এস এম রানা ও হুমায়ুন মাসুদ
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৪ ১৫:৪৫ পিএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৪ ১৫:৪৭ পিএম
‘পাঁচ দিন ধরে বন্যার পানিতে ডুবে আছে ঘর। আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছি। সেখানে বিস্কুট-চিড়া খেয়েছি। কিন্তু পাঁচ দিন ধরে ভাত খাই না। ভাতের ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। কিছু চাল-ডাল দেবেন? তাহলে ভাত খেতে পারতাম।’
এভাবেই চাল-ডালের জন্য আকুতি জানিয়েছেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার পশ্চিম ভগবতীপুর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্র যারা ত্রাণ নিয়ে আসছেন, তাদের আমরা দলবদ্ধভাবে সহযোগিতা করছি। আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবার আছে। কিন্তু কয়দিন আর বিস্কুট-মুড়ি খাব? আমরা কৃষক মানুষ। ভরপেট ভাত না খেলে চলে না। তাই চাল-ডাল চাইছি।’
ভাতের এমন ক্ষুধা শুধু শাহজাহানের নয়, সেখানে থাকা সবারই। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নারায়ণ চন্দ্র দাশও জানালেন ভাত খেতে না পেয়ে তার কষ্টের কথা। গত পাঁচ দিন ধরে আশ্রয়কেন্দ্রে তিনিও কেবল বিস্কুট-মুড়ি খেয়ে কাটিয়েছেন। এগুলোই ত্রাণ হিসাবে আসে। নারায়ণ বলেন, শ্রমিকের পেটের ক্ষুধা কি ভাত ছাড়া যায়।’
তবে চাল-ডাল পেলে রান্না কীভাবে হবে সেটা অবশ্য জানেন না তারা। কারণ এখন কোথাও রান্না করার মতো অবস্থা নেই। গ্রামের অনেক মানুষের ঘরের উনুন এখনও পানির নিচে। কারও কাঁচাঘর হয়ে গেছে নড়বড়। কারও ঘর টিকে থাকলেও রাস্তা ডুবে আছে কোমর পানির নিচে।
এখনও অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে মিরসরাই উপজেলার ছয় ইউনিয়নের কয়েক হাজার বন্যাদুর্গত মানুষ। তবে পানি সরে যেতে শুরু করায় অনেক গ্রামের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। ভাটি এলাকায় এখনও পানি রয়ে গেছে। আশ্রয়কেন্দ্রের সব মানুষ তাই বাড়ি ফিরতে পারেনি।
ভগবতীপুর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, জোরারগঞ্জ থেকে মুহুরী প্রজেক্টে যাওয়ার প্রধান সড়কটি বন্যায় প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। সড়কের গর্ত এত বেশি বড় হয়েছে যে, গাছের গুঁড়ি ফেলতে হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হামিদ বলেন, ‘মুহুরি প্রজেক্ট পর্যন্ত পৌঁছতে একাধিক জায়গায় পানিতে ভাসতে হবে। তারপরও পৌঁছানো যাবে কি না সন্দেহ।’
বিষুমিয়ার হাট এলাকায় দেখা যায়, সড়কের অনেক স্থানে গোড়ালি থেকে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে আছে। কিছু সড়ক জেগে উঠলেও সেগুলোর অবস্থা শোচনীয়। সড়কের বুকে বড় বড় গর্ত। গাড়ি চলাচলের প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সেগুলো। পাশের তাজপুর গ্রামে দেখা যায়, ঘরগুলোতে এখনও হাঁটুপানি। গ্রামের মানুষ আশ্রয় নিয়েছে তাজপুর অলি আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শুরুতে সাত শতাধিক লোক আশ্রয় নিলেও সোমবার দুপুর পর্যন্ত ছিল অন্তত ২৫০ জন। যাদের বেশিরভাগই নারী, বৃদ্ধ ও শিশু।
আশ্রয়কেন্দ্রে মা-বাবা ও ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আশ্রয় নেওয়া মোজাম্মেল হোসেন দুলাল বলেন, ‘গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে বাড়িতে পানি উঠতে শুরু করে। ওই দিন রাতে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে। পরে বৃহস্পতিবার পানি বেড়ে বুক সমান হয়। ঘরে পানি ঢোকার পরপরই সপরিবারে আশ্রয়কেন্দ্রে আসি। সেই থেকে এখানে আছি। পানি পুরোপুরি নামেনি। আজ (সোমবার) সকালে ঘরে গিয়ে দেখি, ভিটায় পানি জমে আছে।’
অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে আশ্রয়ে আসা ৭৫ বছর বয়সি বৃদ্ধ মানিক মেম্বার বলেন, ‘জন্মের পর এমন বন্যা দেখিনি। হঠাৎ করে পানি আসা এমনভাবে বাড়ল, ঘর থেকে কিছু সরাতেও পারিনি। প্রাণ নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছি।’ ফিরে গিয়ে কাঁচা ঘরটি কীভাবে বসবাসের যোগ্য করবেন তা নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত। আশ্রয় নেওয়াদের আরেকজন ৯০ বছর বয়সি নারী মনাধন বলেন, ‘এই বয়স পর্যন্ত এমন বন্যা দেখিনি। বন্যায় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। বুধবার নাতিরা আমাকে স্কুল ভবনে আনে। এখনও আছি।’
জোরারগঞ্জ বাজার থেকে হাতের বাঁয়ে গেলে বাংলাবাজার। আরেকটু সামনে পরাগলপুর গ্রাম। সেখানেও দেখা গেল, দুর্ভোগের অভিন্ন চিত্র। এলাকার অধিকাংশ ঘর তলিয়ে আছে। সড়কের কিছু অংশে এখনও হাঁটুপানি। পরাগলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে কয়েকশ নারী-পুরুষের অবস্থান। ঘর থেকে পানি পুরোপুরি না নামার কারণে তারা ফিরতে পারছে না। আশ্রয়কেন্দ্রের অদূরে সড়কের পাশে দেখা গেল ডুবে আছে একটি মুরগির খামার। সেখানকার মরা মুরগি ভাসছে পানিতে। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। পাশের বিলে দেখা গেছে, সবজি ক্ষেত তলিয়ে আছে পানিতে।
এদিকে বিভিন্ন জনপদ ঘুরে জানা যায়, দুর্গতরা যে শুধু খাবার ও বিশুদ্ধ পানির কষ্টে আছে তা নয়। তাদের এখন বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত করা নিয়ে। বন্যায় বেশ কিছু মাটির ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। কিছু ঘর বিধ্বস্ত না হলেও সেসব ঘর পুনরায় বাসযোগ্য করা যাবে কি না সেটা বোঝা যাচ্ছে না।
বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজা জেরিন জানিয়েছেন, উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। অনেক মানুষ বাড়িতে ফিরছে। উপজেলা প্রশাসন এখন বন্যা পরবর্তী স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে কাজ করছে। সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন সেনাবাহিনীর সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকরা।