সাইদুল ইসলাম মন্টু, বেতাগী (বরগুনা)
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৪ ২১:৩৮ পিএম
বেতাগীতে বেড়েরধন খালের সেতুর ভাঙা অংশে কাঠের পাটাতন দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলে পারাপার। প্রবা ফটো
বরগুনার বেতাগীতে বেড়েরধন খালের ওপর খোন্তাকাটা লক্ষ্মীপুরা গ্রামের আকনবাড়িসংলগ্ন ভেঙে যাওয়া সেতুটি এখন মারণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সেতুর ভাঙা অংশে কাঠের পাটাতন দিয়ে পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়রা এমন দুর্ভোগে থাকলেও এর সমাধানে কেউ এগিয়ে আসেনি।
গত শনিবার আমতলীতে সেতু ভেঙে বরের বাড়িতে বৌভাতের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে মাইক্রোবাস খালে পড়ায় শিশু, নারীসহ ৯ জন নিহত হওয়ার খবর শোনার পর এই এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
জানা গেছে, উপজেলার সদর ইউনিয়নের খোন্তাকাটা লক্ষ্মীপুরা গ্রামের আকনবাড়িসংলগ্ন বেড়েরধন খালের ওপর ২০০৭ সালে স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগ ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করে। ২০১৮ সালের ১৬ মে ট্রলারের ধাক্কায় সেতুটির মাঝের অংশ ভেঙে যায়। এতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দুই পাড়ের ১০ গ্রামের সহস্রাধিক মানুষ। পরে উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে ২০১৮ সালের ২০ আগস্ট সেতুটির ভাঙা অংশে কাঠের পাটাতন দিয়ে সাময়িকভাবে মানুষ চলাচলের উপযোগী করে দেওয়া হয়।
বরগুনার বেতাগী অংশের বেতাগী পৌরসভা, সদর ইউনিয়নের রাণীপুর, লক্ষ্মীপুরা, খন্তাকাটা লক্ষ্মীপুরা, ভাগল, ঝোপখালী, কিসমত ভোলানাথপুর, দক্ষিণ ভোলানাথপুর, উত্তর বেতাগী ও বাসন্ডা এবং পার্শ্ববর্তী পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ও পূর্ব এই দুই পাড়ের শ্রীনগর, চামটা, মহিষকাটা এলাকার মানুষ এই সেতু ব্যবহার করে। তা ছাড়া সদর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, বেতাগী পৌরশহর এবং দুই উপজেলার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এ পথে নিয়মিত যাতায়াত করে। এসব পথচারী বর্তমানে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় আসা-যাওয়া করে। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স, মাহেন্দ্রা, প্রাইভেট কার বা মিনি ট্রাকে বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করতে পারছে না। সবচেয়ে ভোগান্তির শিকার হতে হয় গুরুতর অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী মা, শিশু ও বৃদ্ধদের।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহজাহান হাওলাদার অভিযোগ করেন, সেই থেকে সেতু দিয়ে মানুষ হেঁটে, মোটরসাইকেল ও আটোরিকশায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করলেও ভারী কোনো যানবাহন পারাপার হতে পারছে না। বর্তমানে কাঠের পাটাতনের লোহার পেরেক আলগা হয়ে অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়েছে।
ভোলানাথপুর গ্রামের বাসিন্দা আটোরিকশাচালক মিরাজ খান বলেন, লোহার এই সেতুর কাঠের পাটাতনের অংশ দিয়ে চলচল করতে গেলে বুক ধড়পড় করে। এমনিতেই যাত্রী নামিয়ে পার হতে হয়। আমতলীতে সেতু ভেঙে পড়ার খবর শোনার পর থেকে এখন ভোলানাথপুর বাজার থেকে ওপার আকনবাড়ি অংশে আসা-যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। এমনিতেই পারাপারে আতঙ্কে ছিলাম, এখন আতঙ্কের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
মোটরসাইকেল চালক জামাল হোসেন বলেন, নড়বড়ে কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে চলাচলের সময় প্রচণ্ড ঝাঁকুনির সৃষ্টি হয়। মনে হয় যেকোনো সময় গাড়ি থেকে ছিটকে পড়তে পারি। তবুও এই সহজ পথে পেটের দায়ে যাত্রী বহন করে চলছি।
স্থানীয় বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য মোতাহার হোসেন বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই সেতু দিয়ে বছরের পর বছর চরম কষ্টে ও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করলেও কেউ এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেনি। একাধিক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন সময় জনসভায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলেও কেউ সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করেননি।
বেতাগী সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. হূমায়ূন কবির খলিফা বলেন, সেতুটির অবস্থা খুবই নাজুক। যাতায়াতে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। শিগগির এটির সংস্কার কিংবা পুনর্নির্মাণ করা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এ বিষয়ে বেতাগী উপজেলা প্রকৌশলী শেখ তৌফিক আজীজ বলেন, সেতুটি নতুন করে টেকসইভাবে নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। শিগগির নতুন সেতু নির্মাণের মাধ্যমে স্থানীয়দের দুর্ভোগ লাঘব করা হবে বলে আশা করেন তিনি।
বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা নাদিরা বলেন, ‘ওই এলাকার মানুষের গুরুত্বপূর্ণ এই সমস্যার কথা বিবেচনা করে আমি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিকট ডিও লেটার প্রদান করেছি। আশা করি, খুব দ্রুতই ব্রিজটি নির্মাণ হবে।’