প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৪ ২২:১৭ পিএম
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৪ ২২:১৮ পিএম
রথযাত্রা উপলক্ষে চট্টগ্রামের নন্দনকানন ইসকন মন্দির থেকে বের হওয়া র্যালী নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিন করে। চেরাগী পাহাড় মোড় এলাকা। প্রবা ফটো
নানা আনুষ্ঠানিকতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উদযাপিত হয়েছে। তবে বগুড়ায় উৎসবকে ঘিরে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে অন্তত পাঁচজন। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
বগুড়ায় রবিবার (৭ জুলাই) বিকালে শহরের সেউজগাড়ি ইসকন মন্দিরের কাছে সেউজগাড়ি এলাকায় (সাতমাথা-তিনমাথা সড়ক) রথযাত্রার উদ্বোধন করেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রাগেবুল আহসান রিপু, জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তীসহ আরও অনেকে। তারা চলে গেলে সনাতন ধর্মাবলম্বী হাজার হাজার নারী-পুরুষ রথের দড়ি ধরে টেনে এগিয়ে যেতে থাকে। মাত্র ৫০০ গজ পূর্বদিকে সেউজগাড়ি আমতলা মোড়ে পৌঁছার পরপরই রথের গাড়িতে সংযুক্ত উঁচু গম্বুজের ভেতরে থাকা লৌহদণ্ডটি সড়কের ওপরের ১১ হাজার ভোল্টের তারের (তারটি সড়কের দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে টানা) সংস্পর্শে আসে। এতে মুহূর্তেই আগুন ধরে যায় এবং ওই গাড়ি ধরে থাকা অর্ধশতাধিক মানুষ সড়কের ওপর ছিটকে পড়ে। তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। এতে রথযাত্রায় অংশ নেওয়া নারী-পুরুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং স্বজনদের খোঁজাখুঁজি শুরু করে। পরে পুলিশের সহায়তায় সড়কের ওপর পড়ে থাকা আহতদের উদ্ধার করে ২৫০ শয্যা মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল এবং শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে পথিমধ্যে এবং হাসপাতলে নেওয়ার পর ৩ নারীসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন- বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার কুন্দুগ্রামের ভবানী মোহন্তের ছেলে নরেশ মোহন্ত, শহরের তিনমাথা রেলগেট এলাকার মন্তেস্বরের স্ত্রী আতশী, শাজাহানপুর উপজেলার গোহাইল গ্রামের সুদেবের স্ত্রী রনজিতা, শিবগঞ্জ উপজেলার কুলুপাড়া গ্রামের মৃত নারায়ণ কুমারের ছেলে অলক কুমার ও সারিয়াকান্দি উপজেলার সাহাপাড়ার বাসুদেব সাহার স্ত্রী জলি সাহা। আহতদের মধ্যে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যা মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ৪৩ জন চিকিৎসাধীন। বিদ্যুৎস্পর্শে সৃষ্ট আগুনে অনেকের শরীর ঝলসে গেছে।
আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পর তাদের পরিবারের সদস্যসহ রথযাত্রায় অংশ নেওয়া শত শত মানুষ শজিমেকের জরুরি বিভাগ এবং ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ভিড় করে। বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কারণে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হয়। ওই হতাহতের ঘটনার পর রথযাত্রা সংক্ষিপ্ত করা হয়।
দুর্ঘটনার পরপরই সংসদ সদস্য রাগেবুল আহসান রিপু, জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী এবং সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শুভাশীষ পোদ্দার লিটন শজিমেক হাসপাতালে ছুটে যান। জেলা প্রশাসক জানান, সৎকারের জন্য নিহত প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হবে। এছাড়া আহতদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদেরকে ঢাকা বা অন্য কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হবে।
বগুড়া শজিমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ জানান, তাদের হাসপাতালে মোট ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে বর্তমানে ৩৮ জন চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে দুজন আইসিইউতে রয়েছে।
বগুড়া সদর থানার ওসি সাইহান ওলিউল্লাহ জানান, ২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে একজন মারা যায়। তিনি বলেন, বর্তমানে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে তিনজন চিকিৎসাধীন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের বগুড়া পৌর কমিটির পরিমল প্রসাদ রাজ জানান, রথযাত্রার শুরুতে দুঃখজনক হতাহতের ঘটার পর রথটি কিছু সময় থামিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে পরে সেটি শুরু করে সংক্ষিপ্তভাবে শেষ করা হয়।
বিদ্যুতের তার থেকে সাবধান থাকতে বারবার বলা হয়েছিল
রথযাত্রায় অংশ নেওয়া স্থানীয় সাংবাদিক অরূপ রতন শীল জানান, রথের গাড়িটি যারা টানছিলেন, তাদেরকে বারবার সড়কের ওপরে থাকা হাইভোল্টেজের তারের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। সড়কের ওপরে আড়াআড়িভাবে টানা তারের নিচ দিয়ে রথের গাড়িটি সাবধানে পার করার জন্য ইসকন বগুড়ার সভাপতি খরজিতা কৃষ্ণদাস বারবার মাইকে সতর্ক করছিলেন। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে তার সতর্কবাণী চাপা পড়ে যায়। তিনি একাধিকবার রথযাত্রায় অংশগ্রহণের কথা জানিয়ে বলেন, ‘রথযাত্রার মতো ধর্মীয় এই উৎসব অনুষ্ঠানে এর আগে এমন প্রাণহানির ঘটনা কখনও ঘটেনি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেউ কেউ সড়কের ওপর হাইভোল্টেজের তারগুলোকে উন্মুক্ত (ওপরে রাবারের কোনো আবরণ না থাকা) রাখাকেই দায়ী করেছেন। তারা বলছেন, তারগুলো যদি ঢাকা থাকত তাহলে হয়তো এতগুলো প্রাণ হারাতে হতো না।
ঘটনার পরপরই বন্ধ করা হয় বিদ্যুৎ সরবরাহ
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) নির্বাহী প্রকৌশলী (১) আব্দুল মান্নাফ জানিয়েছেন, বিকাল সোয়া ৫টার দিকে রথের গাড়িতে বিদ্যুৎস্পর্শের ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। রাত সাড়ে ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। সড়কের ওপর সরবরাহ লাইনের তার উন্মুক্ত রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১১ হাজার ভোল্টের তারগুলো এভাবেই রাখা হয়। শুধু বগুড়ায় নয়, বরং সারা দেশেই এভাবে রয়েছে।’ দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিদ্যুৎে সরবরাহ লাইনের যে তার সড়কের ওপর দিয়ে পারাপার করা হয়েছে, সেগুলোর উচ্চতা ছিল ১০ মিটার। ধারণা করা হচ্ছে, রথের গাড়িতে এমন কোনো উঁচু দণ্ডযুক্ত করা হয়েছিল, যেটি বিদ্যুৎপরিবাহী। আর সে কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।’
সারা দেশে উদযাপিত রথযাত্রা
উপমহাদেশে সবচেয়ে বড় রথ টানা হয় ঢাকার ধামরাইয়ে। প্রতি বছর এ রথ টানা দেখতে ভিড় করে হাজারো মানুষ। এ বছরও এ উৎসবকে কেন্দ্র করে উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয় ধামরাই বাজার এলাকায়। প্রায় দেড় কিলোমিটার জুড়ে তৈরি হয় ভক্ত ও দর্শনার্থীর ভিড়। বাগেরহাট সদর উপজেলার লাউপালা গোপাল জিউর মন্দিরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় কয়েক হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থী অংশগ্রহন করে। নেত্রকোণায় ৩ ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার ঘুরেছে শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসবের শোভাযাত্রা। রথের রশি টেনে টেনে পায়ে হেঁটে এ শোভাযাত্রায় অংশ নেয় কয়েকশ সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেই ৫ সহস্রাধিক নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। নেত্রকোণার দুর্গাপুরের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা উদযাপন করেছেন রথযাত্রা। টাঙ্গাইলেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ৯ দিনব্যাপী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসব শুরু হয়েছে। ফেনীতে এবার শোভাযাত্রাসহ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় রথযাত্রা। সারা দেশের মতো খাগড়াছড়িতেও উৎসবমুখর পরিবেশে ৯ দিনব্যাপী রথযাত্রা উৎসব শুরু হয়েছে। নওগাঁয়ও উদযাপিত হয়েছে রথযাত্রা উৎসব। জেলার মহাদেবপুর উপজেলার শিবগঞ্জ সার্বজনীন শিবকালী মন্দির প্রাঙ্গণে মাঙ্গলিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় রথযাত্রার অনুষ্ঠানমালা।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকরা]