চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড
আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৪ ০৯:৪৪ এএম
নারায়ণ চন্দ্র নাথ। ছবি : সংগৃহীত
দুর্নীতির নানা পর্যায় অতিক্রম করতে থাকা শিক্ষা কর্মকর্তা নারায়ণ চন্দ্র নাথের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে। এ জন্য সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শৃঙ্খলা শাখায় মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন উপসচিব শাহীনুর আলম। তিনি বলেন, ‘সেই বিষয়ে বুধবার নোট উপস্থাপন করা হয়েছে।’
দুই বছর আগে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফল কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলে শিক্ষা উপমন্ত্রীর পরামর্শে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে বোর্ড সচিব। তদন্তের পর অভিযোগের সত্যতা মেলার কথা জানিয়ে এবং এজন্য বোর্ডের তৎকালীন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথকে দায়ী করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল তদন্ত কমিটি। পরে ওই ঘটনায় মন্ত্রণালয় থেকে নারায়ণ চন্দ্র নাথের বিরুদ্ধে কলেজ অনুবিভাগকে বিভাগীয় মামলা করার দায়িত্ব দেওয়া হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি।
বরং ফল কেলেঙ্কারির গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার এক বছরের মাথায় পদোন্নতি পেয়ে ২০২৩ সালের শেষের দিকে বোর্ডের সচিব হন অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথ। দুই বছর পর আবারও একই অভিযোগ উঠেছে নারায়ণ চন্দ্র নাথের বিরুদ্ধে। দুই বারই তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে মামলা আলোর মুখ না দেখলেও তদন্তে নারায়ণ চন্দ্র নাথের অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে তার ২০২১ সালের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে (এসিআর)। ওই বছর তার এসিআরে বিরূপ মন্তব্য করেন প্রতিস্বাক্ষরকারী কর্মকর্তা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের (মাধ্যমিক-১) অতিরিক্ত সচিব ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন।
নারায়ণ চন্দ্র নাথের ২০২১ সালের বার্ষিক অনুবেদনে তিনি মন্তব্য করেন, ‘চিটাগং বোর্ডের ফলাফল কেলেঙ্কারির জন্য (একরাত্রে ২ বার ফলপ্রকাশ) প্রাথমিকভাবে তাকে দায়বদ্ধ করে বিভাগীয় মামলা চালুর জন্য কলেজ অনুবিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ট্রান্সক্রিপ্ট ছাপানোতে ৪৮১৪৪৪ টাকার বোর্ডের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ রহিয়াছে, যাহা মন্ত্রণালয়ের নথিতে সংরক্ষিত আছে। সে কারণে অনুবেদনকারী কর্মকর্তার সহিত একমত হওয়া গেল না।’ এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এখান থেকে বোর্ডের চেয়ারম্যান তার (নারায়ণ চন্দ্র নাথ) এসিআর ভালো লিখে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন। বোর্ডের এসিআরে প্রতিস্বাক্ষর করতে গিয়ে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব তার সঙ্গে দ্বিমত করেছেন।’
নারায়ণ চন্দ্র নাথের বিরুদ্ধে ওই বিভাগীয় মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখার উপসচিব শাহীনুর আলম বলেন, ‘মামলা করার জন্য কলেজ অনুবিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব সৈয়দা নওয়ারা জাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘মামলার বিষয়টি আমরা দেখি না। এটা শৃঙ্খলা শাখা দেখে।’
দুই বছর আগে তদন্তে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া এবং এসিআরে বিরূপ মন্তব্যের পরও নারায়ণ চন্দ্র নাথের পদোন্নতি কীভাবে হলো তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেনÑ কোনো এক প্রভাব বলয়ের ছায়ায় নারায়ণ চন্দ্র নাথ বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন। এই বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিভাগীয় মামলা হলে শুনতাম। কোনো মামলা সম্ভবত হয়নি। তা ছাড়া উনি তো বেশ প্রভাবশালী কর্মকর্তা। তদন্তে দোষী হওয়ার পরও পদোন্নতি পেয়েছেন।’
তবে অন্য একজন কর্মকর্তার বক্তব্য খানিকটা ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘মাউশি ভালো বলতে পারবে যে, পদোন্নতির ফাইল প্রসেস করতে গিয়ে তারা কত সাল পর্যন্ত এসিআর বিবেচনায় নিয়েছে। এসিআর মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিস্বাক্ষর হওয়ার পর সেটা আবার মাউশির কাছে আসে। সেই হিসেবে ২০২১ সালেরটা ২০২২ সালে আসার কথা। কারও বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য থাকলে সেসব বিষয়ে পরে ওই কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যা তলব করা হয়। এখানে কী হয়েছে তা মাউশি ভালো বলতে পারবে।’ এই বিষয়ে কথা বলতে মাউশির পরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদের মোবাইল ফোনে কল করে এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে চলতি বছরের ২৪ জুন মাউশির উপপরিচালক কিশোর কুমার মহন্ত স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে নারায়ণ চন্দ্র নাথকে অনুবেদনের বিরূপ মন্তব্য প্রসঙ্গে ছয় কার্যদিবসের মধ্যে বক্তব্য জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। এই বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মামলার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমার যা বক্তব্য আমি তা লিখে পাঠিয়েছি।’ তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথ বলেন, ‘এখানে কোনো জালিয়াতি হয়নি। কিছু টেকনিক্যাল ভুল হয়েছে। যার দায়দায়িত্ব কম্পিউটার শাখার। কিন্তু সেই ভুলকে টেনে এনে বারবার জোর করে জালিয়াতির অভিযোগ তুলছেন কিছু ব্যক্তি। সেসব আবার তদন্ত করছেন তাদের বন্ধুবান্ধবরা। আমিও তদন্ত চাই। তবে সেই তদন্ত হতে হবে ফেয়ার তদন্ত।’ তদন্তের বিষয়ে তিনি কাদের প্রতি আস্থা রাখেন এবং কারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের এমন প্রশ্নের জবাবে নারায়ণ চন্দ্র নাথ বলেন, ‘ডিবি আছে, কাউন্টার টেররিজম আছে। যেহেতু তদন্ত চলছে সেহেতু কারা কেন কী করছেÑ এই বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই না। আমার কাছে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত আছে। তদন্তের পর এসব বিষয়ে কথা বলব।’
২০২১ সালে নারায়ণ চন্দ্রের বিরুদ্ধে যে তদন্ত হয়েছিল বিভিন্নভাবে সেই তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। এই বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বোর্ডের সে সময়ের সচিব ও চেয়ারম্যান (চলতি দায়িত্ব) অধ্যাপক আবদুল আলীম লিখেছেন, ‘ফলাফলের বিষয়ে জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হওয়ার প্রেক্ষাপটে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়; যা কারও বিরুদ্ধে ছিল না, অথচ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার শামিল। তিনি নিজেকে নন টেকনিক্যাল পারসন বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করেছেন।’ এ ছাড়াও ওই সময় তদন্ত কমিটির দুই সদস্যের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে সচিবের কাছে আপত্তিও জানিয়েছিলেন অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথ।
২০২৪ সালে আবারও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফল জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে ১৭ এপ্রিল তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এবারও তদন্ত স্থগিত করার আরজি জানিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন নারায়ণ চন্দ্র নাথ। ৪ জুন রিটের শুনানি শেষে বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ তদন্ত কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ দেন। এরপর ওই আদেশের বিরুদ্ধে চেম্বার জজ আদালতে আপিল করে শিক্ষা বোর্ড। ১০ জুন আপিলের শুনানি শেষে চেম্বার জজ এম ইনায়েতুর রহিমের আদালত হাইকোর্টের আদেশটি স্থগিত করেছেন।
তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার এমন চেষ্টাকে ভালোভাবে দেখছে না মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে শৃঙ্খলা শাখাকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে জানিয়ে উপসচিব শাহীনুর আলম বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে তদন্তকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ সংক্রান্ত একটা চিঠি পেয়েছি আমরা কেবিনেট থেকে। সেই বিষয়ে নোট উপস্থাপন করা হয়েছে। অনুমোদন পেলে আবার চিঠি দেব। রিপোর্ট পেলে ব্যবস্থা নেব।’