প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৪ ১৩:২১ পিএম
আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৪ ১৫:০০ পিএম
বৃষ্টির পানি আর পাহাড়ি ঢলে ভাসছে কুড়িগ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। সোমবা কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা
টানা দুই সপ্তাহের বন্যায় কুড়িগ্রামে কৃষির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলার ৯ উপজেলার ৮ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, ক্ষতির পরিমাণ ১০৫ কোটি টাকার বেশি।
এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গঙ্গা (পদ্মা) নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আবার আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি আবহাওয়া অধিদপ্তর আজ মঙ্গলবার রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে ভারী বর্ষণের আভাস দিয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি সমতল সার্বিকভাবে কমছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় এসব অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। এই সময়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর কাছাকাছি জামালপুর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
কুড়িগ্রামে কৃষিতে ক্ষতি ১০৫ কোটি টাকা
আমাদের কুড়িগ্রাম প্রতিবেদক জানান, টানা দুই সপ্তাহ পর জেলার সব নদ-নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে কৃষির ক্ষয়ক্ষতি। ক্ষেতের মাচান থাকলেও নেই সবুজ গাছ। পানির নিচ থেকে ভেসে উঠছে চীনাবাদাম, পাট, ঢেঁড়স, পটোল ও আমন বীজতলা এবং বিভিন্ন সবজির পচে যাওয়া ক্ষেত।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় চলতি বন্যায় কৃষিতেই ক্ষতি হয়েছে ১০৫ কোটি টাকা সমপরিমাণ মূল্যের ফসল ও ফসলের ক্ষেত। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার।
কুড়িগ্রাম সদরের পাঁচগাছী ইউনিয়নের সিতাই ঝাড় এলাকার কৃষক আবু বক্কর বলেন, আমার তিন বিঘা জমির পটোলের আবাদ শেষ। এখনও বাড়ির চারদিকে পানি। আমন বীজতলা করতে পারছি না। আমন আবাদও মনে হয় করা হবে না।
হলোখানা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মমিন বলেন, বন্যার পানিতে আমন বীজতলা সব নষ্ট হয়ে গেছে। সময় প্রায় শেষ। নতুন করে বীজ রোপণ করে চারা লাগানো সম্ভব নয়। এবার বন্যার পানি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় সব ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, চলতি দ্বিতীয় দফা বন্যায় কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলায় কৃষি সেক্টরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করছি। এ ছাড়াও কৃষকরা যেন আমন আবাদ ভালোভাবে করতে পারে সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।
লালমনিরহাটে ক্ষতিগ্রস্ত ২১ হাজার কৃষক
লালমনিরহাট প্রতিবেদক জানান, প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় বন্যায় জেলার ৬৪ দশমিক ৬০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার ৮৫০টি। তা ছাড়া বন্যার পানি নেমে গেলেও কাজ-কর্মহীন বানভাসিদের খাদ্য ও অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে। এদিকে নদীভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে ভাঙনকবলিতরা। গত ২০ দিন যাবৎ লালমনিরহাটের ৫ উপজেলার ২০ ইউনিয়নের ১০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতির শিকার হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়েক দিন আগে উজানের ঢলে ও ভারী বর্ষণে চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বসতভিটা পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে দশ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে পানি কমলেও থামছে না ভাঙন। অধিকাংশ বানভাসি মানুষ শ্রমিক, দিনমজুর ও কৃষক। বন্যায় কাজকর্ম না থাকায় তারা বেকার বসে আছেন। এ কারণে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানি সংকটের কারণে অনেকে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফসল নষ্ট হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। তাদের গবাদি পশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। আবার আয়-রোজগার না থাকায় চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে পারছে না।
সদর উপজেলার রাজপুর গ্রামের লাইজু হোসেন জানান, আমরা নানা সংকটে অসহায় হয়ে পড়েছি। আয় রোজগার নেই। খাবার কেনার টাকা নেই। পানির মধ্য দিয়ে সার্বক্ষণিক চলাচল করায় নারী-পুরুষ-শিশু অনেকের হাত-পায়ে ঘা হচ্ছে। ডায়রিয়াসহ নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট।
সবচেয়ে বেশি ভাঙন এলাকা হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান বলেন, আমার ইউনিয়নে পানি নেমে যাওয়ায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। কৃষিজমিতে লাগানো ধান বালু দিয়ে ভরাট হয়েছে। রাস্তাঘাট বাঁধ সব ধসে গেছে। গত কয়েক দিনে কয়েক দফা পানি বৃদ্ধির ফলে এখন পর্যন্ত ১৪১টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সরকারি সহায়তা এখনও আমরা দিতে পারিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মো. সাইখুল আরিফিন জানান, প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় বন্যায় ৬৪ দশমিক ৬০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ২১ হাজার ৮৫০টি কৃষক পরিবার। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্ল্যাহ বলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকা পেলে তাদের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তা ছাড়া তিস্তার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ রক্ষায় কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
৪ বিভাগে মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টির আভাস
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর গতকাল সন্ধ্যা ৬টার থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে জানিয়েছে, আজ রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
অপরদিকে ফেনী জেলাসহ রংপুর ও সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে। গতকাল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রংপুর, সৈয়দপুর ও শ্রীমঙ্গলে ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন ছিল বান্দরবানে ২৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।