এই ধরনের বড় পরিসরে কাজ করাÑ এটা খুবই অসাধারণ। সন্দ্বীপের মতো একটা জায়গার তরুণরা এখানে যে উদাহরণ তৈরি করল সেটা খুব আশা জাগানিয়া। সামনের দিনগুলোতে দুর্যোগ দুর্বিপাক মোকাবিলায় এসব কার্যক্রম একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে।’
এ সময় বন্যাদুর্গত এলাকা ঘুরে আসা স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেয়। সম্প্রতি প্রবাস থেকে আসা মাইন উদ্দিন ভুঁইয়া তাদের একজন। যিনি স্ত্রীর প্রসবকালীন সময়ে সঙ্গী হতে দেশে অবস্থান করছিলেন। ১৩ দিন আগে তিনি কন্যা সন্তানের জনক হয়েছেন। তবে টিম সন্দ্বীপের হয়ে ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিতে এর মধ্যেই দুই দিন নোয়াখালী অবস্থান করেন তিনি। আবেগঘন ভাষায় তিনি বলেন, ‘জীবনে কখনও এমন বিপর্যয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করিনি। প্রথমবার গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো তা ভাষায় বোঝাতে পারব না।
বেশিরভাগ বাড়িঘরই পানিতে ডোবা। মানুষজনের ঘরে খাবার নেই। বাইরে থেকে এনে খাওয়ার সুযোগ নেই। যে বাড়িতেই গেলাম, শিশু-নারীরা বের হয়ে আসছে। জিজ্ঞেস করছে তাদের জন্য কী এনেছি। অথচ সবাই অবস্থাপন্ন। একটা দুর্যোগ তাদের কী ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে সেটা নিজ চোখে না দেখলে হয়তো অনুভব করতে পারতাম না। আমি দুই দিনে বলতে গেলে অনেকটা না খেয়ে থেকেছি। কারণ সেখানে স্যানিটেশন ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে গেছে। সেখানকার মানুষগুলোকে এর সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে চলতে হচ্ছে।’
ফান্ডে থাকা অবশিষ্ট টাকা কী করা হবেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ ওমর ফারুক নামে আরেকজন স্বেচ্ছাসেবক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের তহবিলে টাকা নেওয়া বন্ধ। এই টাকাটা কীভাবে খরচ করা হবে তা এখনও ঠিক করা হয়নি। তবে তহবিলে নতুন টাকা আর নেওয়া হবে না। সবার সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তীতে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’