পাবনার সাঁথিয়া
রফিকুল ইসলাম সান, বেড়া-সাঁথিয়া (পাবনা)
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৪ ১৮:১০ পিএম
বাঁশ বেত দিয়ে শিল্পের কারিগর বিনয় চন্দ্র দাস পণ্য তৈরি করছেন। সম্প্রতি পাবনার সাঁথিয়ার মাধবপুর এলাকা থেকে তোলা। প্রবা ফটো
জনজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেতশিল্প। বাঁশ-বেতের ঝাড় উজাড় করে বসতভিটা তৈরি, ইটের ভাটায় পোড়ানোর কারণে সংকট দিন দিন বাড়ছে। অথচ একসময় গৃহস্থালির বেশিরভাগ পণ্য তৈরি হতো বাঁশ, বেত দিয়ে। অনেকে জীবিকা নির্বাহ করত শিল্পের ওপর। বাড়ির পাশে বাঁশঝাড় আর বেত বনের ঐতিহ্য গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ। যেখানে গ্রাম, সেখানে বাঁশঝাড়- এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় ইটের ব্যবহারের কারণে বাঁশ আর বেত ঝাড় চোখেই পড়ছে না।
সময়ের পরিবর্তনে বাঁশ ও বেতশিল্পের জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিক। প্রায় সবকিছুতে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ায় দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ ও বেতশিল্প। সংকটে রয়েছে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররা। অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়। অন্যান্য পেশার মতো সরকারি সহায়তা বা ভর্তুকি পেলে হয়তো টিকে থাকতে পারবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাঁশ-বেতশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল দুই শতাধিক পরিবার। তারা বাঁশ ও বেতের আসবাবপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করত। বর্তমানে ৯০-১০০ জন এ পেশায় কর্মরত আছে।
কারিগররা জানান, বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্যের কদর এখন আর তেমন নেই বললেই চলে। একসময় গ্রামীণ জনপদের মানুষ গৃহস্থালি, কৃষি ও ব্যবসা ক্ষেত্রে বাঁশ ও বেতের তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার করত। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য। এখন বাঁশ ও বেত কমে যাওয়ায় দামও বেড়ে গেছে। ফলে বাঁশ ও বেতের সামগ্রী তৈরিতে ব্যয়ও বেশি হচ্ছে। সৌখিন মানুষ ঘরে ঐতিহ্য প্রদর্শনের জন্য বাঁশ ও বেতের সামগ্রী বেশি দাম দিয়ে কিনলেও মূলত ব্যবহারকারীরা বেশি দাম দিতে চায় না। অথচ কয়েক বছর আগেও বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসের কদর ছিল। চেয়ার, টেবিল, বইয়ের শেলফ, মোড়া, কুলা, চালুন, ঝুড়ি, কলমদানি, আয়নার ফ্রেম, দাঁড়িপাল্লা, খালই, দোলনা, কাঠা, ধামা, শরপশ, টুড়ি, দোয়াড়, খৈচালনা, টুকড়ি, টোনা, মাছ ধরার চাঁই, মাথাল, চাটাই থেকে শুরু করে ড্রইংরুমের আসবাবপত্র তৈরিতেও বাঁশ ও বেত প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হতো। তবে মাছ ধরার পলো, হাঁস-মুরগির টোবা বা খাঁচা, শিশুদের দোলনা এখনও গ্রামাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
সাঁথিয়ার মাধপুর বাজার এলাকার বাঁশ ও বেতশিল্পের কারিগর বিনয় চন্দ্র দাস। তিনি বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে এ পেশা। কিন্তু আধুনিক যুগে প্লাস্টিকের পণ্য বাজার দখল করায় আমাদের তৈরি পণ্য আর আগের মতো চলে না। এ ছাড়া পণ্য তৈরির উপকরণের দাম বেশি। কিন্তু সে তুলনায় আমাদের পণ্যের দাম কম। খরচ বাদে যা আয় হয় তা দিয়ে পণ্য তৈরির উপকরণ কিনব কী করে আর সংসার চালাব কী করে। অন্যান্য পেশার মতো আমাদের পেশায় সহজ শর্তে ঋণ ও ভর্তুকি পেলে একটু ভালোভাবে চলা যেত।
একই কথা জানিয়ে অশোক চন্দ্র দাস, প্রদীপ চন্দ্র দাসসহ কয়েকজন বলেন, সাঁথিয়ার অনেকেই এ পেশা ছেড়ে কেউ নাপিতের কাজ, স্বর্ণকার এবং দিনমজুর হিসেবে কাজ করছে।
সাঁথিয়ার জোড়গাছা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, পূর্বে গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিকের সামগ্রী। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে পেশার সঙ্গে জড়িতদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
সাংবাদিক এম রুহুল আমিন বলেন, আগে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহার করা হতো। আমাদের বাড়িতেও বাঁশ ও বেতের জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেগুলো এখন বিলুপ্তির পথে। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এ পেশায় যারা জড়িত তাদের সহযোগিতা করতে হবে।
উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আলমগীর কবির বলেন, বাঁশ ও বেত কুটিরশিল্পের মধ্যে পড়ে। বাঁশ-বেত না থাকলে কুটির বা হস্তশিল্পের ওপড় প্রভাব পড়বে। সেজন্য বন বিভাগের দায়িত্ব ও হলো বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে আলাদাভাবে প্রকল্প নিয়ে বাঁশ-বেত রোপণ করা। সেগুলোর পরিচর্যা করে সংরক্ষণ করা।
পাবনা বিসিক শিল্পনগরীর উপমহাব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, বিসিক প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিল্প এবং কুটিরশিল্প নিয়ে কাজ করছে। যদি কেউ ঋণ বা আর্থিক সহযোগিতার জন্যে আসে তাহলে অবশ্যই তাদের সহায়তা করব।