আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৪ ০৯:৫৫ এএম
আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৪ ১১:৩০ এএম
নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের চট্টগ্রাম আদালতে হাজিরা শেষে প্রিজন ভ্যানে কারাগারে নেওয়ার সময় স্বজনদের আকুতি। ছবি: নিপুল কুমার দে
রবিবার বেলা সাড়ে ৩টা। চট্টগ্রাম জজ আদালতের হাজতখানা থেকে আসামিদের গাড়িতে তুলছে পুলিশ। হাজতখানা থেকে গাড়ি পর্যন্ত ভিড় জমে আছে স্বজনদের। নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করে আসামিদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে সারিবদ্ধভাবে গাড়িতে তুলছিল পুলিশ। ওই সময় সেই বেষ্টনী ভেদ করে একজনকে দেখা গেল ছুটে গিয়ে ২০ বছর বয়সি এক তরুণকে জড়িয়ে ধরতে। পরে পুলিশ তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। গাড়িতে তোলার সময় পর্যন্ত সেদিকে অপলক তাকিয়ে ছিলেন মাঝবয়সি ওই ব্যক্তি।
পরে কথা বলে জানা গেল, তার নাম মোস্তফা শেখ। পেশায় রাজমিস্ত্রি। প্রিজনভ্যানে তোলার সময় যাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন সে তার ছেলে, নাম রমজান শেখ। রমজান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তাদের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলায়। চট্টগ্রামের মুরাদপুরের ফরেস্ট গেট এলাকায় একটি ভাড়াবাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকেন রমজান। সেখানে একটি কোচিং সেন্টারে পড়ান তিনি।
মোস্তফা শেখের দাবি, রমজানকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর তাকে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পাঁচলাইশ থানা-পুলিশ। এক সপ্তাহের মাথায় নাশকতার আরও একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। রমজান ছাড়াও গতকাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের মধ্যে চবি ও চুয়েটের দুই শিক্ষার্থীর এক দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তাদের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে মামলায়।
আদালতের জেনারেল রেকর্ড শাখা এবং আইনজীবীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর দায়ের করা একাধিক মামলায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ গতকাল পর্যন্ত ৫১৬ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরাও রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ১২০ জন শিক্ষার্থী। আবার শ্রমজীবীরাও আছেন। আইনজীবীদের মতে, গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে শ্রমিকরাও রক্ষা পাচ্ছেন না।
রমজানকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে তার বাবা মোস্তফা শেখ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গত ১৮ জুলাই দুপুর ১২টার দিকে ৮-১০ জন যুবক বাসা থেকে রমজানকে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজন রমজানের বন্ধু। ওই যুবকরা বলেছিল, রমজানের সঙ্গে কিছু কথা আছে। কথা শেষে তাকে বাসায় পৌঁছে দেবে। কিন্তু যুবকদের কথাবার্তা উগ্র ধরনের মনে হওয়ায় তিনি নিজেও পিছু পিছু যান। মোস্তফা শেখ দাবি করেন, শুরুতে রমজানকে চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখান থেকে পাঁচলাইশ থানায় নিয়ে যায়। রমজানকে ওই থানায় রেখে যুবকেরা চলে যায়।
ছেলের সঙ্গে বাবাও তখন পাঁচলাইশ থানায় ছিলেন। রাত ৯টার পর একটি মাইক্রোবাসে চড়ে সাদা পোশাকের লোকজন এসে রমজানকে নিয়ে যায়। এই সময় মোস্তফা শেখ ওই মাইক্রোবাসে উঠতে চাইলে তারা নিজেদের র্যাব সদস্য বলে পরিচয় দেয়। এরপর দুদিন ছেলের কোনো সন্ধান পাননি বাবা। ২০ জুলাই রাতে পাঁচলাইশ থানা থেকে জানানো হয়, ‘রমজানকে থানায় আনা হয়েছে।’ থানায় গিয়ে তিনি ছেলের দেখা পান।
২০ জুলাই রাতে রমজানকে মুরাদপুর মোড়ে সংঘর্ষ, হত্যা ও নাশকতার অভিযোগে দায়ের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এই ঘটনার সাত দিন পর গতকাল রমজানকে আরও একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
ছেলেকে আদালতে হাজির করা হবে জেনে মোস্তফা শেখ আদালতে আসেন স্ত্রীকে নিয়ে। সারা দিন আদালতেই ছিলেন তারা। মোস্তফা শেখ বলেন, ‘১৩ জুলাই আমার ভাবি মারা গেছেন। তার লাশ নিয়ে আমরা পিরোজপুর গেছি। রমজানেরও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শরীর ভালো না থাকায় সে যেতে পারেনি। আসার পরদিন এই ঘটনা। ছেলেটার জীবন এলোমেলো হয়ে গেল।’
সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন আদালতে ছিল কোটা সংস্কার ইস্যুতে বিভিন্ন থানার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামি ও স্বজনদের ভিড়। পুলিশের পক্ষ থেকে গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ড আবেদন করা হয়। অন্যদিকে গ্রেপ্তারকৃতরা জামিন চান। তবে এদিন কারও জামিন আবেদন মঞ্জুর হয়নি। এদের মধ্যে রমজানের মতো অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। তাদের একজন মোহসেন আলম। তিনি চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র। ১৭ জুলাই তাকে জিইসির মোড় থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে খুলশী থানায় দায়ের হওয়া নাশকতার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন কারাগারে পাঠানো হয়। রবিবার রিমান্ড আবেদনসহ মহানগর ষষ্ঠ আদালতে হাজির করা হয়। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মোহসেন বারবার খোঁজ নিচ্ছিলেন তার পরিবারের কেউ এসেছে কি না? তবে শেষ পর্যন্ত কেউ আসেনি। আসেনি মোহসেনের আইনজীবীও। শুনানি শেষে অন্য আইনজীবীরা বলেন, ‘আদালত সবার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন।’ এসব মামলায় শ্রমজীবী মানুষকেও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে দাবি গ্রেপ্তারকৃতদের অনেক স্বজনের। তেমনই একজন সাকিব। তিনি সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারী। পরিবার নিয়ে থাকেন হালিশহরের বড়পোল মোড়ে। ওই রাতে কাজ শেষে ফেরার পথে হালিশহর থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে খুলশী থানায় হস্তান্তর করা হয়। সাকিবের মা বলেন, ‘কোনো কারণ ছাড়াই ধরে নিয়ে গিয়ে আসামি করা হয়েছে।’
এদিন কোতোয়ালি থানায় করা একটি মামলায় জামায়াত-শিবিরের পাঁচ নেতাকর্মীকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম জুয়েল দেব। তারা হলেনÑ রসুলবাগ ওয়ার্ড ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক ও চুয়েটের শিক্ষার্থী ফাহিম উদ্দিন আল সাবিক, চান্দগাঁও ওয়ার্ড জামায়াতের কর্মী হারুনুর রশীদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলের শিক্ষার্থী ও জামায়াতকর্মী আলফাজ আহমেদ, রসুলবাগের শাহ আমানত ইউনিটের ওয়াহিদুল ইসলাম, শিবিরকর্মী ওমাউল ইসলাম সাফিন। এছাড়াও চান্দগাঁও থানার একটি মামলায় চারজনকে এক দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। তারা হলেনÑ আলমগীর, আবদুল্লাহ আল জোবায়ের, তাজউদ্দিন রিটন, নূর আলম। চারজনই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়াও শনিবার রাতে বায়েজিদ বোস্তামি থানার বালুচড়া এলাকা থেকে চট্টগ্রামের শিবির ক্যাডার মো. সরওয়ারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নগরীর বহদ্দারহাটে সহিংসতার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তার নাম তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) জাহিদুল কবির। বহদ্দারহাট মোড়ের সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল কড়া নিরাপত্তার মধ্যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ। শুনানি শেষে সরওয়ারসহ তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
অন্যদিকে রমজানকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে পাঁচলাইশ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সন্তোষ কুমার চাকমা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রমজান শেখকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি। তাকে ১৮ জুলাই রাতে কে থানায় রেখে গেল? কোনো অফিসারের কাছে কেউ হস্তান্তর করেছে কি না, সেই তথ্য আমার জানা নেই। আমি জানি, ২০ জুলাই র্যাবের পক্ষ থেকে রমজান শেখকে থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। এরপর মারামারি ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। সংঘর্ষের সময়ের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে রমজানকে শনাক্ত করা হয়েছে।’