নুপা আলম, কক্সবাজার
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৪ ১৬:২৯ পিএম
সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। ছবি : সংগৃহীত
কক্সবাজার-৪ সংসদীয় আসনটি সীমান্তের উখিয়া-টেকনাফ উপজেলা নিয়ে গঠিত। যে আসনটি থেকে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বদি। এরপর ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও একই দলের নির্বাচিত এমপি তিনি। দুবারের সংসদ সদস্য হওয়ার পর নানা বিতর্ক ও দুর্নীতির মামলার কারণে দলীয় মনোনয়ন না পেলেও মনোনয়ন ভাগিয়ে নেন নিজের স্ত্রীর নামে। শেষ দুবার ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তার স্ত্রীই এ আসনের এমপি।
ফলে গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে সীমান্তের স্বঘোষিত ‘বৈদ্য’ হিসেবে নানা অপরাধে বিতর্কিত ও আলোচিত ব্যক্তির নাম আবদুর রহমান বদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ভিডিও রয়েছে এই আবদুর রহমান বদির। যেসব ভিডিওতে তিনি নিজেই নিজেকে এই দুই উপজেলার ‘বৈদ্য’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
বৈদ্য মানে কবিরাজ হলেও কক্সবাজারের আঞ্চলিক অর্থে শব্দটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জাদু-টোনা, ভৌতিক/আলৌকিক ঘটন সৃষ্টি, মানুষকে বশে এনে ক্ষমতা প্রয়োগক্ষমতা থাকলে তাকে বৈদ্য হিসেবে চেনা হয়। আর সেই অর্থে বদি বলে বেড়াতেন, ‘বদি বৈদ্যলী দেখবেন’, ‘বৈদ্য বদির বাইরে কিছুই হয় না’।
আর ১৫ বছর ধরে হয়েছেও তা। তার নিজের বলয়ের বাইরে যেন কিছুই করতে দেননি তিনি। এমনকি তার হাতে আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীও নির্যাতিত হয়েছেন।
পিতার কৃপায় উত্থান যেভাবে
আবদুর রহমান বদির পিতা এজাহার মিয়া। যাকে টেকনাফের মানুষ কোম্পানি নামেই চেনে বা ডাকে। এই এজাহার মিয়া কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের একসময়ের বহুল আলোচিত আন্তর্জাতিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক ছিলেন। আর সেই পিতার কৃপায় কিশোর বয়সেই উত্থান শুরু হয়েছিল আবদুর রহমান বদির।
টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাকালীন সংগঠক জহির হোসেন, প্রবীণ ব্যক্তি আমির হোসেন, রাজনৈতিক নেতা আমজাদ হোসেনের দেওয়া তথ্য বলছে, টেকনাফের নাফ নদে একসময় জেলে হিসেবে নৌকার মাঝি ছিলেন এজাহার মিয়া। ওই সময়ের বার্মা-টেকনাফ সীমান্তের মানুষ পারাপারেও নৌকা চালাতেন তিনি। কিন্তু ১৯৭৯ সালের শেষে দিকে কোনো এক অজ্ঞাত সূত্র ধরেই টেকনাফ উপজেলা বিএনপির কমিটি গঠন করে রাতারাতি নেতা হয়ে যান তিনি। এর পরপরই জড়িয়ে যান চোরাচালান চক্রের সঙ্গে। ১৯৮৩ সালের পরপরই এই এজাহার মিয়া দলবদল করে জাতীয় পার্টির নেতা হয়ে যান। মূলত ওই সময় তিনি হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের সীমান্তের নিয়ন্ত্রক। শুধু তাই নয়, ১৯৯০ সালের পর এই এজাহার মিয়া আবারও ফিরে আসেন বিএনপির রাজনীতিতে। আর ওই ১৯৯০ সালের পরপরই যেকোনোভাবেই এমপি হওয়ার স্বপ্ন শুরু করেন আবদুর রহমান বদি।
এই বদির স্বপ্ন ছিল বিএনপি-জামায়াত অথবা আওয়ামী লীগ; যে আমলেই হোক, যেভাবেই হোক সংসদ সদস্য হবেন। এর জের ধরে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চেয়ে বসেন তিনি। কিন্তু অপকর্মের খবর পাওয়ায় সে সময় বিএনপির হাইকমান্ড বদিকে মনোনয়ন দেয়নি। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন এবং জামানত হারান। ওই নির্বাচন বাতিল হওয়ার পরে রাতারাতি নিজেকে পাল্টে আওয়ামী লীগে যোগ দেন বদি। পিতা ও পুত্র ১৯৯৬ সালের পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর পক্ষে কাজ করেন। ওই নির্বাচনে মোহাম্মদ নির্বাচিত হন আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।
পরিসংখ্যানমতে, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ ও ১৯৯৬ সাল ছাড়া পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে কক্সবাজার-৪ আসনে জিততে পারেনি আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের পর টানা বদি ও তার স্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন।
অনুসন্ধান বলছে, চোরাচালান সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক হিসেবে টেকনাফের এজাহার মিয়ার ১৪ জন স্ত্রী এবং ২৮ জনের বেশি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবার বড় আবদুর রহমান বদি। যার কারণে বাবার বিশাল চোরাই ব্যবসায় কিশোর বয়সেই হাতেখড়ি হয় তার।
১৫ বছরের স্বঘোষিত বৈদ্য
২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রথমবারে মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বদি আলোচনায় আসেন ভিন্নভাবে। ওই সময় তিনি আইনজীবী, শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা, দলীয় কর্মীদের মারধর করে আলোচনায় আসেন। এরপর টেকনাফ স্থলবন্দর নিয়ন্ত্রণ, দখল, চাঁদাবাজি, মাদক, মানব পাচারের অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। এমনকি তিনি এমপি থাকাকালে ওই সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের সকল তালিকায় শীর্ষ ইয়াবা গডফাদার হিসেবে নাম আসে তার।
টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল বশর জানান, টানা ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে চোরাচালান, ইয়াবার ব্যবসা, মানব পাচার, রোহিঙ্গা আশ্রয়-প্রশ্রয় আবদুর রহমান বদির হাতেই। তিনি টেকনাফ স্থলবন্দরে একক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। ট্রাকমালিকদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করেছেন। তার পুরো পরিবার ইয়াবাসহ নানা দখল বেদখলে জড়িত রয়েছে। যার কারণে অবৈধ সম্পদের অভিযোগে দুদকের দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় সাজাও কাটেন বদি।
টেকনাফের বাসিন্দা জেলা বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বদি একজন ইয়াবা সম্রাট। তার কারণে দেশজুড়ে মাদক ছড়িয়ে পরে। বদি ও তার স্ত্রী এমপি থাকাকালে প্রভাব খাটিয়ে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। বিশেষ করে, মাদক চোরাচালান ও স্বর্ণ পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। বদি এসব অবৈধ টাকায় দেশে-বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদও গড়েছেন।’
বদিকে কারাগারে প্রেরণ
বদিকে একটি হত্যা প্রচেষ্টা মামলায় কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে র্যাবের একটি দল কক্সবাজারের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত টেকনাফে উপস্থাপন করলে ওই আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক হামিমুন তানজিন কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বলে জানিয়েছেন আদালতে ওই সময় উপস্থিত থাকা আইনজীবী মোহাম্মদ শাহীন।
টেকনাফ থানার ওসি মুহাম্মদ ওসমান গণি জানিয়েছেন, গত ১৯ আগস্ট কক্সবাজার জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, তার ভাই টেকনাফ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জিহাদ, অপর ভাই আবদুর রহমান বাদী হয়ে পৃথকভাবে তিনটি মামলা করেছেন। গত ৫ আগস্ট রাতে তাদের পরিবারের মালিকাধীন টেকনাফের আলী উল্লাহ আলো শপিং কমপ্লেক্স, হোটেল নাফ কুইন ও আব্দুল্লাহ ব্রাদার্স ফিলিং ও গ্যাস স্টেশনে হামলা ভাঙচুর ও লুটপাট, হত্যাচেষ্টার ঘটনায় তিন ভাইয়ের এই মামলা দায়ের। যেখানে উখিয়া-টেকনাফের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ, জাফরের পুত্র টেকনাফ সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহজাহানসহ ১৫০ জনের বেশি মানুষকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলার প্রধান আসামি আবদুর রহমান বদিকে আদালতে উপস্থাপন করা হচ্ছে জেনে তদন্তকারী কর্মকর্তা পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছেন আদালতে। রিমান্ড শুনানির পর আদালতের আদেশমতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিকে গত মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম শহর থেকে আটক করে র্যাবের একটি দল। সীমান্তের বহুল আলোচিত এই সাবেক এমপিকে মাদক, মানব পাচারসহ নানা অপরাধ জগতের প্রধান ডন হিসেবে দেশব্যাপী জানে।