আমানত উল্যাহ, কমলনগর (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৪ ১১:০২ এএম
আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৪ ১১:১০ এএম
জোয়ারের পানিতে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত। সম্প্রতি রঘুনাথপুর পল্লীমঙ্গল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তোলা। প্রবা ফটো
লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলায় মেঘনার অস্বাভাবিক জোয়ারে এক সপ্তাহ ধরে বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়েছে। জোয়ারের পানিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কবলে সাধারণ মানুষ। নষ্ট হচ্ছে রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। ক্ষতির কবলে আমন চাষিরাও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে গত কয়েক দিনে পাঁচ থেকে সাত ফুট বেশি উচ্চতায় জোয়ারের পানি প্রবাহিত হওয়ায় প্লবিত হচ্ছে বিভিন্ন এলাকা। উপজেলার চরগাজী, বড়খেরী, চররমিজ, রঘুনাথপুর, চরগোসাই, বিবিরহাট, চরআলগী চরমেহার, চরনেয়ামত, মুন্সিরহাট, সেবাগ্রাম, বাংলাবাজার, আসলপাড়া, চরআলেকজান্ডার, চরআবদুল্যাহসহ ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অনেকেরই বসতভিটায় পানি উঠে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির ও খাবারের অভাবসহ বহুমুখী সমস্যায় দেখা দিয়েছে বিপর্যয়।
স্থানীয়রা জানায়, বেড়িবাঁধ না থাকায় রামগতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা হুমকির মুখে। অমাবস্যা, পূর্ণিমাসহ বর্ষা মৌসুমে প্রায়শই এসব এলাকায় অস্বাভাবিক জোয়ারে প্লাবিত হয়। মাছের ঘের, পুকুর, কৃষিজমি, বীজতলা, রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। প্রতিদিন দুবার জোয়ারে প্লাবিত হওয়ায় দিশেহারা কৃষক ও মৎস্য চাষিরা। তাদের অভিযোগ, মেঘনার তীর সংরক্ষণ বেড়িবাঁধটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ না হওয়ায় প্রতিনিয়তই জোয়ারের পানিতে ভাসতে হচ্ছে।
সরেজমিনে উপজেলার চরগোসাই ও আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কাঁচা-পাকা গ্রামীণ সড়কগুলো জোয়ারের পানির স্রোতে ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তেমনই একটি সড়ক জনতা বাজার-মুন্সিরহাট সড়ক। তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সড়কের বেশিরভাগ অংশই ভেঙে গেছে। দুটি কালভার্ট দেবে গেছে। এসব এলাকার অন্তত ২০ হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। বসতঘরে জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় অনেক পরিবারকেই দেখা গেছে পুরোনো বেড়িবাঁধের কাছে আশ্রয় নিতে।
চরআলগী এলাকার কৃষক ছৈয়দ আলী, শাহাবউদ্দিনসহ কয়েকজন জানান, অন্যান্যবারের তুলনায় জোয়ারের পরিমাণ এবার অনেক বেশি। এভাবে আর কয়েক দিন থাকলে বীজতলা নিয়ে বিপদে পড়ে যাব। একই কথা জানিয়েছেন চরগোসাই, বড়খেরী, বালুরচর, মুন্সিরহাট এলাকার বাসিন্দারাও। তাদের দাবি, বেড়িবাঁধ হলে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় প্রায় ২০ হেক্টর জমির বীজতলা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। দীর্ঘসময় ধরে জোয়ারের লোনা পানিতে তলিয়ে থাকায় ইতোমধ্যে চাষযোগ্য জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জোয়ারের পানিতে বীজতলাসহ কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের পথঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রামগতি আছিয়া পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, রঘুনাথপুর পল্লীমঙ্গল উচ্চ বিদ্যালয়, রামগতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রঘনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চররমিজ দক্ষিণ-পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালুরচর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসাসহ ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে জোয়ারের পানি।
বড়খেরী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়নের পাঁচটি ওয়ার্ড মেঘনার তীরবর্তীতে হওয়ায় জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কয়েকটি পবিবারের ঘরের ভিটি জোয়ারে ভেঙে গেছে। রঘুনাথপুর এলাকায় একটি মসজিদের প্রায় পুরোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইউপি চেয়ারম্যান হাসান মাকসুদ মিজান জানান, ঘূর্ণিঝড় রেমাল সর্বস্বান্ত করেছে। অনেকে ধারদেনা করে বাড়িঘর ঠিক করলেও এখন আবার জোয়ার হানা দিয়েছে। সরকার থেকে ইতোমধ্যে ২৫ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা উপজেলায় পাঠানো হয়েছে।
আলেকজান্ডার ইউপি সূত্রে জানা গেছে, জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া তিন টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। মাসখানেক আগে সাড়ে ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা জনতা বাজার-মুন্সিরহাট সড়কের পুরোটাই জোয়ারের পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। অস্বাভাবিক জোয়ারসহ অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ ইউনিয়নই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইউপি চেয়ারম্যান শামীম আব্বাছ সুমন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো প্রতিবারই মেরামত করা হয়, অতিরিক্ত জোয়ারে প্রতিবারই ভেঙে পড়ে। বেশ কয়েকটি স্থানে সাঁকো তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ তারেক বলেন, ‘জোয়ারের পানি সঙ্গে সঙ্গে নেমে যাওয়ায় বীজতলার তেমন ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তবে জমে থাকা পানিতে কিছুটা ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ আমজাদ হোসেন বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাসমূহ পরিদর্শন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু এলাকায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।’
জোয়ারের পানির উচ্চতার কথা স্বীকার করে লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ্জামান খান বলেন, ‘মেঘনার তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’