কোটা আন্দোলনে নিহত
তৈয়বুর রহমান সোহেল, কুমিল্লা
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৪ ১১:০৬ এএম
আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৪ ১১:১০ এএম
তাজুল ইসলাম। ছবি : সংগৃহীত
একটি পুরোনো মাইক্রোবাস ভাড়ায় দিয়ে সংসারের খরচ চালাতেন কুমিল্লার বরুড়ার তাজুল ইসলাম। গত ১৮ জুলাই রাজধানীতে কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে র্যাব ও পুলিশের সংঘর্ষ চলাকালে উত্তরা আজমপুর আমির কমপ্লেক্সের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি নিহত হন। পরদিন কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়াই শরীরে গুলিসহ তাকে দাফন করা হয়।
তাজুলের একমাত্র ছেলে রেদোয়ান আহমেদ সিয়াম বলে, সেই দিন বাবা আশুরার রোজা রেখেছিলেন, সারা দিন রেন্ট-এ কারের পাশে উত্তরার একটি মসজিদের ভেতর ছিলেন। বিকালে ইফতারি নিয়ে বাসায় ফিরবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাবার আর ফেরা হয়নি। কোথাও থেকে গুলি এসে বাবার বুকটা ঝাঁজরা হয়ে যায়। বুকের ভেতর গুলি রেখেই ময়নাতদন্ত ছাড়া পরদিন তাকে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা উত্তর শিলমুড়ি ইউনিয়নের গামারোয়া গ্রামে দাফন করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত মো. তাজুল ইসলাম কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার উত্তর শীলমুড়ি ইউনিয়নের গামারোয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ঢাকার পূর্বাচল এলাকার কাঞ্চনব্রিজ সংলগ্ন উলুখোলা এলাকায় বাস করতেন। ঢাকার উত্তরা আজমপুর এলাকায় রেন্ট-এ কারের ব্যবসা ছিল। একসময় গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাতেন। বয়সের কারণে একজন চালক রেখেছিলেন। বসতেন রেন্ট-এ কারের অফিসে।
১৫ বছরের একমাত্র ছেলে সিয়াম সংসারের হাল ধরতে টেইলারিংয়ের কাজ শিখছেন। সিয়াম বলে, ঘটনার দিন ঢাকা শহরের গোলাগুলির খবরে বাবাকে আমরা রাস্তায় বের হতে নিষেধ করেছিলাম। বাবা দুপুরে জানিয়েছিলেন উত্তরার একটি মসজিদের ভেতর আছেন। চালককেও গাড়ি রাস্তায় বের করতে দেননি। বিকালে ইফতারি নিয়ে বাসায় আসবেন বলে জানিয়েছিলেন। বিকালে সংঘর্ষের সময় রাস্তায় উঁকি মারতেই গুলিবিদ্ধ হন। ফোনে খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে বাবার গুলিবিদ্ধ মরদেহ দেখতে পাই।
সেদিনের পরিস্থিতি বর্ণনা করে সিয়াম বলে, তখন হাসপাতালে রক্তাক্ত অনেক মানুষের চিৎকার আর আহাজারিতে দিশেহারা হয়ে পড়ি। এ বয়সে এত রক্ত কখনও দেখিনি।
সিয়াম বলে, ‘আমার বাবার তো কোনো অপরাধ ছিল না। তিনি কোটা আন্দোলনের পক্ষে-বিপক্ষে ছিলেন না। তাকে কেন গুলি করে মারা হলো? এখন কীভাবে চলবে আমাদের সংসারের খরচ? সঞ্চয় বলতে কিছুই নেই। কার কাছে বিচার চাইব? বাবার মৃত্যুর শোকে মাও এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।’
নিহত তাজুলের ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি ভাড়ায় মাইক্রোবাস চালান। ঘটনার দিন নারায়ণগঞ্জে ছিলেন। অন্য চালকদের কাছে খবর পেয়ে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে গিয়ে ভাইয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন।
রফিকুল বলেন, ‘এ কেমন আন্দোলন? রাস্তায় কেন নিরপরাধ লোককে গুলিতে মরতে হবে? অন্যদের নিকট জেনেছি, আমার ভাই বাসায় ফিরতে চেয়েছিলেন, তাই রাস্তার পরিস্থিতি দেখতে বের হন, এ সময় হঠাৎ গুলি এসে বুকে লাগে। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ভাই মারা যাওয়ার কারণে চিকিৎসকরা মরদেহের ভেতর থেকে আর গুলিও বের করেননি। এ অবস্থায়ই গ্রামের বাড়িতে নিয়ে তাকে দাফন করা হয়। ভাইয়ের মৃত্যুতে তার সংসারটি অসহায় হয়ে গেল। সরকারি কোনো সহায়তা না পেলে তাদের রাস্তায় বসতে হবে।’