সহিংসতায় আহত
হাসান সিকদার, টাঙ্গাইল
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৪ ১১:১৬ এএম
আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৪ ১১:২০ এএম
মায়ের সঙ্গে হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ টাঙ্গাইলের খন্দকার তালহা। প্রবা ফটো
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ টাঙ্গাইলের খন্দকার তালহার (১৭) চিকিৎসার ব্যয়ভার নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে তার পরিবার। পরিবারটির আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সঠিক চিকিৎসা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সহযোগিতা না পেলে তালহা পঙ্গু হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে স্বজনরা।
তালহা টাঙ্গাইল শহরের হাজী আবুল হোসেন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। বাবা খন্দকার আশরাফের সঙ্গে ১৫ বছর আগে মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে পৌর এলাকার বেড়াবুচনা সবুজবাগ এলাকায় নানার দেওয়া ঘরে মা ও ছোট বোন নিয়ে বসবাস করে। অন্যের বাসায় কাজ ও হাঁস-মুরগি লালন-পালন করে দুই সন্তান নিয়ে সংসার চালান মা। এদিকে সন্তানের চিকিৎসায় জমানো টাকাও শেষ প্রায়। এ অবস্থায় তালহার চিকিৎসার ব্যয়ভার নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন মা।
তালহার ছোট বোন আবুল হোসেন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অভাবের সংসারে তালহা কিছু দিন পড়াশোনা বাদ দিয়ে কাজে নামে। পরে কাজের পাশাপাশি আবারও লেখাপড়া শুরু করে। মায়ের সঙ্গে ধরেছে সংসারের হাল। গত ৫ আগস্ট তালহা ও তার ছোট বোন টাঙ্গাইলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।
আহত খন্দকার তালহা বলে, ‘শুরু থেকেই আন্দোলনে ছিলাম। বিজয় মিছিলের দিন পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার একপর্যায়ে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ছোড়ে। দৌড়ে আশ্রয় নিই পাশের একটি ছয় তলা ভবনের ছাদে। দুজন পুলিশ আমার পিছু নেয়। পরে তারা ওই ছাদে উঠে আমার বুকের মধ্যে বন্দুক ধরে। একপর্যায়ে বাম পায়ে গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পুলিশের কাছ থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাই। এ সময় একজন আমাকে হসপাতালে নিয়ে যায়।’
তালহা আরও বলে, ‘পায়ের ভেতরে এখনও গুলির সিসা রয়েছে। একটি নখ কেটে ফেলা হয়েছে। সেলাই করে দিয়েছিল, ইনফেকশন হয়েছে। ভালো হতে আরও এক মাসের ওপরে লাগবে। তারপর আবার অপারেশন করতে হবে। এতে টাকা আমাদের কাছে নাই। অপারেশন না হলে হয়তো পঙ্গু হয়ে থাকতে হবে। সবার সহযোগিতা পেলে আমি আবার সুস্থ হতে পারব।’
তালহার মা কোহিনুর বেগম বলেন, ‘দুটি সন্তান রেখে স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে বাবার ভিটায় থেকে অন্যের বাড়িতে কাজ করে সামান্য কিছু টাকা রোজগার করি। তা দিয়েই সংসার চালাচ্ছি ও ছেলেমেয়ে পড়াশোনার খরচ দিচ্ছি। ছেলেও পড়াশোনার পাশাপাশি রঙ মিস্ত্রির কাজ করে। মিছিলে গেলে ছেলের পায়ে পুলিশ গুলি করে। ধারদেনা করে এ পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকার ওপরে শেষ করেছি। ডাক্তার বলেছে এখনও তালহার পায়ের বড় অপারেশন বাকি রয়েছে। অনেক টাকার দরকার।’
তিনি বলেন, ‘টাকার অভাবে ছেলের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা না করেই হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যাই। ছেলের পায়ে গুলির কিছু সিসা রয়ে গেছে। ওর অবস্থা খারাপ হতে থাকলে গত শনিবার আবার টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসি। ছেলের পায়ে ইনফেকশন হয়েছে। ডাক্তার বলছে ভালো হতে এক মাসের ওপরে সময় লাগবে। তারপর পায়ের অপারেশন করে গুলিগুলো বের করতে হবে। এ অবস্থায় কীভাবে আমি সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় মেটাবে, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’
কোহিনুর বেগম বলেন, ‘গুলিতে তালহার বাঁ পায়ের একটি আঙুল কেটে ফেলা হয়েছে। আমার ছেলে আগের মতো স্বাভাবিক না হলেও যেন নিজে একা একা চলাফেরা করতে পারে, সেই আশা নিয়ে সবার কাছে সহযোগিতা চাচ্ছি।’
টাঙ্গাইল পৌরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মেহেদী হাসান আলীম বলেন, ‘আমরা খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করছি। টানাটানির সংসারে গুলিবিদ্ধ ছেলেটা অসহায় হয়ে পড়ছে। আশপাশের মানুষ দুই-চারশ টাকা দেয়, সেই টাকা দিয়ে ব্যথার ওষুধ কেনে। পরিবারের যে অবস্থা, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা করানো তাদের পক্ষে সম্ভব না।’