সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৪ ১৫:৪৪ পিএম
কিশোরগঞ্জে ১১০ কোটি টাকার নরসুন্দা শোভাবর্ধন ও নদী খনন প্রকল্পে বলা ছিল নদীটি প্রবহমান থাকবে। কোটি কোটি টাকা খরচের পর নদীটি বড় নালায় পরিণত করা হয়েছে। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
কিশোরগঞ্জ শহরে বয়ে যাওয়া নরসুন্দা নদীর প্রবহমানতা স্বাভাবিক রাখতে ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়াতে ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল ‘নরসুন্দা নদী খনন ও শোভাবর্ধন প্রকল্প’। কিন্তু আট বছর পার না হতেই পুরোনো চেহারা ফিরে পেয়েছে নরসুন্দা। আবারও হয়ে উঠেছে আবর্জনার ভাগাড়। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর প্রথম কিছুদিন এটিকে পরিচ্ছন্ন মনে হলেও ক্রমেই এটি একটি বড় নালায় পরিণত হয়েছে। নদীটি যাতে মূল রূপ ফিরে পায়, সেজন্য আবারও একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জবাসী।
গত ৫ ও ৬ জুলাই সরেজমিনে নদী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বড় নালার মতো নরসুন্দা নদী হয়ে উঠেছে বিরাট একটি ভাগাড়ে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নদীটির হাজার কোটি টাকার জমি উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই উদ্ধারকৃত জমি আবারও অভিনব পন্থায় দখল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আবারও এসব জমি বেদখল হয়ে যাবে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালে ১১০ কোটি টাকার ‘নরসুন্দা খনন ও শোভাবর্ধন প্রকল্প’ হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর দেখা যায়, নরসুন্দা নদীর গুরুদয়াল সরকারি কলেজ অংশ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় কিছু অবকাঠামো, ওয়াচ টাওয়ার এবং পাঁচটি দৃষ্টিনন্দন সেতু ছাড়া প্রকল্পের দৃশ্যমান সবকিছু ভেস্তে গেছে। নদী খননের ৩০ কোটি টাকার সিংহভাগই উঠেছে একশ্রেণির কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের পকেটে। কথা ছিল, নরসুন্দা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে নদী পানিপ্রবাহ ফিরে পাবে। কিন্তু পানিপ্রবাহ ফিরে পাওয়া দূরে থাক, নদীটি বর্তমানে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। প্রকল্পটি হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের উদাহরণ।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দুর্নীতি ও অনিয়ম হওয়ার কারণে ১১০ কোটি টাকার ‘নরসুন্দা নদী খনন ও শোভা বর্ধন প্রকল্প’ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। তাই বর্ষার এই ভরা মৌসুমেও নদীটিতে পানি নেই। নদীটি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে শহরজুড়ে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১১০ কোটি টাকার এ প্রকল্পে ৫টি সেতু এবং গুরুদয়াল সরকারি কলেজের মুক্তমঞ্চ এলাকা বাদ দিয়ে অধিকাংশ কাজেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করেছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। তিন বছরের মধ্যে পায়ে চলার পথসহ অন্যান্য স্থাপনায় ফাটল দেখা দেয়। নদী খননে দুর্নীতি হওয়ায় নদীটি হয়ে উঠেছে বড় নালা।
কিশোরগঞ্জে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের উপস্থিতিতে গত কয়েক বছরে একাধিক মতবিনিময় সভায় জেলার সুধীজন নরসুন্দা পুনঃসংস্কারের বিষয়টি তুলে ধরেন। একাধিক সভায় জেলা উইমেন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ফাতেমা জহুরা বেগম রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘কিশোরগঞ্জবাসীর প্রাণ নরসুন্দা নদী। কিন্তু এই নরসুন্দাকে রক্ষার লক্ষ্যে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে। নদী খননের ৩০ কোটি টাকা খনন না করে লোপাট করা হয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি তখন এ বক্তব্য শোনার পর মন্তব্য করেছিলেন, তিনি এসব কেবল শুনতে পারবেন। তার কিছু করার নেই। এসব নিয়ে কথা বলতে হবে মন্ত্রী ও এমপিদের সঙ্গে।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশবাদী সংগঠন কিশোরগঞ্জ নাগরিক অধিকার সুরক্ষার আহ্বায়ক শেখ সেলিম কবীর বলেন, ১১০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি ও নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে বলেই ২০২৪ সাল আসতে না আসতেই নদীটি সরু নালায় পরিণত হয়েছে। এটি একটি ভাগাড় হয়ে উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ সংগঠক অধ্যক্ষ শরীফ সাদী বলেন, ‘নদী খননের প্রায় পুরো টাকাই বোধকরি মেরে দেওয়া হয়েছে। কার্যত নদী খনন করা হয়নি। তাই নদীর তলদেশে গভীরতা ও প্রশস্ততা নেই, নকশা ও খননের কার্যাদেশও নেই। এক কথায় নকশা ও নদী দুই-ই চুরি হয়ে গেছে। নরসুন্দা সরু নর্দমায় পরিণত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শহরের গুরুত্বপূর্ণ নদী নরসুন্দা। এই নদী শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শহরকে দুইভাগে বিভক্ত করে চলে গেছে। তাই কিশোরগঞ্জ শহরকে সুন্দর, চলমান ও দৃষ্টিনন্দন রাখতে নদী খনন ও পানি প্রবাহের বিকল্প নেই। তাই নরসুন্দা নদীর জন্য নতুন করে প্রকল্প হাতে নিতে হবে। নরসুন্দা নদীর প্রাণ ফিরিয়ে দিতে হলে এ জেলার হোসেনপুর উপজেলার কাওনার বাঁধে স্লুইসগেট নির্মাণ করে ব্রহ্মপুত্রের মূল প্রবাহের সঙ্গে নরসুন্দাকে যুক্ত করতে হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নরসুন্দা নদী প্রাণ ফিরে পাবে।’
এ ব্যাপারে এলজিইডির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘নরসুন্দা প্রকল্প সমাপ্তির পর একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী এখানে যোগ দিয়েছেন। আমি যোগ দেওয়ার পর যতটুকু শুনেছি, নরসুন্দা প্রকল্পে কাজের মান ভালো হয়নি। ওয়াকওয়ে ভেঙে যাওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জামানতের টাকা ফেরত না দিয়ে, তা আটক করে কিছু কাজ সমাধা করা হয়েছে। কাজটি খুব দ্রুত করায় কারিগরি ত্রুটির কারণে নানা অসংগতি দেখা দিতে পারে। পানি প্রবাহ ও খনন সম্পর্কে আমার কোনো কিছু জানা নেই। তবে নদীতে পানি প্রবাহ থাকা জরুরি।’ তিনি বলেন, ‘এলজিইডির হিসাব মতে, প্রকল্পের ৩২ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার নদী খনন, নদীর দুই পাড়ের তিন কিলোমিটার পাড় বাঁধাইসহ রয়েছে দৃষ্টি নন্দন সেতু, পার্ক, ফুটপাথ ও ওয়াকওয়ে ইত্যাদি নির্মাণ বাবদ ১১০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল।’
বরাদ্দকৃত টাকায় ৪টি ফুটওভার ব্রিজ, একটি বড় ব্রিজ, দুটি প্রধান সড়কের সার্বিক উন্নয়ন ও মেরামত, লিংক রোড তৈরি ও গুরুদয়াল কলেজ অংশে মুক্তমঞ্চ বর্তমানে দৃশ্যমান। বাকি ওয়াকওয়ের ১৫টি স্থান ভেঙে গিয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নদী সরু নালায় পরিণত হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ উইমেন চেম্বারের সভাপতি ফাতেমা জহুরা বেগম ও নাগরিক সুরক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক শেখ সেলিম কবীর বলেন, ‘প্রথম বরাদ্দের নদী খননের জন্য বরাদ্দকৃত ৩০ কোটি টাকার সিংহভাগ টাকা লোপাট করা হয়েছে।’
কিশোরগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য আইনজীবী নাসির উদ্দিন ফারুকী জানান, ‘নরসুন্দা প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদাররা শুরু থেকেই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ায় প্রকল্পটি যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, তার ১০ ভাগও পূরণ হয়নি। নদীতে স্রোত নেই। ভাগাড়ে পরিণত হওয়া নদীটির পাশে শহরের কয়েক লাখ মানুষকে অস্বাভাবিক পরিবেশে বসবাস করতে হচ্ছে। যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। দুর্নীতি দমন কমিশন নরসুন্দা নদী প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে পারে।’
পৌর মেয়র মাহমুদ পারভেজ বলেন, ‘নদী খননের টাকার বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেই আজ নদীর এই অবস্থা। এ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত।’ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমার তেমন জানা নেই। তবে শুনেছি, নরসুন্দার কাজ সঠিকভাবে না হওয়ায় নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এখানে যোগ দেওয়ার পর একবার কচুরিপানা পরিষ্কারসহ, ওয়াকওয়েতে নির্বিঘ্নে চলাচলসহ কিছু কিছু কাজ করা হয়েছে। আগে কোন ধরনের দুর্নীতি হয়েছে, সেটা জানি না; তবে এটা দৃশ্যমান যে, ৩২ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার নদী খনন করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘নরসুন্দা নদীতে পানি প্রবাহ থাকা জরুরি। কারণ এ নদীর সঙ্গে কিশোরগঞ্জবাসীর আবেগ ও স্বার্থ জড়িত। নরসুন্দা নিয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। সময় ও সুযোগমতো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’