শরীফ স্বাধীন, মাগুরা
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৪ ১৭:২২ পিএম
আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৪ ১৭:২৩ পিএম
মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার বৃহষনগর গ্রামের চরে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ডাম্পিং করা হচ্ছে মধুমতি নদী থেকে অবৈধভাবে তোলা বালু। প্রবা ফটো
মাগুরা এবং ফরিদপুর জেলার সীমান্ত দিয়ে বয়ে গেছে মধুমতী নদী। আর এই নদীর পারে প্রায় ১ হাজার ৫০০ বিঘার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে জেগেছে চর। চরে দুই ফসলের আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে এলাকার কৃষকরা। আর এই চরে চোখ পড়েছে বালুখেকোদের। তারা মধুমতী নদীর ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়ন এলাকায় বালু কাটছে। আর এসব বালু ডাম্পিং করছে মাগুরার মহম্মদপুর বৃহষনগর গ্রামের চরে।
ইতোমধ্যে বালু ভরাটে চাপা পড়েছে বৃহষনগরের ৪০ বিঘা চাষের জমি। মেসার্স সাগর এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে বালু তোলাসহ ভরাটের কাজ করছে। আর ওই প্রতিষ্ঠানকে দুই জেলার দুই ইউপি চেয়ারম্যান সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ। স্থানীয়রা বলছেন তারা অসহায়। এভাবে চলতে থাকলে চাষের জমি বালু ভরাটেই সব দখল হয়ে যাবে।
মহম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী ইউনিয়নের বৃহষনগর গ্রামের চরে সরেজমিনে দেখা যায়, মেসার্স সাগর এন্টারপ্রাইজ কৃষকের জমি দখল করে বালুর ঘাটে ট্রাক যাতায়াতের রাস্তা তৈরি করেছে। নদীতে ১৬ হাজার হর্স পাওয়ারের ড্রেজিং যন্ত্র দিয়ে ১০০ ফুট গভীর থেকে বালু উত্তোলন করছে। মোটা পাইপের সাহায্যে কৃষিজমিতে বালু ভরাট করে উঁচু স্তূপ করে রাখা হয়েছে। আর এই বালু ব্যবস্থাপনার কাজে ব্যবহার হচ্ছে পে-লোডারসহ ভারি ভারি যন্ত্র। তবে নদীর যে অংশে বালু তুলছে সেটি ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ফরিদপুরের কর্মকর্তারা বলছেন সেখানে বালু উত্তোলনের জন্য কাউকে অনুমতি বা ইজারা দেওয়া হয়নি।
স্থানীয়রা জানায়, নদীর তীরে এক হাজার মিটার জায়গাজুড়ে কৃষিজমির ওপর বালু ফেলে ভরাট করার উৎসব চলছে। ইতোমধ্যে ৪০ বিঘা দুই ফসলের জমি বালু ভরাটে চাপা পড়েছে। এই চরে দুই জেলার ছয় গ্রামের মানুষ চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
কৃষকরা বলছেন, চর জেগে ওঠার পর ১৯২২-৬২ রেকর্ডীয় মূলে ভোগ দখল করে ফসল উৎপাদন করছেন। এ ঘটনায় মেসার্স সাগর এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে দুই ইউপি চেয়ারম্যানের যোগসাজশসহ ব্যবসায়িক শেয়ার রয়েছে বলে অভিযোগও করেন তারা। অভিযুক্ত দুই চেয়ারম্যান হলেন, ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) রাকিব হোসেন চৌধুরী ইরান ও মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী ইউপির মীর মো. সাজ্জাদ আলী।
কৃষক শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার বলেন, ৩০ বছর ধরে চর জাগলেও গত দুই বছর চরটি চাষের উপযোগী হয়। এখানে বাদাম, তিল, মসুর আবাদ করে খেয়ে পরে বাঁচি। চরে ৪০ শতক জমি আছে। ২০ শত বালু ভরাটে চলে গেছে। বাকি জমিটাও যাবে।
অসিত মণ্ডল নামে আরেকজন বলেন, ৫ হাজার টাকা খরচ করে বাদাম চাষ করলি ৩০ হাজার টাকা আয় হয়। এই টাকায় সারা বছর পরিবার নিয়ে চলি। কোম্পানির বালুভরাটে দখল হবে আমার জমিটাও। আমাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই। আমরা অসহায়।
হামিদুল ইসলাম বলেন, আমার এখন কোনো জমি নেই। চরে ছিল দুই বিঘা সেটাও বালু ভরাটে দখল হয়েছে। বলেন বিচার দেব কার কাছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স সাগর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হাফিজুর রহমান সাগর মিয়া বলেন, ‘কৃষকের জমি দখল করে কোনো রাস্তা বানানো হয়নি। বালু ভরাটের জমি সবই সরকারের। সব থেকে বড় ব্যাপার আমার প্রতিষ্ঠান ওখানে বালুর ব্যবসা করছে না।’ পরবর্তী সময়ে বালু উত্তোলনের অনুমতির বিষয়ে জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মন্নু মৃধা বললেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, বৃহষনগর চরে যে বালু ফেলা হয়েছে সবটাই কোম্পানির। আমি এখানে বালু বিক্রির দায়িত্বে আছি। ২০০ ফুট বালি ৬০০ টাকায় বিক্রি করি। প্রতিদিন এখান থেকে ১০০ থেকে ২০০ গাড়ি বালু বিভিন্ন জায়গায় যায়।
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রাকিব হোসেন চৌধুরী ইরান বলেন, বালু উত্তোলনে জড়িতের অভিযোগটি সঠিক নয়। সাগর এন্টারপ্রাইজ এলাকার হওয়ায় আমার কাছে সহযোগিতা চেয়েছিল। আমি বলেছি সরকার যদি ইজারা দিয়ে থাকে তাহলে বালি উত্তোলন করতে পারবে। তবে কাউকে ক্ষতি না করে। আপনি বলছেন ফসলি জমি দখল। যদি এমনটা হয় সরজমিনে দেখে প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসনকে জানাব।
মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলা বাবুখালী ইউপি চেয়ারম্যান মীর মো. সাজ্জাদ আলী বলেন, মানুষ না জেনেই দোষারোপ করে। অঞ্চলটি আমার এলাকার হলেও জমি দখলের ঘটনা আপনার কাছেই প্রথম জানতে পারলাম। প্রকৃত ঘটনাটা কী আমি দেখে জানাব।
জানতে চাইলে মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পলাশ মণ্ডল বলেন, গত পাঁচ মাস আগে সেখানে গিয়েছিলাম। আমার জানা মতে, ফরিদপুর অংশে ওদের বালু যাতায়াতের রাস্তা না থাকায় মাগুরার এই পাড়ে বালু ডাম্পিং করে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। ৪০ বিঘা চাষের জমিতে বালু ভরাট হয়েছে, ঘটনাটা যদি এমন হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাউবো ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম বলেন, মধুমতী নদীর কামারখালী অংশে কোনো ধরনের ড্রেজিংয়ের অনুমতি দেব না। আর মেসার্স সাগর এন্টারপ্রাইজকেও মধুমতী নদীতে ড্রেজিংয়ের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।