সাইফুল ইসলাম, মাদারীপুর
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৪ ০১:০১ এএম
আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৪ ০৮:৪৪ এএম
গ্রামে গড়ে তোলা প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত আবেদ আলীর বিলাসবহুল বাড়ি। মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার পশ্চিম বোতলা গ্রামে। সোমবার দুপুরে তোলা। প্রবা ফটো
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) চেয়ারম্যানের সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীর বাড়ি মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার পশ্চিম বোতলা গ্রামে। এই গ্রামের মানুষ রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী হিসেবে তাকে চেনেন। কয়েক বছর ধরে গ্রামবাসীর কাছে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন শিল্পপতি হিসেবে। গ্রামের মধ্যে তার বাসভবন দেখে মনে হবে কোনো রাজকীয় প্রাসাদ। অভিযোগ রয়েছে– সরকারি জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছেন তিনি। পিএসসির আওতাভুক্ত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে আবেদ আলীর জড়িত থাকার ঘটনায় প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে তার এই প্রতারণার তথ্য উঠে এসেছে।
দেশের একটি বেসরকারি টেলিভেশনে রবিবার সন্ধ্যায় প্রচারিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ও পিএসসির আওতাভুক্ত অন্যান্য নন-ক্যাডার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে গত ১২ বছর ধরে। প্রশ্ন ফাঁসে সরাসরি জড়িত পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, পিএসসির উপপরিচালক আবু জাফর, জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী পরিচালক এস এম আলমগীর কবির, নিখিল চন্দ্র রায়, পিএসসির চেয়ারম্যানের সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী এবং অফিস সহায়ক খলিলুর রহমান। সোমবার ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত আলোচিত আবেদ আলীসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার ক্রাইম ইউনিট।
অঢেল সম্পদ, সরকারি জমি দখল
আবেদ আলীর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রয়াত আব্দুর রহমানের তিন ছেলে এক মেয়ের মধ্যে আবেদ আলী মেজ। আবেদ আলীর বড় ভাই জাবেদ আলী এলাকায় কৃষি কাজ করেন। ছোট ভাই সাবেদ আলী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ছোটবেলায় বাড়ি ছেড়েছিলেন আবেদ আলী। আট বছর বয়স থেকে তিনি ঢাকায় থাকা শুরু করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে– ঢাকায় এসে সদর ঘাটে কুলির কাজ করতেন আবেদ আলী। রাতে থাকার মতো বাসস্থান না থাকায় ঘুমিয়েছেন ফুটপাতে। গাড়ি চালানো শিখে ভাগিয়ে নেন পিএসসির গাড়িচালকের চাকরি। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অর্জন করেছেন বিপুল সম্পদ। নিজ গ্রামে কোটি টাকা খরচ করে বানিয়েছেন বিলাসবহুল বাড়ি। বাড়ির পাশে নিজ অর্থায়নে বানিয়ে দিয়েছেন একটি মসজিদ। পাশেই সরকারি জায়গা দখল করে তার গরুর খামার ও মার্কেট নির্মাণাধীন। এ ছাড়া পান্তাপাড়া ও পূর্ব বোতলা গ্রামে কিনেছেন বিপুল জমি। আবেদ আলীর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম স্নাতক করেছেন দেশের বাহিরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরে দেশে এসে স্নাতকোত্তর করেছেন একটি ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
নিজ এলাকায় ছদ্মবেশী
স্থানীয়রা জানান, এলাকার মানুষ জানতেন না আবেদ আলী পিএসসি চেয়ারম্যানের সাবেক গাড়িচালক। প্রচার ছিল– তিনি ঢাকায় রিয়েল স্টেটের ব্যবসা করতেন। কয়েক বছর ধরে এলাকার মানুষের কাছে শিল্পপতি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। কয়েক বছর ধরে ব্যাপক দান-খয়রাতও করছেন তিনি। বিত্ত-বৈভব ফুলে-ফেঁপে ওঠার পর নামের আগে জুড়ে দিয়েছন সৈয়দ পদবি। এলাকায় তিনি চড়েন দামি গাড়িতে। তার ছেলে সিয়ামের রয়েছে একাধিক দামি গাড়ি। নানা সময় এলাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বাবাকে লিমিটেড কোম্পানির মালিক হিসেবে দাবি করে বক্তব্য দিয়েছন সিয়াম।
একটি বক্তব্যে সিয়াম বলেন, ‘আমার বাবা একদম ছোট থেকে বড় হয়েছেন। আমার বাবার বয়স যখন আট বছর, তখন পেটের দায়ে তিনি ঢাকায় চলে গেছেন। ঢাকায় গিয়ে কুলিগিরি করে ৫০ টাকা রুজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এখন তিনি একটি লিমিটেড কোম্পানির মালিক। তিনি কষ্ট করে বড় হয়েছেন।’
এ প্রসঙ্গে আবেদ আলীর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঢাকা থেকে যখন তিনি এলাকায় আসতেন, তখন মানুষকে দান-খয়রাত করতেন। তার সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তিনি যে অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, এলাকার কেউ জানত না।’
অনুসন্ধানে নামবে দুদক
আবেদ আলীসহ প্রশ্ন ফাঁসে জড়িতদের আইন অনুসারে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ। তিনি বলেন, ‘যারা অস্বাভাবিকভাবে সম্পদ অর্জন করেছে, তাদের নিয়ে সচেতন মহলের প্রশ্ন তোলা উচিত। সরকারের উচিত, ব্যবস্থা নেওয়া। প্রশ্ন ফাঁস করে বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার কারণে কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাদারীপুর সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আতিকুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, তারা অভিযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। আতিকুর বলেন, অভিযোগ পেলেই প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করা হবে।
আবেদ আলী ও তার ছেলে সিয়াম গ্রেপ্তার থাকায় সার্বিক বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে যাওয়া হয় বোতলা গ্রামে তাদের বাড়িতে। সেখানে দেখা যায়, বিলাসবহুল বাড়িতে কেউ নেই। প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা।