আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৪ ১৭:০১ পিএম
বাঁ থেকে এরশাদ উল্লাহ ও নাজিমুর রহমান
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও বোয়ালখালী আসন থেকে প্রভাবশালী বিএনপি নেতা মোরশেদ খানের বদলে নতুন মুখ হিসেবে প্রার্থী হন ব্যবসায়ী নেতা এরশাদ উল্লাহ। কিন্তু সেই নির্বাচনে প্রায় ১৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে মহাজোট প্রার্থী মাইন উদ্দিন খান বাদলের কাছে পরাজিত হন বিজিএমইএর সাবেক এই সহসভাপতি। ১৯৮৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আসনটি ছিল বিএনপির দখলে। বিএনপির দুর্গে পরাজয়ের পর সেজন্য মোরশেদ খানকে দায়ী করেন এরশাদ উল্লাহ। তখন থেকেই দ্বন্দ্বে জড়ান দুজনে। এর জের ধরে ২০১২ সালে মোরশেদ খানের গাড়ি বহরে হামলার ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় দল থেকে বহিষ্কার হন তিনি। বছর পাঁচেক পরে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হলেও দলে সেভাবে ফেরা হয়ে উঠছিল না তার। দলীয় কার্যক্রমেও ছিলেন অনেকটা নিষ্ক্রিয়। তবে সেই এরশাদ উল্লাহ বিএনপিতে ফিরলেন রাজকীয়ভাবে। একেবারে নগরের শীর্ষ নেতা হয়ে।
রবিবার এরশাদ উল্লাহকে আহ্বায়ক ও নাজিমুর রহমানকে সদস্য সচিব করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির দুই সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন করেছে বিএনপি। তবে এই কমিটি হতাশ করেছে নগরের নেতাকর্মীদের। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর এমন প্রত্যাবর্তন মূলত এটাই প্রমাণ করছে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির রাজনীতি তুলে দেওয়া হয়েছে বণিকের হাতে। আন্দোলন সংগ্রামের কর্মীদের জন্য যা খুব সুখকর বার্তা নয়। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়নি মন্তব্য করে তারা বলছেন, বিএনপির রাজনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে একটি অংশ বলছে, লম্বা সময়ে দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে বিরোধের শিকার হয়ে বঞ্চিত ছিলেন এরশাদ উল্লাহ। বিএনপির আমলে বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদের সঙ্গেও চেম্বার অব কমার্স ইস্যুতে দ্বন্দ্ব ছিল। পরে মোরশেদ খানের সঙ্গেও দ্বন্দ্বে জড়ান। সাম্প্রতিক সময়ে মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর একক কর্তৃত্ব তৈরি হয়েছিল। এরশাদ উল্লাহকে নগর বিএনপির আহ্বায়ক করে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর একক কর্তৃত্বে ‘ভাঙন’ ধরানোর বার্তাই যেন দিয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। বিএনপি নেতাদের একাংশ বলছে, এরশাদ উল্লাহকে আহ্বায়ক করার পেছনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কলকাঠি নাড়ছেন সদ্য বিএনপির সহসম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া তরুণ নেতা ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন।
এরশাদ উল্লাহ এর আগে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া নাজিমুর রহমান সদ্য বিলুপ্ত আহ্বায়ক কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। এর আগে নগর ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
নতুন কমিটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে দলটির মহানগর কমিটির এক সাবেক সদস্য প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দুজনই বিনয়ী ভদ্রলোক। কিন্তু তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই। গত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় থাকা একজনকেও রাখা হলে একটা ভারসাম্য থাকত। এ ছাড়া এরশাদ উল্লাহ যেভাবে ফিরলেন তাতে এই বার্তাটা স্পষ্ট হলো, রাজনীতি বণিকের হাতে গেল। তিনি মানুষ হিসেবে খারাপ না। কিন্তু এতদিনের আন্দোলন সংগ্রামে তো তিনি ছিলেন না।’
তবে এই মুহূর্তে দল গোছানোকেই পাখির চোখ করে দেখছেন এরশাদ উল্লাহ। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘দলের সব স্তরের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করাই আমার প্রথম টার্গেট। তৃণমূলে সংগঠনকে গতিশীল করতে কাজ করব।’ এই ক্ষেত্রে পুরোনো দ্বন্দ্ব কিংবা মান অভিমান কেমন প্রভাব ফেলতে পারেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে এরশাদ উল্লাহ বলেন, ‘রাজনীতিতে মত দ্বিমত থাকবে। কিন্তু মান অভিমান এসব নারীদের বিষয়। রাজনীতির কর্মীরা মান অভিমান নিয়ে চলে না। সবাইকে নিয়েই মিলেমিশে আমরা চট্টগ্রামে জোরদার আন্দোলন গড়ে তুলব।’
নতুন কমিটির বিষয়ে জনাতে চাইলে সাবেক সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্কর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। দলের হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটাই সঠিক। এর বাইরে আমার কিছু বলার নেই।’ আগের কমিটির নেতাদের সঙ্গে নতুন কমিটির নেতাদের শুভেচ্ছা বিনিময় কিংবা যোগাযোগ হয়েছে কিনাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে এরশাদ উল্লাহ ও আবুল হাশেম বক্কর দুজনই না সূচক জবাব দেন।