মালিক শেখ রেহানা পরিবার
রেজাউল করিম, গাজীপুর
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৩৭ এএম
আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৪ ১০:৪০ এএম
গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত বাংলো টিউলিপ টেরিটোরি, বাগানবাড়ি, বাগান বিলাস। প্রবা ফটো
শিল্প-অধ্যুষিত গাজীপুরে রহস্যঘেরা চারটি বাংলো। যেগুলোর মূল্য কমপক্ষে দেড়শ কোটি টাকা। বছরের পর বছর সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বাংলোগুলোয় প্রবেশের সাধ্য ছিল না কারও। মাঝেমধ্যে আসতেন ভিআইপিরা, থাকত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা। যেগুলোকে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার বাংলো বলেই চেনেন এলাকাবাসী। তবে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর এসব বাংলোয় প্রবেশ করেছে সাধারণ জনতা, পাশাপাশি হয়েছে লুটপাট ও ভাঙচুর।
লোকমুখে শেখ রেহানার নামে ছড়িয়ে পড়া এসব বাংলো নান্দনিক ও প্রকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। ডুপ্লেক্স বাড়ি, শান বাঁধানো পুকুরঘাট, কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক জলরাশিবেষ্টিত। নাগরিক জীবনের কোলাহল ছেড়ে অবকাশ যাপনের উপযুক্ত স্থান। এগুলোর মধ্যে গাজীপুর মহানগরীর কানাইয়া এলাকায় ৩০ থেকে ৩৫ বিঘা জমির ওপর টিউলিপ টেরিটরি, মহানগরীর বাঙালগাছ এলাকায় ২৫ বিঘা জমির ওপর বাগানবিলাস, ২৩ বিঘা জমির ওপর ফাওকাল বাগানবাড়ি, ১৫ থেকে ১৬ বিঘা জমির ওপর কালিয়াকৈরে মৌচাকের বাগানবাড়ি। এলাকার মানুষ এর সবকটি শেখ রেহানার বাগানবাড়ি বলে জানলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এগুলোর মালিকানায় রয়েছেন শেখ রেহানার স্বামী শফিক আহমেদ সিদ্দিক, দেবর তারেক আহমেদ সিদ্দিক ও তাদের নিকট আত্মীয়রা।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরেই এসব বাংলোতে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। তারা বাংলোগুলোয় ঢুকে ভাঙচুরের পাশাপাশি আগুন দেয় ফাইলপত্রে। এরপর লুট করে নেয় টিভি, ফ্যান, এসি, ফ্রিজসহ আসবাবপত্র। নষ্ট করে সব ছোটখাটো স্থাপনা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব বাংলোয় শেখ রেহানা, তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক, ববিসহ শেখ পরিবারের লোকজন আসতেন । বিশেষ করে শীত মৌসুমে বেশি আসা যাওয়া হতো। মাঝেমধ্যে জাতীয় পতাকা লাগানো গাড়ি প্রবেশ করত রাতে। তখন থাকত বাংলোর চারপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি। কখনও ভোরেই গাড়িগুলো চলে যেত, কখনও দু-এক দিন থাকত তারা।
গাজীপুর মহানগরীর ফাওকাল এলাকায় বাংলাদেশ সমরাস্ত্র ও টাঁকশালের পাশেই ২৩ বিঘা জমি নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি বাগানবাড়ি। বিশাল সীমান প্রাচীরে ঘেরা, ভেতরে নান্দনিক ডুপ্লেক্স বাড়ি। ২০১২ সালে সনাতন ধর্মাবলম্বী স্থানীয় অনিল ও অক্ষয়দের থেকে কিনে এই বাংলো তৈরি করা হয়। ৩৫ লাখ টাকা বিঘা মূল্য ১৪ বিঘা জমি ক্রয় করা হয় এবং কাগজপত্রে সমস্যা থাকায় ৮ বিঘার কোনো দাম দেওয়া হয়নি। এখন সেখানকার বিঘা প্রতি জমির মূল্য আড়াই কোটি। জমিটি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী স্বপনের মধ্যস্ততায় কেনেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও শেখ রেহানার দেবর তারিক আহাম্মেদ সিদ্দিক।
জমির সাবেক মালিক অক্ষয় বলেন, এটি আমাদের বাপ-চাচার জমি ছিল। পরে আমরা বেচার সিদ্ধান্ত নিলে তারিক আহম্মেদ সিদ্দিক ২০১৫ সালে কিনে নেন। ২২-২৩ বিঘা জমি থাকলেও কাগজপত্র সমস্যা থাকার কারণে ১৪ বিঘার দাম দেয়। বাকি ৮ বিঘার দাম পাইনি। এখন জমির দাম বেড়েছে কয়েকগুণ।
মহানগরীর বাঙালগাছ এলাকায় প্রায় ২৫ বিঘা জমিতে তৈরি আরেকটি বাংলো বাড়ি। এটির নাম করা হয়েছে বাগানবিলাস। কয়েশ গাছ নিয়ে বাংলোর ভেতরে চমৎকার পরিবেশ। অবকাশ যাপনের জন্য আছে ৩ রুমের একটি দোচালা ঘর। পাশেই ছোট আরেকটি ঘর। সামনে বিশাল পুকুর, বিল। এসব দেখার জন্য আছে ওয়াচ-টাওয়ার।
কথা হয় বাগানবিলাসের তত্ত্বাবধায়ক হৃদয়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, সবাই জানে শেখ রেহানার বাংলো কিন্তু এটি আসলে তার দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের। ৫ আগস্ট অনেক লোক ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর সবকিছু ভাঙচুর করে লুটপাট করে নিয়ে গেছে। অনেক ভিআইপি আসতেন এখানে।
এলাকাবাসী বলছেন, ঢাকা থেকে অনেক লোক আসতেন। আমরা কেউ প্রবেশ করতে পারতাম না। অনেক বিচার সালিশ হতো ভেতরে। তবে ভাঙচুর হওয়া ঘরের সামনে বেশ কয়েকটি বিদুৎ বিলের কাগজ পাওয়া যায়। সেখানে বাঙ্গালগাছে এই বাগানের মিটারের মালিকের নাম শেখ রেহানার দেবর ও শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা তারেক আহমদ সিদ্দিক। তবে বাংলোর গেটে যে নামফলকটি রয়েছে সেটি তারেক আহমেদ সিদ্দিকের বড় ভাই রফিক আহমেদ সিদ্দিকের নামে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে বাংলাদেশ স্কাউট প্রশিক্ষণের পূর্ব পাশে অবস্থিত ১৫-১৬ বিঘা জমির ওপরে আরেকটি বাংলো রয়েছে। যেটি শেখ রেহানার। প্রতি বছর শেখ রেহানা ও শেখ হাসিনা একান্ত সময় কাটাতে আসতেন। চলতি বছরও দুই বোন এখানে আসেন। এ ছাড়াও সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জরুরি মিটিং করতেন।
গাজীপুর মহানগরীর কানাইয়া এলাকায় শেখ হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপের নামে ৩০ থেকে ৩৫ বিঘা জমি নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে নান্দনিক টিউলিপ টেরিটোরি। এটির মালিক শেখ রেহানার স্বামী শফিক আহমেদ সিদ্দিক। হাজার হাজার নান্দনিক ফলফুলের গাছ, বড় ডুপ্লেক্স বাড়ি, গেস্টরুম, বিশাল পুকুর, শান বাঁধানো পুকুরঘাট, দক্ষিণ পাশে মুক্ত জলাশয়। এখানেই সবচেয়ে বেশি আসত শেখ রেহানার পরিবারের সদস্যরা।
টিউলিপ টেরিটোরির ম্যানেজার আব্দুর রহমান বলেন, ৩০ বিঘার বেশি জায়গা নিয়ে তৈরি এই বাগানবাড়ি। এটির মালিক শফিক স্যার। এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ। এখানে প্রতি বছর ২ বার, বিশেষ করে শীতের সময় টিউলিপ আপা, ববি ভাইসহ কয়েকজন আসতেন। এখানে এসে ৪-৫ দিন থাকতেন।
এ ছাড়াও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনে একটি বহুতল ভবন রয়েছে। সেখানে একটি নিটিং কারখানা রয়েছে। ওই কারখানার অ্যাডমিন ম্যানেজার শাহিন বলেন, এখানে ১০ তলা বিল্ডিং রয়েছে সেটি কিছুদিন আগে বিক্রি করে দিয়েছেন। আমি এখন কারখানার ম্যানেজার মাত্র। তাদের সঙ্গে বাবার পরিচয় ছিল সেই সুবাদে আমার চাকরি হয়েছে, এর বেশি আমি কিছু বলতে পারব না।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, বাংলোগুলো যেসব এরিয়াতে সেখানকার জমির মূল্য কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা শতাংশ। এসব জমির মূল্য গড়ে ৫ লাখ টাকা শতাংশ হলেও চারটি বাংলোর মূল্য ১৬৫ কোটি টাকা।