ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ
সাইদুর রহমান আসাদ, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৪ ১৫:৫৪ পিএম
রিপন আহমেদ। প্রবা ফটো
বাসায়-অফিসে থাইগ্লাস লাগানোর কাজ করত রিপন আহমদ (১৯)। অসচ্ছল সংসারের হাল ধরতে বিদ্যালয়ের গণ্ডি ছেড়েছে সপ্তম শ্রেণিতে ওঠেই। বাবা অসুস্থ। চার ভাই- বোনসহ ছয়জনের সংসারের ঘানি টানতে লড়াই করছিল সে। গেল ৪ আগস্টে তারুণ্যের টগবগে রক্ত টেনে নিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনে নির্মম-নির্দয়ভাবে পুলিশ কাছে থেকে তার বাম পায়ে গুলি করেছে। বাম পায়ের গোড়ালি দুমড়েমুচড়ে গেছে সংগ্রামী এই তরুণের। হাসপাতালের বিছানায় অনিশ্চিয়তায় দিন কাটছে রিপনের।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কুরবাননগর ইউনিয়নের মাইজবাড়ির বদিপুরের বাসিন্দা মো. কামাল উদ্দিনের বড় ছেলে রিপন আহমদ। অভাবেব সংসারে দিনমজুরের কাজ করে চার ছেলে-মেয়েকে মানুষ করতে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করছেন তিনি। কামাল উদ্দিনের শরীরে চর্মরোগ বাসা বেঁধেছে। এ কারণে ভারী কাজ করতে অক্ষম এখন তিনি। তবুও টুকটাক কাজ করে সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের খরচ চালিয়ে যাচ্ছিলেন অসুস্থ এই মানুষটি।
পরিবারের বড় ছেলে রিপন। মাইজবাড়ি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন। এ সময় অভাবেব কারণে অষ্টম শ্রেণিতে আর পড়া হয়নি। অন্য তিন ছোট বোনদের পড়াশোনা যেন থেমে না যায়, সেজন্য থাইগ্লাসের কাজ শেখা শুরু করেন একটি দোকানে। সেখানে কিছুদিন কাজ করে নিজেই বাসাবাড়ি ও বিভিন্ন অফিসে থাইগ্লাস লাগানোর কাজ করছে রিপন। তবুও অভাব পিছু ছাড়েনি তাদের।
রিপনের ছোট প্রথম বোন রোজিনা বেগম। ২০২৩ সালের সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। সংসারে টানাপড়েনের কারণে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় তার। দ্বিতীয় বোন রোবিনা বেগম আমবাড়ি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তৃতীয় বোনও সুনামগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সারা দেশের ছাত্র-জনতা স্বৈরাচার সরকারের পতনের দাবিতে আন্দোলনে নামলে বসে থাকতে পারেনি সে। চার আগস্টে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো সুনামগঞ্জ। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলের শুরুতেই শহরের পুরাতন বাসস্টেশন এলাকায় হামলা করে আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ছড়রা গুলি নিক্ষেপ করে পুলিশ। বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত থেমে থেমে চলে ত্রিমুখী সংঘর্ষ।
দুপুর আড়াইটার দিকে জামতলার সামনে আরপিননগর সড়কে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. খালেদ চৌধুরী নিজেই তাকে গুলি করেছেন বলে দাবি করেছেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা জানায়, গুলিতে রিপনের পায়ের গোড়ালি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। বাঁচাও বাঁচাও বলে সে চিৎকার করতে থাকে। আক্রান্ত জায়গায় বাম-হাত চেপে ধরে মোবাইল ফোনে নিজেই মাকে জানায়, ‘আমারে বাঁচাও, আমার পার মাঝে গুলি মারছে।’ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে পুলিশ সদস্যরা সরে পড়ে। পরে একটি রিকশায় একা একাই হাসপাতালের দিকে রওনা করে রিপন।
অবস্থার অবনতি দেখে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে ১০ দিন চিকিৎসা সেরে এখন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছে সে।
এদিকে, বড় এই পরিবারটির উপার্জনকারী ব্যক্তির এমন পরিণতিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অন্য সদস্যরা। পরিবারের অন্যরা জানিয়েছেন, সিলেট ও ঢাকায় চিকিৎসার খরচ কিছুদিন ধারকর্জ করে দিয়েছেন তারা। এখন সরকারিভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সুনামগঞ্জের শিক্ষার্থী আব্দুল বারী বললেন, থানার ওসি বন্দুক পায়ে লাগিয়ে গুলি করেছেন রিপনকে। সে আমার ভাগ্নে হয়। নিরীহ-দরিদ্র পরিবারের ছেলে। তার এই অবস্থায় মহাবিপদে পড়েছে পরিবার।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আরেক শিক্ষার্থী ইমনদ্দোজা বলেন, রিপনের সঙ্গে যে নির্মম আচরণ করা হয়েছেÑ এর বিচার চাই আমরা। একইসঙ্গে তার চিকিৎসার সুব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি।
রিপনের বাবা মো. কামাল উদ্দিন বললেন, ছেলের আয় দিয়েই পরিবার চলত। এখন সে অসুস্থ খুব কষ্টে আছি আমরা। কিছুদিন পাড়া-প্রতিবেশীদের সহযোগিতা ও সুদে টাকা এনে চিকিৎসা করিয়েছি। এখন সরকারিভাবে চিকিৎসা চলছে। ৭০ হাজার টাকা ঋণ করেছি। সেই ঋণের সুদের জন্য পাওনাদার তাগাদা দিচ্ছে। বলেছি, ছেলে সুস্থ হয়ে ফিরে এলে টাকা পরিশোধ করব।
ঢাকায় হাসপাতালে ছেলের পাশে আছেন মা আছর বিবি, কাঁদতে কাঁদতে ছেলের এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচার দাবি করলেন।
প্রতিবেশী মো. জসিম উদ্দিন বললেন, রিপন খুব ভালো ছেলে। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে শিশু বয়সেই কাজে যুক্ত হয়েছে। ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ডাকে মিছিলে গিয়েছিল সে। চার তারিখ পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছে। যেভাবে পায়ে গুলি করা হয়েছে, মনে হচ্ছে বন্দুক লাগিয়ে করা হয়েছে। এখন পায়ের অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা চাই সরকার তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করুক। তার অসচ্ছল পরিবারের সহযোগিতায় সরকার এগিয়ে আসবেÑ এমনটি চাই আমরা।
প্রতিবেশী আরব আলী বলেন, তাদের চলার মতো কোনো অবস্থা নেই। এই ঘটনার পর তারা কীভাবে চলবে? আমরা চাই সরকার তার চিকিৎসা ও পরিবারের পাশে এগিয়ে আসুক।
সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার এমএন মোর্শেদ বলেন, আমরা এই বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি করেছি। এই কমিটির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রতিবেদনে আমাদের কারো দোষ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার চিকিৎসার বিষয়েও সহায়তা করব আমরা।