নওগাঁর পত্নীতলা
নওগাঁ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৪ ১৭:৩৫ পিএম
আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৪ ১৮:২৮ পিএম
নওগাঁর পত্মীতলা উপজেলার অর্জুনপুর গ্রামে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কর্তৃক ভেঙে দেওয়া হাচান আলীর ঘর। প্রবা ফটো
নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে নোটিস ছাড়াই ক্ষমতার অপব্যবহার করে দরিদ্র দুই পরিবারকে উচ্ছেদের অভিযোগ উঠেছে। যার মধ্যে একটি পরিবারের বাড়ি ভেঙে দিয়েছেন এবং অন্য বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে সিলগালা করে দিয়েছেন। এতে ভাসমান অবস্থায় দিন পার করছে পরিবার দুটি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার বিকালে পত্নীতলা উপজেলার অর্জুনপুর গ্রামে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন ইউএনও পপি খাতুন। এ সময় তিনি দাঁড়িয়ে থেকে ওই গ্রামের বাসিন্দা হাচান আলীর পরিবারের টিনশেড ও বেড়ার ঘর ভেঙে দেন। এরপর পাশের সাদেকুল ইসলামের পরিবারের সবাইকে বাড়ি থেকে বের করে দরজায় তালা ঝুলিয়ে সিলগালা করে দেন।
ঘটনার পর থেকে হাচানের পরিবার ভাঙা বাড়ির আঙিনায় খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। সাদেকুল ইসলামের পরিবার আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশীর বাড়িতে।
ভুক্তভোগী হাচান আলী অর্জুনপুর গ্রামের মৃত ইদ্রিস আলীর ছেলে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে আমাদের পরিবার খাসজমিতে বসবাস করে আসছে। ২০১১ সালে আমি আড়াই শতক খাসজমি বন্দোবস্ত পাই। সেই কবুলিয়াতপত্রে আমার স্ত্রী হাবিবা বিবির নামও রয়েছে।’
তিনি জানান, জায়গা পেয়ে সেখানে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছেন তিনি। বাড়িতে দুটি শোওয়ার ঘর, টিউবওয়েল, টয়লেট, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু ও রান্নাঘর ছিল। তার বেড়া দিয়ে তৈরি ঘরের পাশে ইটের গাঁথুনি দিয়ে দুটি ঘর বানানোর উদ্যোগ নিলে স্থানীয় মহিলা মেম্বার রুজিনা আকতার বাধা দিয়ে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। এই টাকা না দেওয়া তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পর থেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ ও মেম্বার রুজিনা নানাভাবে হয়রারি করে আসছিল। তারই ধারাবাহিকতায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে দিয়ে ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়েছে। সেদিনের পর থেকে আসবাবপত্র ও শিশুসন্তানদের নিয়ে তার পরিবার মানবেতর দিন কাটাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আরেক ভুক্তভোগী সাদেকুল ইসলাম বলেন, ‘হাচানের বাবা ইদ্রিস আলী চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে বাড়িঘরের টিন ও অন্যান্য আসবাবপত্র বিক্রি করেন। ৭০ হাজার টাকায় সেসব আসবাবপত্র কিনে নিই। ইদ্রিস আলী মারা যাওয়ার পর থেকে বাড়িটি পড়ে আছে। শুধু আসবাব কেনার কারণেই আমাকে দোষীসাব্যস্ত করে বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে সিলগালা করে দিয়েছেন ইউএনও। পরিবার নিয়ে বর্তমানে আমি ভাসমান অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি।’
এ বিষয়ে স্থানীয় সাবেক ইউপি মেম্বার ইয়াছিন আলী বলেন, ‘২০১১ সালে এলাকার ২৭ পরিবারকে ৭২ শতাংশ জমি কবুলিয়াতপত্রের মাধ্যমে দেওয়া হয়। তখন থেকে ওই জমিতে তারা বসবাস করে আসছে। যাদের মধ্যে মাসুদা বিবি ও রফিকুল ইসলাম দম্পতি ৪ শতাংশ জমি পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা ভোগদখলে আসেননি। দীর্ঘদিন পর এসে হাচানের বাড়ির জমিটি তার দাবি করলে সমস্যার সৃষ্টি হয়। হাচান যেখানে বাড়ি করে বসবাস করছে সেই জমির পরিমাণ আড়াই শতাংশ। হাচানের বাড়ি ভাঙচুর ও সাদেকুলের বাড়ি সিলগালা করার ঘটনা ন্যায়সংগত হয়নি।’
অর্জুনপুর গ্রামের মেম্বার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘মাসুদা বিবি জমি পাওয়ার পরও দীর্ঘদিন অন্য জায়গায় ছিলেন। বছরখানেক আগে গ্রামে ফিরে এসে সড়কের পাশে একটি জমিতে বাড়ি করে বসবাস করছেন। কবুলিয়াতপত্র অনুসারে তিনি ৪ শতাংশ জমির মালিক। অনেক জমি ফাঁকা পড়ে আছে। সেসব জায়গায় মাসুদা বিবিকে দখল দিলেই সমস্যার সমাধান হতো। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে।’
গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘অর্জুনপুর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে কোনো বিবাদ নেই। শান্তিপূর্ণভাবে আমরা বাস করি। কিন্তু হঠাৎ দেখা দেওয়া এই বিশৃঙ্খলায় আমরা অশান্তিতে আছি। হাচানের বাড়ি ভেঙে দেওয়া ও সাদেকুলকে বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়া ঠিক হয়নি।’
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রুজিনা আকতার বলেন, ‘হাচান ও তার বাবা মিলে ইতঃপূর্বে যে বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন, সেই বাড়ি তারা সাদেকুলের কাছে অবৈধভাবে বিক্রি করেছেন। পরে আরেকটি জায়গা দখল করার সময় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাদের বাধা দেওয়া হয়।’ উৎকোচ চাওয়ার অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেন রুজিনা আকতার।
নির্মইল ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোনো ঘটনা নেই। অভিযোগকারীরা মিথ্যা বলেছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় আমি ছিলাম না। বাড়ি ভেঙে উচ্ছেদ করার সিদ্ধান্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসারের। এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’
এ ঘটনায় পত্নীতলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার পপি খাতুন বলেন, ‘বন্দোবস্ত দেওয়া জমিগুলো নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছেন হাচান আলী ও সাদেকুল ইসলাম। তাদের কারণে মাসুদা বিবি জমির দখল পাচ্ছেন না। সমস্যা সমাধানে কয়েকবার তাদের বৈঠকে ডাকা হয়। কিন্তু তারা সাড়া দেননি। ফলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে হাচানকে বর্তমান জমি থেকে উচ্ছেদ করে সাবেক বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া সাদেকুলের বাড়িতে তালা লাগানো হয়েছে।’
কিন্তু এ ঘটনাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলছেন নওগাঁ জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ডিএম আব্দুল বারি। তিনি বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের এ ধরনের নির্দেশ দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই।’