এস এম রানা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৪ ১০:৫৬ এএম
ছবি : সংগৃহীত
নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের প্রধান সমুদ্রবন্দর থেকে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ লাইন বিঘ্নিত হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানির অন্যতম প্রধান এ বন্দর থেকে স্বাভাবিক সময়ের মতো কন্টেইনার ডেলিভারি না হওয়ায় এবং কাস্টমসের কার্যক্রমে আংশিক বিঘ্ন ঘটায় বাড়ছে কন্টেইনারজট, কমছে রাজস্ব আয়। ভোগ্যপণ্যের বাজার গতিশীল না থাকার কারণেও বাণিজ্যিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, বন্দরে কমেছে কর্মব্যস্ততা। প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে কর্মচঞ্চল বন্দর। একই চিত্র কাস্টমসেও। দেশে ক্ষমতার পালাবদলের এই সময় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালনে বিরত রয়েছেন। ফলে অনিরাপদ হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম। বন্দর, কাস্টমস, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কর্মকর্তারা ঠিকভাবে অফিস করছেন না। একই কারণে রাস্তায় কম ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইম মুভারের চলাচল। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে ব্যাপক ভাটা পড়েছে। সড়ক যোগাযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার এই সময়ে বন্ধ রয়েছে ট্রেন চলাচলও। বন্দরে গাড়ি প্রবেশ কমেছে ব্যাপক হারে। আগে বন্দরে দৈনিক গাড়ি প্রবেশ করত অন্তত ১০ হাজার। সেখানে এখন আসছে এক হাজারেরও কম। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনারের জট বাড়ছে।
গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কন্টেইনার ডেলিভারি হয়েছে মাত্র ৩২৯ টিইইউ। অথচ স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন কন্টেইনার ডেলিভারি হয়ে থাকে চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টিইইউ। অনেকে বলছেন, সর্বনিম্ন কন্টেইনার ডেলিভারির রেকর্ড করল বন্দর।
নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের ২০টি অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ডিপোতেও। এসব ডিপো থেকে ডেলিভারি প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। অথচ রপ্তানি কন্টেইনারের প্রায় ৯৩ শতাংশ পরিচালিত হয় এসব ডিপোর মাধ্যমে। রপ্তানি বাণিজ্যে প্রায় এক মাস ধরে এমন মন্দাভাব চলছে।
সর্বশেষ গত সোমবার চট্টগ্রাম মহানগরীর আটটি থানা ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। পরদিন গত মঙ্গলবার সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চালু হলেও তা দ্রুতই বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল বুধবার এই সংখ্যা বাড়লেও সন্ধ্যার আগেই সব বন্ধ হয়ে যায়। এরই মধ্যে খবর আসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিএসআরএমের একটি কার্ভাড ভ্যান থেকে স্ক্র্যাপ পর্যন্ত লুট করে নেওয়া হয়। সড়কে পুলিশের অনুপস্থিতির সুযোগে লুটকারীরা লোহা উৎপাদনের এই কাঁচামাল লুট করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকরা। তারা বলছেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও পুলিশের অনুপস্থিতির কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অফিসে অনুপস্থিতি থেকে শুরু করে দেখা দিচ্ছে নানা বাণিজ্যিক সমস্যা।
আতঙ্কের মধ্যেই খুলল গার্মেন্টস কারখানা
নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেই গতকাল বুধবার থেকে চট্টগ্রামের প্রায় ৬০০ পোশাক কারখানা পুনরায় চালু হয়েছে। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো নেতিবাচক ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। বিজিএমইএর সহসভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘কারখানা মালিকরা নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আবার কার্যক্রম শুরু করেছেন। এখন যেহেতু কোনো আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নেই, অবশ্যই নিরাপত্তার হুমকি রয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা বিজিএমইএ থেকে একটি টিম গঠন করেছি।’ শিপমেন্ট ডেলিভারি প্রসঙ্গে বিজিএমইএ নেতা বলেন, ‘মনিটরিং টিমের তত্ত্বাবধানে এখন এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।’
বন্দরে ডেলিভারি ব্যাহত
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বন্দরের অভ্যন্তরে প্রায় ২ হাজার ৯৫৮ টিইইউ কন্টেইনার জাহাজে পাঠানোর মাধ্যমে লোডিং-আনলোডিং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ট্যাক্সেশন স্থগিত এবং নিরাপত্তার কারণে পরিবহনের ঘাটতির ফলে ডেলিভারি প্রায় স্থগিত ছিল। ফলে মাত্র ৩২৯ টিইইউ কন্টেইনার সরবরাহ করা হয়েছিল। গতকাল বুধবার আমদানিকারকদের কাছ থেকে বুকিং পাওয়া ২ হাজার ২৩৮ টিইইউ ডেলিভারির আশা করেছিল বন্দর। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রকৃত ডেলিভারি সংখ্যা পাওয়া যায়নি। কারণ প্রকৃত সংখ্যাটা নির্ভর করছিল পরিস্থিতির ওপর। শুল্ক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহের উন্নতি হতে পারে। যদিও তা এখনও নিয়মিত সময়ে সরবরাহকৃত কন্টেইনারের অর্ধেক।
ডেলিভারি কমে যাওয়ায় কন্টেইনার যানজট আবার বেড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার পর্যন্ত দেশের প্রধান বাণিজ্য বন্দরে ২০ ফুট টিইইউ কন্টেইনারের সংখ্যা ৪২ হাজার ৬৩৮টি, যা বন্দরের ধারণক্ষমতার ৮০ শতাংশ। স্বাভাবিক সময়ে এই সংখ্যা থাকে ৩২-৩৩ হাজারের মধ্যে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বন্দরে তীব্র কন্টেইনারজট দেখা হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, সাধারণত একটি জাহাজের বন্দরে পণ্য আনলোড এবং লোড করতে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে; এখন এটি ৭২ ঘণ্টারও বেশি লাগছে। ফলে বহির্নোঙরে জাহাজের জট হচ্ছে৷
এখন বহির্নোঙর থেকে বাল্ক কার্গোও কমে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরের নোঙর থেকে সাধারণত দুই হাজার লাইটার জাহাজ বাল্ক কার্গো লোড করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে চলাচল করে। এখন এই সংখ্যা ১০০-তে নেমেছে। এ বিষয়ে দ্য ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চট্টগ্রামের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, ‘মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে বাধা সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মালিকপক্ষ আত্মগোপনে চলে গেছে। তাই সমস্যা হচ্ছে।’
একই বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘পরিবহন সংকটে ডেলিভারি ব্যাহত হওয়ায় কন্টেইনারের জট বেড়েছে। যদি পুরোদমে ডেলিভারি শুরু হয়, তাহলে জট কমবে।’
বন্দর থেকে ডেলিভারি আবার শুরু হলেও গাড়ির ঘাটতির কারণে এটি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ মালিকরা তাদের ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যানগুলোকে নিরাপত্তার ভয়ে রাস্তায় নামাতে রাজি নয়। বাংলাদেশ ট্রাক অ্যান্ড কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী জাফর আহমেদ বলেন, ‘দেশে এখন কোনো আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নেই। রাস্তায় আমাদের যানবাহনে হামলা হলে অভিযোগ করার কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। তাই পরিবহন সংস্থা ও মালিকরা পণ্যের দায়িত্ব নিচ্ছে না।’
পণ্যবাহী ট্রেন স্থগিত
কন্টেইনারজটে ১৯ জুলাই থেকে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্থগিত। ৬০টি কন্টেইনার বহনকারী এক জোড়া ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যায় এবং ঢাকা থেকে প্রতিদিন ৬০টি কন্টেইনার পরিবহন করে। এই বিষয়ে রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গত ১ আগস্ট ট্রেনে পণ্য পরিবহন শুরু হয়েছিল। কিন্তু পুনরায় স্থগিত করা হয়। আবার কবে চালু হবে সে সিদ্ধান্ত হয়নি।’
আইসিডিতে রপ্তানি পণ্য পরিবহন ৫০ শতাংশ
যদিও আরএমজি কারখানা থেকে রপ্তানিপণ্য অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ডিপোতে পরিবহন শুরু হয়েছে, তবে তা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫০ শতাংশ কম। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইসিডিএ) তথ্য অনুযায়ী, বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার একক কন্টেইনার পণ্য রপ্তানি হয়। বেসরকারি ডিপোগুলোর ওপর চাপের কারণে রপ্তানি বিলম্বিত হয়েছে। ফলে দেশব্যাপী কারখানার পণ্য এখন ১৯টি ব্যক্তিগত ডিপোতে জমা হচ্ছে। বিআইসিডিএর মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘গতকাল থেকে রপ্তানি পণ্যবোঝাই কন্টেইনার পুরোদমে ফের শুরু হয়েছে। কিন্তু যানবাহন ঘাটতির কারণে সারা দেশে আরএমজি কারখানা থেকে পণ্য পরিবহন এখনও ৫০ শতাংশেরও কম।’
নিরাপত্তা উদ্বেগে বেশিরভাগ দোকান বন্ধ
গত সোমবার সন্ধ্যায় রাস্তার পাশের কয়েকটি শোরুমে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় বন্দরনগরীর অনেক দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। যারা খুলেছিল তারা তাদের অর্ধেক শাটার নামিয়ে রেখেছিল। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক সাঈদ খোরশেদ আলম বলেন, ‘গত সোমবার সন্ধ্যায় দুর্বৃত্তরা পোশাক ব্র্যান্ড জেন্টল পার্ক অ্যান্ড ইয়েলো, ইলেকট্রনিক্স ব্র্যান্ড ওয়ালটনের শোরুম এবং রাস্তার পাশের অনেক দোকানে হামলা চালায়। দুর্বৃত্তরা শুধু ব্যবসা ভাঙচুরই করেনি, দোকান থেকে মালামালও লুট করেছে।’ তিনি বলেন, ‘গত মঙ্গলবার সব দোকানপাট বন্ধ রেখেছিলাম। আজ (বুধবার) দোকানগুলো আংশিক খুলেছি, কিন্তু বিক্রি কম। কারণ মানুষ এখনও ভয়ে ভুগছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেনাবাহিনীর সদস্যরা বাজার পরিদর্শন করেছেন এবং ফোন করলে নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী এখনও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।’
খাতুনগঞ্জ বাজারে ব্যবসায় ৮০ শতাংশ পতন
দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে অন্যতম ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে। এই বাজারে বাণিজ্য কমেছে ৮০ শতাংশ। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সগীর আহমদ বলেন, ‘সাধারণত বাজারে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এখন ৮০ শতাংশ কমে মাত্র ৩০০-৪০০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।’