মধ্যাঞ্চলীয় অফিস
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৪ ০৯:৩০ এএম
সন্তানরা রাস্তায় ফেলে রেখে গেছে ৭০ বছরের বৃদ্ধা গুলেছা বানুকে। প্রবা ফটো
কতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর হলে সন্তান তার অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে রাস্তায় ফেলে রেখে পালিয়ে যেতে পারে! এমনই অমানবিক ঘটনা ঘটেছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনে।
বৃদ্ধা গুলেছা বানুর বয়স ৭০, চামড়া কুঁচকে গেছে, বেঁকে গেছে শরীর। এমন অবস্থায় সাধারণত সন্তানের ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকেন। কিন্তু শেষটা সুখের হলো না বৃদ্ধা গুলেছা বানুর। নিজের সন্তান ঝুমবৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় ফেলে গেছে। আর সেই কষ্ট নিয়েই বৃষ্টির মধ্যে ছয় দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে আছেন। খাদ্য-বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে কাটছে বৃদ্ধার জীবন। পথচারীদের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। অথচ তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে দেখা মিলছে না কারও।
স্থানীয়রা জানায়, গত ২৬ জুন রাত থেকে দেখছেন বেতাল বাজার সংলগ্ন মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনে শুয়ে আছেন এই বৃদ্ধা। পাশে একটা কাপড়ের বস্তা। বেশ কয়েক দিনের অযত্ন আর অবহেলায় পাগল পাগল লাগছে তাকে। কিছুটা অসুস্থ হওয়ায় বাঁ হাত ও পা তেমন নড়াচড়া করতে পারেন না। দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ কেটে গেলেও কেউ তার খোঁজ নিতে আসেনি। স্থানীয়দের মধ্যে অধিকাংশই একনজর দেখে বাড়তি ঝামেলা মনে করে এড়িয়ে যাচ্ছেন। আবার মন কাঁদলেও আইনি ঝামেলার ভয়ে অনেকে পাশে দাঁড়াতেও সংশয় প্রকাশ করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মসূয়া ইউনিয়নের বৈরাগিচর গ্রামে বৃদ্ধার বাড়ি। তার বড় ভাই মৃত ফালু ফকির ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বামী বাতেন ফকির পাঁচ বছর আগে মারা যান। তিনি ছিলেন ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। এরপর থেকে একমাত্র ছেলে হোসেন তার দেখাশোনা করতেন। স্বামীর সঙ্গে ভূমিহীন এই দম্পতি ৩০ বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তার পরিত্যক্ত ভবনে বসবাস করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পরও এখানেই ছিলেন। ছেলে ভবঘুরে হওয়ায় মাকে সহ্য করতে পারতেন না।
স্থানীয়রা জানায়, গত ২৬ জুন রাতে ওই বৃদ্ধাকে তার সন্তান মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ফেলে চলে যায়। এরপর থেকে ওই বৃদ্ধা রাস্তায় মাটিতে শুয়ে ছিল। চলাফেরা করতে না পারায় কেউ খাবার দিলে খেত, না দিলে না খেয়েই পড়ে থাকে। ছয় দিন অর্ধাহারে-অনাহারে থাকায় সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ অসুস্থ শরীর নিয়েই রাস্তার পাশে পড়ে আছেন তিনি। স্থানীয়রা একে অমানবিক ঘটনা উল্লেখ করে ওই সন্তানের শাস্তি দাবি করেছেন।
গুলেছা বানু বলেন, ‘বুধবার বিকালে আমাকে একটা কলা আর একটা রুটি খাওয়াইছে। এরপর বলে আই আজকে রেখে আসব। কিন্তু আমার ছেলে আগে আমারে অনেক দেখছে, কিছুদিন ধরে কেরে আমার লগে এমন লাগাইছে আমি জানি না। সে কয় তুই আমার মা না, আমি তোর ছেলে না। আমারে কয় এনে বইয়া বইয়া খাস, তোর বাপ-দাদার কামাই? কিছু দিছস আমারে? এই কয়ে আমারে গাড়িত তুলে এইহানে রাইখা চইলা গেছে। যাওয়ার সময় আমি কইছি আমারে খাওয়ার কিছু দিয়া যা, রাও করল না আমার লগে, দৌড়ইয়া গেছে গা।’
গুলেছা বানু কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে হোসেন প্রায় সময় অত্যাচার করত। আমি কেন মারা যাচ্ছি না তাই বলত। বাবা গো আমার একটা ব্যবস্থা কইরে দিবাইন, আমি কই যাইবাম, রাতে আমি চোখে দেহি না, আমার যে কেউ নাই।’
খাইরুল ইসলাম ও আকাশ মিয়া বলেন, গত বুধবার সকালে আমরা তাকে এখানে পড়ে থাকতে দেখি। সম্ভবত রাতের কোনো একসময় এখানে ফেলে রাখা হয়েছে। আমরা এই বৃদ্ধাকে খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। দলে দলে তাকে দেখতে আসছে স্থানীয়রা। আকাশে মেঘ ডাকছে, যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। এমন অবস্থায় তারা কোথায় যাবে। বৃদ্ধার বিষয় নিয়ে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা রুনা বাক্তার জানান, ‘বৃদ্ধা এমনিতেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আর কয়দিন বাঁচবে সে? অথচ তাকে দুমুঠো ভাত না দিয়ে অকথ্য নির্যাতন করছে। প্রতিনিয়ত ওই বৃদ্ধাকে মারধর করেছে তার ছেলে।’
গুলেছা বানুর ছেলে হোসেনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাই এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবু বাক্কার বলেন, ‘আমি নিজেও অসুস্থ। খোঁজ নিতে পারিনি। তবে বিষয়টি ইউএনওসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানানো হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘এমন ঘটনায় আমাদের বিশেষ কিছু করার থাকে না। তারপরও নিজেদের অবস্থান থেকে কীভাবে সহযোগিতা করতে পারি তা দেখছি।’