সংঘর্ষে নিহত শ্রমিকের স্ত্রীর প্রশ্ন
চট্টগ্রাম প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৪ ২২:০২ পিএম
চট্টগ্রামে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংঘর্ষে নিহত শ্রমিক ফারুকের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েন। মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মেডিকেলের জরুরি বিভাগ থেকে তোলা। প্রবা ফটো
চট্টগ্রাম মেডিকেলের জরুরি বিভাগের দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে বিলাপ করছিলেন সীমা আক্তার। পাশে তার ১২ বছরের ছেলে ফাহিম। বুক চাপড়িয়ে বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘দুইটা ছেলেমেয়ে নিয়ে এখন আমি কোথায় যাব? তারা কাকে বাবা ডাকবে? লোকটা কাজ শেষে খেতে বের হয়েছিল। গুলি করে মেরে ফেলল। তার অপরাধ কী? কোন অপরাধ না করে এভাবে একটা মানুষ মারা গেল! দেশের এই অবস্থা কেন? সে তো গণ্ডগোলের মধ্যে ছিল না। জানেও না। তাহলে তাকে কেন গুলি করা হল?’
মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় কোটা সংষ্কার আন্দোলন ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে মারা যাওয়া মো. ফারুকের স্ত্রী সীমা আক্তার। ফারুক ষোলকবহর এলাকার একটি ফার্নিচারের দোকানের শ্রমিক ছিলেন। কাজ শেষে দুপুরে খেতে বের হয়ে বুকে গুলিবিদ্ধ হন ফারুক। পরে তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
তবে ফারুক কার গুলিতে নিহত হয়েছেন তাৎক্ষণিকভাবে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ বলছেন, ছাত্রলীগের দিক থেকে গুলি করা হয়েছে।
মো. ফারুক নোয়াখালীর স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি কুমিল্লার চান্দিনা এলাকায় বিয়ে করেন। স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকায় থাকতেন তিনি। ছেলে ফাহিম বাগমনিরাম সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। মেয়ে ফাহিমা বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কেজি শ্রেণির ছাত্রী।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সীমা আক্তার বলেন, ‘সে তো কাজে যাওয়ার সময় খাবার নিয়ে যায় না। দুপুরে বাইরে হোটেলে খায়। আজও খেতে বের হওয়ার পর গুলিবিদ্ধ হল। তাকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার মতও কেউ ছিল না। অনেকক্ষণ নাকি সে রাস্তায় পড়ে ছিল। পরে দুটো ছেলে তাকে হাসপাতাল আনে। তাদের সে বলেছিল ভাই আমার দুটা সন্তান। আমাকে একটু হাসপাতাল নিয়ে যান আমাকে একটু বাঁচান। হাসপাতালে আনার সময়েও রাস্তায় জ্যাম। গাড়ি চলে না।’
সীমা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে মেয়েরা এখনো জানে না, তাদের বাবা মারা গেছে। তাদের এখন কি বলব? আমাকে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বলে গেল ফিরতে ফিরতে রাত হবে আজ। এখন দেখি তিনি বেঁচে নাই। আমরা এখন কি করে চলব, বাঁচব!’
ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন বাবা দুলাল। তিনি বলেন, ‘সকালে আমার ছেলে কাজে গিয়েছিল এখন দেখছি ছেলে বেঁচে নাই। আল্লাহ এ কি হলো? আমার নাতি নাতনিদের এখন কি বলব। তাদের কে দেখবে?’
মঙ্গলবার সকাল থেকে চট্টগ্রামের ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশনে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। দুপুরের দিকে মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট এলাকায় অবস্থান নেন। তিনটা থেকে নগরের মুরাদপুর ২ নম্বর গেট এবং ষোলশহর আশপাশের এলাকায় কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এতে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র দেখা গেছে। কোটা আন্দোলনকারীরাও লাঠিসোটা নিয়ে অবস্থান করতে দেখা যায়।
সংঘর্ষে ফারুক ছাড়াও আরও দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। তারা হলেন, চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরাম ও ওমর গণি এমইএস কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত। দুজনই কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মী। এদের মধ্যে ওয়াসিম চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তার ফেসবুক পেজেও এই পরিচয় লেখা আছে। শান্তর ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যায়নি।
এই ঘটনায় ৫০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ছাত্রলীগেরও কমপক্ষে ২০ জন নেতাকর্মী রয়েছে। তাদের মধ্যে জালাল নামে মহসীন কলেজ ছাত্রলীগের এক নেতার অবস্থা গুরুতর। চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানা পুলিশের উপ পরিদর্শক নুরুল আলম আশেক বলেন, ‘জালালের চোখ ও মাথায় গুরুতর আঘাত আছে। আহতদের মধ্যে ৮-১০ জনের অবস্থা বেশ গুরুতর।’