সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৪ ১০:০৪ এএম
আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৪ ১০:১১ এএম
সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ। ছবি: সংগৃহীত
ডিবি হারুন নামে পরিচিতি পাওয়া মো. হারুন অর রশীদের গল্প এখন মুখে মুখে। ২০০০ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুলিশ বিভাগে চাকরিতে প্রবেশ করেন তিনি। যদিও তার বাবা মো. হাসিদ ভূঁইয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। বরং একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার বদৌলতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। হারুন পুলিশে চাকরির সুবাদে সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে অতি কম সময়ে বিভিন্ন উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি কখনও উপপুলিশ কমিশনার, এসপি হারুন, সর্বশেষ গোয়েন্দা হারুন হিসেবে জনগণের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হোসেনপুর গ্রামে ৪০ একর ভূমির ওপর তার বিলাসবহুল অত্যাধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন রিসোর্টে আছে ২০ একরের বিশাল পুকুর, অত্যাধুনিক সুইমিংপুল, বিলাসবহুল প্রমোদাগার, রিসোর্টের বিলাসী কক্ষ মানুষকে বিমোহিত করে তোলে। অবচেতন মনে হারিয়ে যায় শৈল্পিক ভাবনায় আর জৈবিক তাড়নায়। প্রায় সময়েই মিঠামইনের আকাশে হেলিকপ্টারের আওয়াজ পাওয়া যায়। আর তখন বুঝতে বাকি থাকে না রিসোর্টে আসছে ধনকুবের নারী-পুরুষ।
রিসোর্টের প্রিমিয়ার স্যুটে এক রাতের ভাড়া ২০ হাজার টাকা। ডিলাক্স কক্ষের ভাড়া ১০ হাজার টাকা। তা ছাড়া সুপার ডিলাক্স রুমের ভাড়া ১২ হাজার টাকা। ২০২১ সালের ৩র সেপ্টেম্বর রিসোর্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
জানা গেছে, রিসোর্টটিতে হারুনের পরিবারের ৫ থেকে ৭ একর জায়গা ছিল। বাকি অন্তত ৩৫ একর জায়গা ছিল অন্যদের। এসব জায়গার মালিকদের দাম দেওয়ার কথা বলে হারুন রিসোর্টের জন্য জায়গা দখলে নেন। এসব জায়গার হিন্দু-মুসলমান মালিকরা কেউই পুরো ভূমির প্রকৃত দাম পাননি।
সবাই সামান্য টাকা পেয়ে ভয়-হুমকিতে জায়গা রেজিস্ট্রি করে দেন। আবার অনেকেই জায়গার দাম না পাওয়ায় এখনও জমি রেজিস্ট্রি করে দেননি। তাদেরই একজন মিঠামইন সদর ইউনিয়নের গিরীশপুর গ্রামের দিলীপ বণিক। তিনি জানান, হারুন রিসোর্ট করার কথা বলে তার এক একর ১০ শতাংশ জায়গা নিয়েছেন। জমির কোনো দরদামও নির্ধারণ করা হয়নি। তাকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। অথচ জমির দাম হবে অন্তত ২০ লাখ টাকা। টাকা না পাওয়ায় জমি রেজিস্ট্রি করে দেননি জানিয়ে দিলীপ বণিক বলেন, আমার মতো এমন অন্তত ১২ জন রয়েছেন, যাদের নামমাত্র টাকা দিয়ে জমি রিসোর্ট করার জন্য হারুন নিয়ে গেছে। আমরা জমির দলিল দেইনি। রিসোর্টের জন্য নেওয়া ১২ আনার মতো জায়গার দলিল হয়েছে, বাকি জমির দলিল হয়নি। তিনি বলেন, যেহেতু জমি বিক্রি করিনি তাই বর্তমান আমিই আমার জমির মালিক।
প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তার ছোট ভাই ডা. শাহরিয়ার।
এলাকাবাসী বলছেন, বিশেষ সুবিধা লাভের আশায় সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন রিসোর্টের নাম দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট। এলাকাবসী জানান, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি থেকে শুরু করে পুলিশের বিভিন্ন উচ্চ পদে আসীন হওয়াসহ নানা কারণে তিনি তার এই নান্দনিক স্থাপনার নাম দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট রির্সোট। এলাকায় সাবেক প্রেসিডেন্টের নাম ব্যবহারের ফলে নিজেদের তেমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জায়গা না থাকলেও রিসোর্টের জন্য জায়গা নিতে বেগ পেতে হয়নি। রিসোর্টটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় সেখানে মাত্র একটি পুকুর ছিল। এখন চারপাশে গাছপালা, ডুপ্লেক্স কটেজ, কালচারাল সেন্টার, আউটডোরসহ নানা কারুকার্য সংবলিত পাথরের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা হয়েছে। রয়েছে একটি চাইনিজ রেস্তরাঁ, শিশুপার্ক, ওয়াচ টাওয়ার, লেকসহ নানা কিছু। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী-এমপি, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিচার বিভাগের কর্মকর্তা। সপ্তাহ সপ্তাহে চলচ্চিত্র জগতের তারকা এবং ভিআইপি ব্যক্তিরা বিলাসবহুল রিসোর্টটিতে সময় কাটিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে রিসোর্টটিতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে রিসোর্টে বুকিং চালু রয়েছে।
২০১১ সালের ৬ জুলাই সংসদ ভবনের সামনে তৎকালীন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে পিটিয়ে প্রথমে দেশজুড়ে লাইমলাইটে আসেন তৎকালীন ডিএমপির তেজগাঁও জোনের ডিসি (অতিরিক্ত উপ-কমিশনার) হারুন অর রশীদ। এ ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হন তিনি।২০১৪ সালের ২৪ আগস্ট তিনি গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পান। এর মাত্র চার মাস পর ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর গাজীপুরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জনসভায় ১৪৪ ধারা জারি এবং নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে বিএনপির জনসভা পণ্ড করে দেন এসপি হারুন। এ ঘটনায় পর আবারও ব্যাপকভাবর আলোচিত হন তৎকালীন এসপি হারুন। টানা ৪ বছর গাজীপুর জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তার বিরুদ্ধে ছিল টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পাহাড়। ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের জিম্মি করে টাকা আদায়, জমি দখলে সহায়তা ও মদদদাতার মতো গুরুতর অভিযোগ। আইনের লোক হয়ে বেআইনি ও অবৈধ টাকা আয়ের বাস্তবতা ছিল সেখানকার মানুষের মুখে মুখে। তার ক্ষমতার দাপটে কোণঠাসা ছিলেন স্থানীয় এমপি, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। সেখানে এসপি হারুন দায়িত্ব পালনকালে গাজীপুর সদর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়ায় ইউপি নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। বাধ্য হয়ে নির্বাচন কমিশন ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল এসপি হারুন অর রশীদকে গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এই পুলিশ কর্মকর্তার প্রত্যাহারের আদেশ তুলে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে ৩ মে গাজীপুরের এসপি পদে পুনর্বহাল করে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে তার আরেক অধ্যায়। নারায়ণগঞ্জে শুরু হয় এসপি হারুনের অবৈধ কর্মকাণ্ড।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন এসপি হারুন। অপহরণ, গুম, চাঁদাবাজির মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন জেলার অসীম ক্ষমতাধর সর্বময় কর্তা। তার কাজ বাস্তবায়নে শামীম ওসমানের সাথে দ্বন্দ্ব-কলহসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে আলোচিত হন হারুন। শুধু টাকা ও চাঁদার জন্য একাধিক শিল্পপতিকে তুলে নিয়ে সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেন। এরি ধারাবাহিকতায় চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান শওকত আজিজ রাসেলের স্ত্রী-সন্তানকে রাজধানীর গুলশানের বাসা থেকে এসপি হারুন একদল পুলিশ নিয়ে নারায়ণগঞ্জে তুলে নিয়ে যান। পরে তারা মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান। এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হলে ২০১৯ সালের ১০ নভেম্বর এসপি হারুনকে নারায়ণগঞ্জ থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে (ট্রেনিং রিজার্ভ) সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু আবারও ক্ষমতার দাপটে ও ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের ছত্রছায়ায় ও আশীর্বাদে এসপি হারুনকে ২০২০ সালের ৯ জুন ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হিসেবে তেজগাঁও বিভাগে দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ২০২১ সালের ২ মে তাকে অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি দিয়ে ১১ মে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার করা হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ১২ জুন হারুনকে ডিএমপির ডিবিপ্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ডিবিপ্রধান হিসেবে বিএনপির নয়াপল্টন অফিসে নানা অপ-তৎপরতা চালায়। বিএনপি নেতাকর্মীদের গণগ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নে নেতৃত্বে ছিলেন হারুন।
ডিবিপ্রধান হিসেবে থাকাকালীন তার অফিসে ভাতের হোটেলসহ নানা কর্ম ও অপতৎপরতা আজ সবার মুখে মুখে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে তার কার্যালয়ে নিয়ে শারীরিক, মানসিক ও স্নায়বিক নির্যাতন করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘটনাটি সারা দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টিসহ জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তার এ কর্ম ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্যাতনের মুখোশ আরও প্রকাশ্যে উপস্থাপিত হয় বলে সচেতনমহল মনে করেন। এরপর গত ৩১ জুলাই তাকে ডিবি থেকে সরিয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর হারুনের অপকর্মের বিষয়গুলো এখন মানুষের মুখে মুখে
কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে হারুন-অর-রশীদের জন্ম। তার পিতার নাম আব্দুল হাসিদ ভূঞা। চার ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় হারুন। দ্বিতীয় জিয়াউর রহমান মাদকদ্রব্যের এসআই ও তৃতীয় জিল্লুর রহমান পুলিশের ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া হারুনের প্রতিষ্ঠিত বিলাসবহুল ‘প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট’-এর এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সবার ছোট ভাই ডা. শাহরিয়ার। হারুন কিশোরগঞ্জের আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সূর্যসেন হলের ২১৩নং কক্ষে থাকার সময়ে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে তিনি যুক্ত ছিলেন। এক পর্যায়ে সে সময় হারুন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।