নড়াইল প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৪ ২০:১৩ পিএম
আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৪ ২১:৪৩ পিএম
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পেড়লী গ্রামে এভাবেই বাড়িঘর ভাঙচুর করে ইট-বালুও নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বিদ্যুতের পোল-তার। প্রবা ফটো
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পেড়লী গ্রামের দুই শতাধিক পরিবারের সদস্য প্রায় এক বছর নিজেদের ভিটেমাটিতে বাস করতে পারছে না। একটি খুনকে কেন্দ্র করে তারা বাড়িছাড়া হয়ে আছে। অভিযোগ রয়েছে– এসব পরিবারের বসতঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে প্রতিপক্ষ। মালামাল ভাঙচুরের সঙ্গে করা হয়েছে লুটপাট। নিজেদের ভিটেমাটিতে স্বাভাবিক জীবনযাপন ফিরে পেতে নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির দ্বারস্থ হয়েও কোনো সুরাহা হয়নি বলে দাবি করেছে তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে– বাড়িঘর ভাঙচুর করে ইট-বালু নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুতের পোল-তার। বাড়িঘরের সঙ্গে পুড়েছে গাছপালা। স্থানীয়দের মধ্যে এক রকম চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। কথিত ‘গুণ্ডা বাহিনীর’ ভয়ে মুখ খুলতে চায় না অনেকে। বাহানী
বাড়িছাড়া খোকন মোল্যা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের দুই শতাধিক পরিবারের বাড়িঘর লুটপাট ও ভাঙচুর করা হয়েছে। অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। বাড়িঘরের ইট-বালু নিয়ে গেছে। তারপরও আমরা নিজেদের বাড়িতে যেতে পারছি না।’
আরেক বাসিন্দা মুসাব্বির মোল্যা বলেন, ‘পুলিশ সুপার ও এমপি মহোদয়ের কাছে আমাদের দাবি– আমরা বাড়ি ফিরে পেতে চাই। নিজ ভিটায় কুঁড়েঘর তৈরি করে হলেও পরিবার নিয়ে থাকতে চাই।’
একটি মার্ডার ও বাড়ি ছাড়ার ঘটনা
থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছর ২০ জুলাই খুলনায় দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন পেড়লী গ্রামের বাসিন্দা যুবলীগ কর্মী আজাদ শেখ। বাড়ি ফেরার পথে সন্ধ্যাবেলা পেড়লী বাজারের মোহসীন মোড়ে হাতুড়িপেটার শিকার হন তিনি। আহত অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা কবীর মিয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই মার্ডারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। এভাবে মানুষের বাড়িঘর ভাঙচুর করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
আরেক বাসিন্দা তৌহিদ শেখ জানালেন, স্থানীয় দুই গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। এ ঘটনার জের ধরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। পরে বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
নেপথ্যে পুরোনো দ্বন্দ্ব
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে– আজাদকে খুনের নেপথ্যে রয়েছে পুরোনো দ্বন্দ্ব। এলাকার আধিপত্য বিস্তার ঘিরে এই দ্বন্দ্ব জিইয়ে রেখেছে শেখ গ্রুপ ও মোল্যা গ্রুপ। এর জের ধরে খুন হন শেখ গ্রুপের আজাদ। গত বছর ২০ জুলাই খুনের তিন দিন পর করা তার ছোট ভাই সাজ্জাদ শেখের মামলায় প্রধান আসামি হয়েছেন শহিদুল মোল্যা। মামলায় মোট ২০ জনের নাম উল্লেখ করা আছে। সাজ্জাদ শেখ কথিত ‘গুণ্ডা বাহিনীর’ নেতৃত্বে রয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই বাহিনীর কর্মী হিসেবে পরিচিত মো. জিলানী। তিনি প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি উস্কানিমূলক পোস্টও দিয়েছেন। ১৪টি দেশীয় অস্ত্রসংবলিত পোস্টে তিনি লিখেছেনÑ প্রস্তুত আছি, দেখা হবে রাজপথে।
দুই পক্ষের ভাষ্য
বাড়িছাড়া কাউসার ভূঁইয়া বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অপরাধ হলে আইন যে শাস্তি দেয় মাথা পেতে নেব। কিন্তু বসতবাড়িতে যেতে পারব না, এ কেমন বিচার।’
কিবরিয়া মোল্যা বলেন, ‘মারামারি করল কয়জন, আমি কিছুই জানি না। আমাদের বাড়িঘর লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। আমি পরিবার নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে বাড়িছাড়া। এভাবে আর পারছি না।’
আজাদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি শহিদুল মোল্যা দাবি করেছেন– আজাদের ওপর হামলার দিন তিনি এলাকায় ছিলেন না। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আসামি না করে তাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
শহিদুল মোল্যা বলেন, ‘আমাকে আসামি করার কারণ আমি তাদের প্রতিপক্ষ। আদালত থেকে জামিনে আছি। কিন্তু ‘গুণ্ডা বাহিনীর’ ভয়ে বাড়িতে যেতে পারি না। পুলিশ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে আমরা আইনি সহায়তা চেয়েছি। আমার ছেলে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী, সে ভয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না।
বাড়িঘর ভাঙচুর ও প্রতিপক্ষকে বাড়িতে ঢুকতে বাধা দেওয়ার বিষয় অস্বীকার করেছেন আজাদের ছোট ভাই সাজ্জাদ শেখ। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে দাবি করেছেন, ভাঙচুর করে তাদের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছি নাÑ এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি শুধু আমার ভাই হত্যার বিচার চাই।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যা বলছে
পুলিশ জানিয়েছে, পুরো ঘটনা সম্পর্কে তারা অবগত। এজন্য ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশও মোতায়েন রয়েছে, যেন নিরাপত্তায় ঘাটতি না হয়।
এ ব্যাপারে নড়াইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও তদন্ত) তারেক আল মেহেদী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘শুনেছি গত শুক্রবার একটি পরিবার বাড়িতে উঠতে গেলে প্রতিপক্ষ তাদের মারধর করেছে। এ ঘটনায় কালিয়া থানায় মামলা করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে জেলা পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। এ ছাড়া ওই এলাকায় জননিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে সজাগ রয়েছে পুলিশ।’