গাজী টায়ার কারখানায় আগুন
নারায়ণগঞ্জ ও রূপগঞ্জ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৪ ২১:২৪ পিএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৪ ২১:৪৩ পিএম
গাজী টায়ার কারখানায় আগুনের ঘটনায় নিখোঁজদের সন্ধানে কারখানার সামনে ভিড় করেন স্বজনরা। প্রবা ফটো
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসীতে অবস্থিত গাজী টায়ার কারখানায় আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) ভোর পাঁচটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও অতিরিক্ত তাপে বিকাল থেকে ছয় তলা ভবনটির কোথাও কোথাও আবার আগুন জ্বলতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তা বাড়ছিল।
এই অবস্থায় সন্ধ্যা ৬টায় ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘ভবনটির ভেতরে কয়েকটি স্থানে এখনও আগুন জ্বলছে। আমরা তা নেভাতে কাজ করছি। আগুন নেভানোর আগ পর্যন্ত ভবনটির ভেতরে প্রবেশ করা যাচ্ছে না।’
এদিকে আগুন লাগার ৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও নিখোঁজদের উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা।
এমন পরিস্থিতিতে নিখোঁজদের স্বজনরা কারখানার বাইরে ভীড় জমাতে দেখা গেছে। তারা বলছেন, অন্তত স্বজনদের মৃতদেহ পেতে চান। উদ্ধার কাজ শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে তাদের।
এ পর্যন্ত ১৭৬ জন নিখোঁজের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (সন্ধ্যা ৭টা) ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে নিখোঁজদের বিষয়ে কোন সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের উদ্যেগে এবং থানা পুলিশের উপস্থিতিতে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা স্বজনদের কাছ থেকে নিখোঁজদের নাম পরিচয় নিয়ে তালিকা তৈরি অব্যাহত রেখেছেন।
নাম না প্রকাশ শর্তে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবনটিতে দীর্ঘসময় ধরে আগুন জ্বলার কারণে ভবনটি ধসের সম্ভাবনা রয়েছে। আগুন না নেভানো পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনে প্রবেশ করতে পারছে না। তবে, তারা আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। নিয়ন্ত্রণে এলে উদ্ধার অভিযান শুরু হবে বলে জানান তারা।
এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক আনোয়ারুল হক জানান, মঙ্গলবার ভোর পাঁচটার দিকে আগুন নেভাতে সক্ষম হয়েছেন তারা। কিন্তু এখনও ভবনের ভেতরে হিট (উত্তাপ) আছে। অল্প অল্প করে আগুন জ্বলছে। ভবনটি নাজুক অবস্থায় থাকায় এখন পর্যন্ত ভেতরে ঢুকে উদ্ধার অভিযান শুরু করা যায়নি। নিচতলার সিড়ি পর্যন্ত ঢোকা গেছে কেবল।
টার্ন টেবিল ল্যাডার (টিটিএল) এর সাহায্যে ভবনটির ছাদে এক দফায় তল্লাশি চালানো হয়েছে জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মকর্তা বলেন, ছাদের কোনো অংশে হতাহত কাউকে পাওয়া যায়নি। ভবনের ভেতরে ঢোকা সম্ভব হয়নি। আগুনটা যেহেতু নেভাতে পেরেছি, সবকিছু বিবেচনা করে ভেতরে উদ্ধার অভিযান শুরু করব।
এদিকে মঙ্গলবারও কারখানার বিভিন্ন অংশে দুর্বৃত্তদের লুটপাট করতে দেখা যায়। পরে লুটপাটসহ সকল ধরনের অরাজকতা বন্ধ করতে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেন।
গাজী টায়ার কারখানায় আগুনের ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে ৮ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে গাজী টায়ার কারখানায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হক সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কমিটিতে বিদ্যুৎ, কলকারখানা, ফায়ার সার্ভিসসহ সব বিভাগের প্রতিনিধি রয়েছে।
কারখানা পরিদর্শন শেষে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হক বলেন, ৮ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহসান মাহমুদ রাসেলকে নির্দেশ দিয়েছি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের একটি তালিকা তৈরি করতে। ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘গাজী টায়ারের যে ভবনটি সে ভবনের ভেতরে সালফারসহ ক্যামিকেল থাকার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও তাপ ও ধোঁয়া রয়ে গছে। এ কারণে উদ্ধার কাজ চালানো যাচ্ছে না। খুব দ্রুত উদ্ধার কাজ শুরু করা হবে। নিখোঁজদের একটি তালিকা তৈরি করা হবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।’
গাজী টায়ার কারখানার মালিক নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। রবিবার ভোরে রাজধানীর শান্তিনগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন আওয়ামী লীগের এই নেতা। তার গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে রবিবার দুপুরে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন কারখানার ভেতরে ঢুকে লুটপাট শুরু করেন। বিকাল চারটার দিকে বরাব এলাকা থেকে একটি গ্রুপ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসে পুরো কারখানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। এ নিয়ে আগে থেকেই লুটপাট চালানো দুর্বৃত্তদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। পরে অস্ত্রধারীরা পিছু হটে। রাত নয়টার সময় বিদ্যুৎহীন অন্ধকার ছয়তলা ভবনটিতে শত শত লোক লুটপাট চালাতে থাকেন। এ সময় কে বা কারা ভবনের নিচতলায় সিঁড়ির মুখে আগুন দেয়। এতে ভবনটির ভেতরে থাকা অনেকেই আটকা পড়েন। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট কাজ করে।
গাজী টায়ার কারখানা সূত্রে জানা যায়, আগুনে পোড়া ছয়তলা ভবনটি মূলত তাদের কারখানার কাঁচামালের গোডাউন হিসেবে ব্যবহার হতো। আগুন লাগার সময় গোডাউনটিতে প্রচুর পরিমাণে রাবার ও রাসায়নিক মজুত ছিল।
গাজী টায়ার্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খাদুন এলাকার প্রায় ৪৫ একর জায়গাজুড়ে কারখানাটির অবস্থান। ভেতরে শেডসহ অন্তত ১৬টি স্থাপনা রয়েছে। কারখানাটিতে প্রায় প্রায় চার হাজার শ্রমিক কাজ করত।
এর আগে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গাজী টায়ার্স ও কর্ণগোপ এলাকার গাজী পাইপে আগুন দেওয়া হয়। সে সময় টানা চার দিন ধরে কারখানা দুটি আগুনে পোড়ে। লুটপাট করা হয় কারখানা দুটিতে। এ ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে মামলা না নেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন গোলাম দস্তগীর। দীর্ঘ সময় পর এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি নেওয়া হয়।