ভিডিও ভাইরাল
সাভার প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ১৬:৩২ পিএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ১৮:২০ পিএম
ভ্যানে নিথর দেহের স্তূপ ভাইরাল সেই ভিডিওটি আশুলিয়ার। ছবি : সংগৃহীত
একটি ভ্যানে স্তূপ রাখা কয়েকটি লাশ। সড়কে পড়ে থাকা আরও একটি লাশ তুলছে দুই পুলিশ সদস্য। এমন একটি ভিডিও সারা দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়। পর্যবেক্ষণ দেখা যায়, ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে সাভারের আশুলিয়া থানা ফটকে। ভিডিওতে থাকা একটি পোস্টার ও দেয়ালের চিহ্ন আশুলিয়া থানার সামনেই ভিডিও বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
শনিবার (৩১ আগস্ট) সকালের দিকে আশুলিয়া থানার সামনে গিয়ে ঘটনাস্থলের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর হুবহু মিল পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণার সঙ্গে যথেষ্ট মিল রয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) থেকে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়। ধারণা করা হচ্ছে, আশুলিয়া থানার বিপরীত পাশে অবস্থিত বাচ্চু মিয়ার মালিকানাধীন ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে ধারণ করা হয়েছে।
ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, দুজন পুলিশ সদস্যের একজন হাত ও একজন পা ধরে ভ্যানে নিক্ষেপ করছেন। এর আগেই ভ্যানে লাশের স্তূপ করে কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয় তারা। সর্বশেষ লাশটি তুলে একটি ব্যানার দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। ভিডিওটির শেষের দিকে পুলিশ সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এর মাঝে ভিডিওটির ১ মিনিট ৬ সেকেন্ডে স্থানীয় যুবলীগের ধামসোনা ইউনিয়ন সভাপতি ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থী আবুল হোসেনের একটি পোস্টার দেখা যায়।
ভিডিওটির ঘটনাস্থল নিশ্চিতে আশুলিয়া সামনে গিয়ে দেখা যায়, আশুলিয়া প্রেস ক্লাবের পেছনের সড়ক ও নবীনগর চন্দ্রা মহাসড়কের থানা রোড দিয়ে চার সড়কের থানা সামনেই ঘটনা বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। এসবি অফিসের দিকে যাওয়ার সময় ডান পাশের যুবলীগ নেতার ছবি সংবলিত পোস্টারটি এখনও থাকায় হুবহু ভিডিওর সঙ্গে মিলে যায়। এমনকি দেয়ালে পোস্টারের চিহ্ন রয়েছে। থানা থেকে মহাসড়কের দিকে যেতে বামপাশের দেয়ালের অবয়ব ভিডিওটির সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। এ ছাড়া ভিডিওটিতে দেখা বালুর বস্তাগুলো সরিয়ে ফেলা হলেও ৬ই আগস্ট বালুর বস্তা দেখা গেছিল। থানার সামনে চৌরাস্তায় এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। থানার সামনের দ্বিতল বাড়ির কোনো একটি কক্ষের জানালা থেকে ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে। তবে ওই বাড়ির একাধিক ভাড়াটিয়ার সঙ্গে কথা বললেও ভিডিওর ব্যাপারে জানা যায়নি।
ভিডিওটি ঢাকা জেলা উত্তর ডিবি পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) আরাফাত হোসেনকে চিহ্নিত করা গেছে।
এ ছাড়া স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও একটি মামলার বাদীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শেষ সময়ে থানায় হামলা চালায়। সে সময় পুলিশ সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে। এ সময় কয়েকজন আন্দোলনকারী মারা গেলেও খোঁজ পাওয়া যায়নি তাদের। পরবর্তীতে ৬ আগস্ট সকালে একটি পিকআপে পুড়ে যাওয়া কয়েকজনের মৃতদেহ খোঁজ মিলে। ধারণা করা হচ্ছে ভাইরাল ভিডিওটিতে দেখা লাশগুলো গুম করতে পুলিশ পিকআপে তুলে পুড়িয়ে দেয়। তবে অনেকের লাশ অতিরিক্ত পুড়ে যাওয়ায় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া পুড়ে যাওয়া মৃতদেহের হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো ছিল।
এ সংক্রান্ত আশুলিয়া থানায় একটি মামলা করেন মোসা. রাহেন জান্নাত ফেরদৌস। মামলায় উল্লেখ করেন গত ৫ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনে নিখোঁজ হয় তার ছেলে আস-সাবুর। পরদিন পুড়ে যাওয়া লাশের পকেটে থাকা মোবাইল সিমের সূত্র ধরে আবু সাবুর পরিচয় নিশ্চিত হয়।
তিনি বলেন, আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যার পর গুম করার উদ্দেশ্যে পুলিশ সদস্যরা পুড়িয়ে ফেলে। যখন ছেলের লাশ আনতে যায় তখন আরও কয়েকজনের পুড়ে যাওয়া লাশ দেখতে পান। যাদের চেহারা বুঝার কোনো উপায় ছিল না।
পুড়ে যাওয়া লাশের পাশে আইডি কার্ড দেখে শনাক্ত করা হয় সাজ্জাদ হোসেন সজলের মা শাহিন বেগম। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত মোবাইল ফোনে কথা হয় সাজ্জাদের সঙ্গে। পরে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তার পরদিন সকালে থানার সামনে পুড়ে যাওয়া লাশের সঙ্গে থাকা আইডি কার্ড দেখে শনাক্ত হয় সাজ্জাদের মৃতদেহ।
তিনি আরও বলেন, সেখানে আরও ৬ থেকে ৭টা লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। তাদের মধ্যে ছয়টি পোড়া লাশ দেখতে পান তিনি।
এ ছাড়া তানজিল মাহমুদ সুজয়কে তার মামা মাজেদুল ও বাইজিদকে তার স্ত্রী রিনা আক্তার লাশ শনাক্ত করেন। তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সবাই ৫ আগস্ট বিকাল থেকে সন্ধ্যায় নিখোঁজ হয় তারা। পরদিন আইডি কার্ড ও মোবাইল সিম সূত্র ধরে লাশ শনাক্ত হয়।
স্থানীয় দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট সকাল থেকেই নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইল এলাকায় জড়ো হতে থাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীরা। শেখ হাসিনার দেশ-ত্যাগের খবরে আন্দোলনকারীরা থানার চারপাশ দিয়ে ঘিরে ফেলে। এ সময় পুলিশ মসজিদের মাইক ও হ্যান্ডমাইক দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণের পরেও আন্দোলনকারীরা থানার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এ সময় পুলিশ গুলি চালাতে থাকে। তখন তারা দোকান বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে সরে যান।
আশুলিয়া থানার বিপরীতে অবস্থিত বাড়ির মালিক রাশিদা বেগম বলেন, আমরা বেলা ৩টা ২০ মিনিটে গুলির শব্দ শুরু হয়। এখানে অনেক মানুষ এসেছিল। মানুষ মরে পড়ে থাকতে দেখছি। তবে কখন গোলাগুলি শেষ হয়েছে বলতে পারব না।
থানা ফটকের পাশে থাকা বাইপাইল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, সেদিন দুপুরের পর থেকে মসজিদে আসতে পারেনি। এশার নামাজ হয়েছিল। পরদিন সকালে পুড়ানো ছয়টি মৃতদেহের জানাজা পড়ানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে আশুলিয়া থানার একাধিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে কেউ মুখ খুলেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, বিকাল ৪টার দিকে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। বিকাল ৪টার দিকে থানায় হামলার চেষ্টা করে আন্দোলনকারীরা। এ সময় পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। তিনি বিকাল পৌঁনে ৪টা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে ছিলেন। তবে ঘটনা দেখেননি বলে জানান।
এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আরাফাত হোসেনের সঙ্গে একাধিবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার আহম্মদ মুঈনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আজ সকালে ভিডিওটি আমি দেখেছি। এটি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আপনারা যেহেতু মিডিয়ায় কাজ করেন, কোনো তথ্য কিংবা সূত্র পেলে আমাদের সহযোগিতা করার অনুরোধ করছি।
বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলনকারীরা ৫ আগস্ট নবীনগর চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইল এলাকায় জমায়েত হতে থাকেন। পরে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে আন্দোলনকারীরা আশুলিয়া থানার দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় পুলিশ আন্দোলনকারীদের লক্ষ করে গুলি ছুড়ে পুলিশ। এ ঘটনায় ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়।