চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৪ ১৫:০৩ পিএম
চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি করা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবশেষে মামলা করা হয়েছে চান্দগাঁও থানায়। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকতে পুলিশ বাদী হয়ে যে মামলা করেছিল, সেই মামলায় দলীয় ক্যাডারদের পরিচয় উল্লেখ না করে কৌশলে অস্ত্রধারীদের রক্ষা করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী তানভীর ছিদ্দিকীর চাচা মোহাম্মদ পারভেজের বাদী হয়ে শুক্রবার দায়ের করা হত্যা মামলায় প্রথমবারের মতো অস্ত্রধারীদের নাম এজাহারভুক্ত হলো। এর মধ্য দিয়ে অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের ওপর আইনি চাপ তৈরি হলো বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও গত প্রায় এক মাসে একজন অস্ত্রধারীকেও গ্রেপ্তার বা একটি অস্ত্রও উদ্ধার করা যায়নি। এখন নতুন করে হত্যা মামলার পর অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে অভিযানের কথা বলেছেন মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মোখলেসুর রহমান। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলবে।’
গত শুক্রবার রাত ৯টা ৫০ মিনিটের সময় চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হত্যার দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে হুকুমের আসামি করে ৩৪ নেতাকর্মী ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে চান্দগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়। ঢাকাসহ দেশের একাধিক জেলায় এরই মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হুকুমের আসামি করা হত্যা মামলা দায়ের হলেও চট্টগ্রামে এটিই প্রথম।
গত ১৮ জুলাই বিকালে বহদ্দারহাট মোড়ে গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী তানভীর ছিদ্দিকীর চাচা মোহাম্মদ পারভেজ বাদী হয়ে চান্দগাঁও থানায় মামলাটি করেন। তানভীর ছিলেন আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থী। একই মামলায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তারুয়া এবং পথচারী মুদি দোকানকর্মী সাইমন প্রকাশ মাহিন হত্যাকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনায় গত ১৯ জুলাই চান্দগাঁও থানা পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছিল। ওই মামলা এখনও তদন্ত পর্যায়ে আছে। একই ঘটনায় দুটি মামলা দায়েরের বিষয়ে জানতে চাইলে চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ জাহিদুল কবির বলেন, দুটি মামলার বিষয়ে আদালতকে অবহিত করা হবে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে যে মামলা হয়েছে, সেই মামলার তদন্তও শুরু করেছে পুলিশ।
মামলার এজাহারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে হুকুমের আসামি করা হলেও অন্যদের ঘটনাস্থলে উপস্থিত আসামি বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় যারা প্রকাশ্যে গুলি ছুড়েছিল, তাদের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। সশস্ত্র ক্যাডারদের গুলিতেই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
এই মামলায় উল্লিখিত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা হলোÑ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মহিউদ্দীন ফরহাদ (৪৫), আওয়ামী লীগ কর্মী মো. জালাল, যুবলীগ কর্মী মো. ফরিদ, এইচএম মিঠু, মো. ফিরোজ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মো. দেলোয়ার এবং যুবলীগ কর্মী মো. জাফর।
এছাড়া আসামি হয়েছেন চান্দগাঁও ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. এসরারুল হক, জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন ও চকবাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর মোস্তফা টিনু। এই তিনজনই আন্দোলনের সময় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলে পড়েন। সুমনকে আসকারদীঘির পাড় এলাকায় অস্ত্রধারীদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করতে দেখা গেছে। সেই ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। অন্য কাউন্সিলর নূর মোস্তফা টিনু চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একসময়ের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব। পরে জামিনে এসে কাউন্সিলর বনে যান। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকেই তিন কাউন্সিলর আত্মগোপনে রয়েছেন।
মামলার ৩১ নম্বর আসামি করা হয়েছে বাবর আলী নামের একজনকে। বাদীপক্ষের দাবি, এই বাবর আলীই মহানগর পুলিশের একসময়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী হেলাল আকবর বাবর। আরেক আসামি জাফরকে সঙ্গে নিয়ে বাবর গাড়িতে করে শিক্ষার্থীদের হামলার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন বলে অভিযোগ। বাবর এখন প্রকাশ্যে নেই। তার অস্ত্রগুলোও উদ্ধার হয়নি। চট্টগ্রাম মহানগরীর ত্রাস হিসেবে পরিচিত বাবর একসময় বিদেশে পালিয়ে ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফিরে যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে প্রতিপক্ষ ছাত্রলীগের লিমন গ্রুপের সঙ্গে সংঘাতে জড়ান। এই সময় জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। সেই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন বাবর। শেষে মামলার এজাহার থেকে তার নাম বাদ দেয় পুলিশ। এমনকি সন্ত্রাসী তালিকা থেকেও তার নাম বাদ দেওয়া হয়। সন্ত্রাসী তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে সক্ষম হলেও ত্যাগ করতে পারেননি অস্ত্রবাজি। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলজুড়ে বন্দরনগরীতে টেন্ডারবাজি, দখলবাজিসহ নানা অপকর্মে তার নাম সবসময়ই ছিল আলোচিত।
এছাড়া ষোলশহর এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে মুরাদপুর গিয়ে সংঘাতে জড়িয়েছিলেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া উপকমিটির সদস্য নুরুল আজিম রনি। এই রনি বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে গত ৯ আগস্ট শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক হয়েছেন। রনি হাটহাজারী উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় ভোট ডাকাতি করতে গিয়ে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। যদিও সেই অস্ত্র মামলার এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে ‘দিগম্বর’ করে ভিডিও ধারণ এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে মুরাদপুরে সংঘাতের দিন অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করা হেলমেট পরিহিত একজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছিল। যুবলীগ নেতা নামধারী এই অস্ত্রবাজের নাম ফিরোজ। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি ও ২০১৩ সালের জুলাইয়ে অস্ত্রসহ দুবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ফিরোজ। পরে যুবলীগের সন্ত্রাসী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সেদিন শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে শটগান দিয়ে গুলি ছুড়েছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের মো. দেলোয়ার, রিভলবার থেকে গুলি ছুড়েছিলেন যুবলীগের ফিরোজ, এইচএম মিঠু ও মো. জাফর। সরকার পতনের আগে ফিরোজের সঙ্গে কথা বলার সময় তার দাবি ছিল, ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে সেই ব্যক্তি তিনি নন। কিন্তু ফিরোজকে চেনেন এমন একাধিক ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন, ফিরোজই ছবির সেই অস্ত্রধারী ব্যক্তি। এছাড়া বহদ্দারহাট মোড়ে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া সন্ত্রাসীদের পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন চান্দগাঁও থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি মহিউদ্দিন ফরহাদ, মো. দেলোয়ার ও মো. জালাল।
তীব্র আন্দোলনের দিন নিউমার্কেট এলাকায় শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিতে সিটি কলেজ, জিপিও এবং রেলওয়ে স্টেশন প্রান্ত থেকে একযোগে হামলা চালায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসীরা। আগের রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে এই হামলা চালানো হয়েছিল। ওইদিন প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি করা সন্ত্রাসীদের এখনও শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
চান্দগাঁও থানার মামলার আসামি কাউন্সিলর সুমনকে ৪ আগস্ট দেখা গিয়েছিল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের নিয়ে আসকারদীঘি এলাকায় শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করতে। ওইদিনের ভিডিও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর থেকে সুমন আত্মগোপনে আছেন। এই সুমন সড়কে বাজার বসিয়ে চাঁদা আদায়সহ নানা অপকর্মে জড়িত।
ছাত্র আন্দোলনের চট্টগ্রাম অঞ্চলে সমন্বয়কদের একজন মো. ইমন। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের অস্ত্রধারী ক্যাডাররা যদি গ্রেপ্তার না হয় এবং তাদের অস্ত্রগুলো যদি উদ্ধার করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এই অস্ত্র দিয়ে ছিনতাই, চাঁদাবাজি হতে পারে। তাই আমরা পুলিশ প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছি, যাতে অবৈধ অস্ত্রধারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়।’
মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব অস্ত্রধারী সরকার পতনের আগে এলাকায় প্রকাশ্যে অবস্থান করলেও সরকার পতনের পর তারা আত্মগোপনে চলে গেছেন। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পুলিশের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে না, এই সুযোগে তারা আত্মগোপনে রয়েছেন। কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন বলেও তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই পুলিশের কাছে।