দুর্যোগ মোকাবিলা
আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৪ ১৪:২৬ পিএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৪ ১৪:৩০ পিএম
বন্যার কারণে চরম খাদ্য সংকটে আছে দুর্গতরা। তাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবেই কয়েক বাড়ির চাল-ছাদ পার হয়ে খাবার দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। প্রবা ফটো
‘বৃহস্পতিবার ভোরে যখন ফেনী যাব ঠিক করে ঘর ছাড়ি, তখন আমাদের হাতে না ছিল ত্রাণ, না ছিল কোনো নৌকা। বিকাল ৩টা পর্যন্ত কিছু টাকা হাতে এলেও নৌকা পাচ্ছিলাম না। খুব মন খারাপ ছিল। পরে তিনটি নৌকা ম্যানেজ হয়। সেসব নৌকা নিয়েই ফেনীর উদ্দেশে রওনা দিই। এর মধ্যে ফান্ড বাড়তে থাকে। পথ থেকে শুকনো খাবার কিনে নিই। কোনো গণচাঁদা কিংবা স্ট্যাটাস দেওয়া ছাড়াই সোমবার সকাল পর্যন্ত আমাদের ফান্ডে জমা পড়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকার মতো। প্রথম দিন উদ্ধার অভিযান চালিয়ে এর মধ্যে তিন দফায় আমরা সেখানে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। সামনে একটা মেডিকেল ক্যাম্প করার কথা ভাবছি। বেবি ফুড আর গবাদিপশুর খাদ্য নিয়েও ভাবছি আমরা। এই কদিনে বুঝেছি নিয়ত ভালো থাকলে আল্লাহ একটা না একটা ব্যবস্থা করে দেন।’ সময়ের প্রয়োজনে খালি হাতে শুরু করা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পরিসর বাড়ার বিষয়ে এভাবেই প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে বর্ণনা দিচ্ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারহান বিন আলম।
ফারহানদের এই দলের সকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কয়েক বন্ধু মিলে শুরু করার পর ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়তে থাকে। তাদের স্বজনদের কাছ থেকেই সংগৃহীত টাকা দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তারা। প্রথম দফায় ফেনীর কাজীর দীঘি এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালানোর পর এই দলটি শুক্রবার চট্টগ্রামে ফিরে আসে। ফেরার পর এক দফা শুকনো খাবার বিতরণ করে এসে একটা ভিন্ন পরিকল্পনা করে তারা।
ফেনীতে যাওয়া আসার খরচ ও ত্রাণের গাড়ির দীর্ঘ জট দেখে তারা সিদ্ধান্ত নেয়Ñ নিজেদের ফান্ডের টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাবার কিনে আলাদা আলাদা ভাগ করে বিভিন্ন ত্রাণবাহী দলের হাতে তুলে দেওয়ার। পরিকল্পনা অনুযায়ী শনিবার রাতে ২৫টি প্যাকেটে আলাদা করে ত্রাণ নিয়ে ফৌজদারহাট এলাকায় অবস্থান নেয় তারা। পরে সেখান থেকে ফেনীগামী বিভিন্ন ট্রাকে সেগুলো বিতরণ করা হয়। এই দলের অন্য সদস্যরা হলেনÑ নিবরাছুল আলম, মোহাম্মদ জাকির, জান্নাতুল নাইম, জাহিদুল ইসলাম, মুনতাসির আহমেদ, সৈয়দ জুমান, দুর্জয় চৌধুরী, সারাফাত নূর চৌধুরী, নাহিয়ান নাজের, কাজী হাসিবুর রহমান, প্রাঙ্গন দে, তাহসিন, অর্ণব বড়ুয়া। তাদের সকলেই চুয়েট, ঢাবি, চবিসহ ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
শুধু এই দলটি নয়, গত পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে এমন শত শত দল ত্রাণ বিতরণের মাঠে নেমেছে যাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। কোনো টিমও ছিল না। সময়ের প্রয়োজনে তারা দলবদ্ধ হয়েছেন। আশাতীত সফলতা পেয়েছেন। ঠিক যেন কথা সাহিত্যিক শওকত ওসমানের লেখা ‘একসূত্রে’ গল্পের মতো। যেখানে একটি গ্রামবাসীকে দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সমবায় কার্যক্রম সম্পর্কে রাজি করাতে পারেন না সমবায় পরিদর্শক। কিন্তু একটি তুফানে গ্রাম লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার পর গ্রামের সকলে দলবেঁধে একজন অন্যের ঘর বেঁধে ঠিকই দ্রুত সময়ে গ্রাম পুনর্গঠন করে ফেলে। পরে সমবায় কর্মকর্তা তাদের জানান এই সম্মিলিত উদ্যোগই হচ্ছে সমবায়। পরে আবার তুফানের সম্ভাবনা দেখা দিলে গ্রামবাসী সম্মিলিতভাবে বলে বলে ওঠে, ‘আহুক তুফান! তুফানেরে আর ডরাই না।’
২৪ এর অদম্য বাংলাদেশ নামে একটি দল নিয়ে গত পাঁচ দিন ধরে ফেনী, মিরসরাই, ফটিকছড়ির বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহাজাদা শরীফ। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিই ফেনী যাব। এর মধ্যেই আগ্রহী সদস্য বাড়তে থাকল। কয়েকজনে মিলে টিম করলাম। বেশ ভালোই সাড়া পাচ্ছি। অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীরাও যোগাযোগ করছেন। বিভিন্ন পরামর্শ নির্দেশনা দিচ্ছেন। প্রয়োজনে সহযোগিতা করছেন। যেমন রবিবার যে ট্রাক নিয়ে আমরা ফেনী গেছি সেটা নিয়ে রাতে দুর্গত অঞ্চলে ঢোকার সুযোগ ছিল না। একটি অপরিচিত দল তখন এক জায়গায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছে। সকালে ভিন্ন একটা ট্রাক ম্যানেজ করে দিয়েছে। এর পর আমরা ত্রাণকাজে নামি। আগের দফায় তেমনি একটি দল তাদের নৌকা ব্যবহার করতে দিয়েছিল। এমন অভিজ্ঞতা আগে ছিল না।’
প্রায় একই অভিজ্ঞতা মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ রাফাহ নানজীবা তোরসারও। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেওয়া ও সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে দিন দশেক বাড়ি ছাড়া থাকতে হয়েছিল তাকে। ওই সময়ের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বন্যার পরিস্থিতি। সামাজিক কাজের জন্য তার করা ফাউন্ডেশন স্মাইল মাঠে কাজ করছে। এর বাইরেও সংবাদকর্মীদের উদ্যোগে নেওয়া একটি কার্যক্রমে যুক্ত হন তিনি। প্রথম দফা ফটিকছড়ি ত্রাণ বিতরণ করে আসার পর মঙ্গলবার মিরসরাই যাচ্ছেন তিনি। ভিন্ন দলের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তোরসা বলেন, ‘টিমের কেউ সেভাবে পরিচিত ছিল না।
কিন্তু কাজ করতে গিয়ে একটা সমন্বয় পেয়েছি। ফান্ড কালেকশনের সময় বাসার হেল্পিং হ্যান্ডসহ নিম্নবিত্ত অনেকেই সহযোগিতা করেছে। ফটিকছড়িতে স্থানীয় যারা আমাদের সহযোগিতা করেছে তারাও খুব আন্তরিক ছিল। ত্রাণের এখনও প্রয়োজনীয়তা আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখছি ত্রাণ নিয়ে কিছু সমালোচনা হচ্ছে। যেমন অনেকে পিকনিকের মতো করে যাচ্ছে। এটা পুরো চিত্রে খুব ছোট একটা অংশ। বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন। আন্তরিকতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া মানুষের সংখ্যাই বেশি। কাজও হচ্ছে।’
এমন পরিস্থিতিতে সম্মিলিতভাবে ত্রাণ সংগ্রহ করেছে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। যেমনÑ চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের সকল স্বেচ্ছাসেবী মিলে টিম সন্দ্বীপ নামে ফান্ড সংগ্রহ করছে। সোমবার পর্যন্ত তাদের সংগ্রহ ছাড়িয়েছে ১৫ লাখেরও বেশি।
পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মিলে গণচাঁদা সংগ্রহ করে গত পাঁচ দিন ধরে খাগড়াছড়ি, ফটিকছড়ি, মিরসরাই, ফেনীর দুর্গত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ বিতরণ করেন। এখন পর্যন্ত তারা প্রায় তিন লাখ টাকার ত্রাণ বিতরণ করেছেন। তাদের কার্যক্রম এখনও চলমান। বিভাগের শতাধিক শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। চট্টগ্রাম ষোলশহর মোড়ে কন্ট্রোল রুম খুলে ত্রাণ সংগ্রহ করছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা।
রবিবার রাতে সমন্বয়ক রাসেল আহমেদ জানান, এখন পর্যন্ত তাদের ছয় লাখ টাকার মতো ত্রাণ বিতরণ হয়েছে। এ ছাড়াও শুকনো খাবার, কাপড়, ওষুধ দিয়ে যাচ্ছেন মানুষ। সেসব ভাগ করে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। জামালখান মোড়ে চট্টগ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে গণত্রাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর উদ্যোক্তা সাঈদ খান সাগর বলেন, ‘আমরা অভাবনীয় রকমের ত্রাণ পেয়েছি মানুষের কাছ থেকে। সংগৃহীত ত্রাণ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী দলের মাধ্যমে বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। আমরা সরাসরি কোথাও বিতরণ করছি না। মানুষ হৃদয় ও দুহাত খুলে দিচ্ছে।’
এমনকি সুযোগ থাকলে এমন উদ্যোগে অংশ নিচ্ছেন বন্যাদুর্গতরাও। তেমন একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ফারহান বিন আলম বলেন, ‘ফেনীর একটা মসজিদে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের মাঝে খাবার বিতরণ করছিলাম। একটা লোক সেখানে আমাকে ১০০ টাকা দিল। এই বিষয়টা আমাকে এত অনুপ্রাণিত করেছে যে, কখনোই এটি ভুলব না আমি।’ স্বেচ্ছাসেবীদের এমন অভিজ্ঞতাগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছে শওকত ওসমানের গল্পের সেই গ্রামের মতো বাংলাদেশের সব মানুষ আজ সময়ের প্রয়োজনে একসূত্রে বাঁধা পড়েছে। যেখানে কোনো দুর্যোগ দুর্বিপাককে আর ভয় পায় না এখানকার মানুষ।