ডুমুরিয়ার ইউপি চেয়ারম্যান হত্যা
সুনীল দাস চৌধুরী, খুলনা
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৪ ২০:০১ পিএম
আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৪ ২০:১০ পিএম
নিহত ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবি। প্রবা ফটো
গত শনিবার রাতে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ৮নং শরাফপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা রবিউল ইসলাম রবির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় বিরাজ করছে শোক আর ক্ষোভ। সহকর্মী ও দলের নেতৃবৃন্দ বলছেন, ডুমুরিয়াকে অশান্ত করতে একটি গ্রুপ পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। স্বজনদের দাবি, রবি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। এদিকে চেয়ারম্যান রবি হত্যার ঘটনায় এখনও কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন খুলনার পুলিশ সুপার। রবিবার (৭ জুলাই) নিহত ইউপি চেয়ারম্যান রবির জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
রবিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিনবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান রবিকে হারিয়ে শোকাতুর হয়ে পড়েছে শরাফপুরের মানুষ। রবিবার সকালে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত শেষে গ্রামের বাড়িতে রবির মরদেহ নেওয়া হয়। সেখানে গ্রামের কয়েকশ মানুষ উপস্থিত হন।
স্থানীয়রা জানান, তিনবারের চেয়ারম্যান হলেও খুবই সাধারণ জীবনযাপন করতেন রবিউল। তার বাড়ি শরাফপুর ইউনিয়নের ভুলবাড়িয়া গ্রামে। তবে পরিবার নিয়ে থাকতেন খুলনা নগরের নিরালা আবাসিক এলাকায়। তার স্ত্রী সমাজসেবা অধিদপ্তর খুলনায় চাকরি করেন। আট ও দেড় বছরের দুটি ছেলে আছে তাদের। পরিবারের লোকজন বলেন, রবিউল মোটরসাইকেলে করে একাই চলাফেরা করতেন। প্রতিদিন সকালে ডুমুরিয়ায় নিজের এলাকায় যেতেন আর রাতে খুলনায় ফিরে আসতেন। শনিবারও ডুমুরিয়ায় দলের মিটিং শেষে রাত ১০টার দিকে খুলনার বাসায় আসার পথে গুটুদিয়ার ওয়াপদা বাঁধের কাছে সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে হত্যা করে।
রবিবার বিকালে শরাফপুর ইউপি অফিস চত্বরে ও গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে তাকে। এ সময় অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, উপজেলা চেয়ারম্যান এজাজ আহমেদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহনেওয়াজ হোসেন জোর্য়াদ্দারসহ দলীয় নেতাকর্মী এবং এলাকার কয়েক হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
নিহত চেয়ারম্যান রবির ভাই মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, রবি ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সে খুবই শান্ত স্বভাবের। এলাকার উন্নয়ন ও দাবিদাওয়া নিয়ে সোচ্চার ছিল। তিনবার নির্বাচিত হয়েছে সে, কিন্তু কোনো নির্বাচনে গণ্ডগোল হয়নি। এলাকার উন্নয়নে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করত। ডুমুরিয়ায় চরমপন্থিদের কারণে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে খুলনা শহরে চলে যায়। সে সব সময়ই সন্ত্রাস, মাদক ও সব ধরনের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ছিল। এ কারণে ২০১৫ সালে একবার সে সন্ত্রাসীদের আক্রমণের শিকার হয়েছিল। স্থানীয় রাজনীতিতে তার জনপ্রিয়তায় একটি পক্ষ তার ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। যারা তাকে রাজনীতি থেকেই নয় দুনিয়া থেকেই সরিয়ে দিল। সে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে।
শোভনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত কুমার বৈদ্য তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রবিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে খ্যাত ডুমুরিয়া-ফুলতলা এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শান্ত ডুমুরিয়াকে আবারও অশান্ত করতে একটি গ্রুপ এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
ডুমুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী এজাজ আহমেদ বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান শেখ রবিউল ইসলাম রবির হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত বলেই মনে হচ্ছে। রবির পিঠে একাধিক গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। গত দুটি ইউপি নির্বাচনে দলের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ কারণে তার ওপর অনেকে ক্ষিপ্ত ছিলেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী নারায়ণে চন্দ্র চন্দ বলেন, চেয়ারম্যান রবিউল ইসলামের হত্যাকাণ্ড খুবই নিন্দনীয় ঘটনা। অতীতে একসময় আতঙ্কের উপজেলা হিসেবে পরিচিত ছিল ডুমুরিয়া। গত ২২ বছরে এ উপজেলায় কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। বিগত সময় যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতেন, তারা এখন ছদ্মবেশে এলাকায় আছেন। রবির হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।
ডুমুরিয়া থানার ওসি সুকান্ত সাহা বলেন, চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবি হত্যার খবর পেয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে কোনো রক্তের চিহ্ন বা অন্য কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। সে কারণে প্রাথমিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনাও হতে পারে বলে মনে হয়েছিল। তবে ময়নাতদন্তে হত্যার ঘটনা পরিষ্কার হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় এখনও কেউ কোনো অভিযোগ করেনি বা মামলাও হয়নি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে এখনও আটক করা যায়নি।
খুলনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাঈদুর রহমান বলেন, ডুমুরিয়ায় ইউপি চেয়ারম্যান যে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তা নিশ্চিত। তবে কারা কী কারণে তাকে হত্যা করেছে, তা জানা যায়নি। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।