কর্মস্থল বামনা পরিবার পরিকল্পনা দপ্তর
বামনা (বরগুনা) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১৬:৩৯ পিএম
আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১৭:১৮ পিএম
বামনা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক শিপ্রা সরকার। প্রবা ফটো
অন্যের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্রের সব তথ্যই হুবহু রেখে দিয়ে শুধু পরীক্ষার্থীর নাম ও পিতার নাম পাল্টে জাল সনদ বানিয়েছেন তিনি। এরপর সেই সনদের কল্যাণে সরকারি চাকরি করছেন ১০ বছর ধরে! এ অভিযোগ উঠেছে বরগুনার বামনা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক শিপ্রা সরকারের বিরুদ্ধে। তিনি ডৌয়াতলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বর্তমানে কর্মরত। এ অভিযোগ করেছেন মঠবাড়িয়া উপজেলার বাশবুনিয়া রাশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সমাপ্তি বিশ্বাস।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর সমাপ্তি বিশ্বাস অভিযোগ করেছেন, তার এসএসসি সনদ জাল করে বামনা উপজেলায় পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক হিসেবে শিপ্রা সরকার চাকরি করছেন।
সমাপ্তি বিশ্বাসের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্তের জন্য বরগুনা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাহমুদুল হক আজাদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে।
পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার গৌরাঙ্গলাল বিশ্বাসের মেয়ে সমাপ্তি বিশ্বাস ২০১৯ সালে এনটিআরসির মাধ্যমে বাশবুনিয়া রাশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ পান। গত বছর ২ অক্টোবর রাতে তাকে নাজিরপুর থানার ডিএসবি থেকে ফোন করে জানানো হয়, তার এসএসসি পরীক্ষার সনদের সকল তথ্য সঠিক রেখে শুধু নাম এবং পিতার নাম পরিবর্তন করে বরগুনায় শিপ্রা সরকার নামে একজন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক পদে চাকরি করছেন।
সমাপ্তি বিশ্বাস জানিয়েছেন, তার এসএসসি পরীক্ষার সনদে রোল নম্বর ১১৩৬৭৮, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ২৪৮৯৬৩, শিক্ষাবর্ষ ১৯৯৯-২০০০, পাসের সাল ২০০১ এবং শিক্ষা বোর্ড বরিশাল।
শিপ্রা সরকারের জাল সনদটি সংগ্রহ করে স্থানীয় সাংবাদিকরা দেখেছেন, জাল এসএসসি পরীক্ষার সনদে সমাপ্তি বিশ্বাসের নামের স্থানে হুবহু একই ফন্টে টাইপ করে লেখা রয়েছে শিপ্রা সরকার এবং পিতার নাম নকুল চন্দ্র সরকার। এছাড়া বাকি সব তথ্যই প্রকৃত সনদধারী সমাপ্তি বিশ্বাসের। চাকরিপ্রাপ্তির সেই জাল সনদটিকে সত্যয়নকারী স্বাক্ষরদাতা হিসেবে স্বাক্ষর রয়েছে বরগুনা সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সমরজিৎ হাওলাদারের। এতে তারিখ লেখা রয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০১৪।
এ প্রসঙ্গে বরগুনা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক সমরজিৎ হাওলাদার জানান, তিনি ২০০৯ সালে বরগুনা থেকে বদলি হয়েছেন। তাহলে ২০১৪ সালে তিনি কীভাবে ওই সনদে সত্যয়িত করবেন? তার দাবি, সনদ সত্যয়িত করতে গিয়ে তার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে রেজাল্ট দেখতে গিয়ে শিপ্রা সরকারের সনদ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। কারণ সেখানে শিপ্রা সরকার ব্যবহৃত সনদের রোল নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে সার্চ করলে সমাপ্তি বিশ্বাসের নাম দেখা যায়।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, গত ২ জুন বরগুনা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাহমুদুল হক আজাদ এ ব্যাপারে দায়সারাভাবে তদন্ত সম্পন্ন করেছেন এবং মহাপরিচালক (ডিজি) বরাবর প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।
জানতে চাইলে উপপরিচালক মাহমুদুল হক আজাদ বলেন, ‘তদন্তের দিন অভিযোগকারীকে বরগুনায় আসতে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তদন্তের দিন উপস্থিত হননি। পরে ডিএসবি রিপোর্ট অনুযায়ী, আমি তদন্ত প্রতিবেদন মহাপরিচালকের দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত শিপ্রা সরকারের স্বামী তপন কুমার রায় ডৌয়াতলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের নৈশপ্রহরীর হিসেবে চাকরি করেন। তবে ওই অফিসের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তপন কুমার রায় নৈশপ্রহরী হিসেবে কর্মরত থাকলেও তিনি এক দিনও অফিস করেননি।’ শিপ্রা সরকারের নামেও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঠিকমতো উপস্থিত না থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযুক্ত শিপ্রা সরকারের বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। গত শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার সময় তার কর্মস্থলে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। জিজ্ঞেস করে জানা গেছে, সকালে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে তিনি চলে গেছেন।
পরে অভিযুক্ত শিপ্রা সরকারের স্বামী তপন কুমার রায়কে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগের জন্য একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। তারা তদন্ত করে প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠিয়েছে। তবে মহাপরিচালকের কাছে যিনি অভিযোগ দিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে, তিনি অনেকের কাছেই ওই অভিযোগের কথা অস্বীকার করেছেন।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘তদন্তে অভিযুক্ত হলে আপনারা সংবাদ প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু তার আগেই আমাদের কেন বারবার ফোন করছেন?’
এদিকে অভিযোগকারী সমাপ্তি বিশ্বাসের স্বামী শ্যামল সাহা বলেন, ‘আমরা ডিএসবির মাধ্যমে জালিয়াতির কথা জানতে পেরে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছি। বরগুনা উপপরিচালকের কার্যালয় থেকে আমাদের আপডেট জানানো হয়েছে। তবে তদন্তের দিন আমরা যেতে পারিনি। কিন্তু শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলেই তো তদন্ত কমিটি দেখতে পাবে, জালিয়াতি হয়েছে কি না।’
বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘এত বড় জালিয়াতির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না! অনুগ্রহ করে সকল তথ্য আমাকে দিন। আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’