কুষ্টিয়া প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৪ ০৯:১৫ এএম
নিজের ঘর থেকে উচ্ছেদের প্রতিবাদ ও সেখানেই আবার ঘর করে দেওয়ার দাবিতে মঙ্গলবার কুষ্টিায়া জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন লালন ভক্ত। প্রবা ফটো
‘সাপে কাটুক, বাঘে খাক স্বামীর কবরের পাশেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকতে চাই’ বলে মন্তব্য করেছেন কুষ্টিয়ার সেই লালনভক্ত চায়না বেগম। উচ্ছেদকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে তিনি বলেন, আমি লালনভক্ত বলে কি আমি মানুষ না। যারা উচ্ছেদ করেছে তাদের মধ্যে মানবতা ও মনুষ্যত্ব বলে কিছু নেই। তাদের শাস্তির দাবি জানাই।
গতকাল মঙ্গলবার কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন সাঁইয়ের মাজারের সামনে লালনভক্ত ও অনুসারীদের নিয়ে মানববন্ধনে তিনি এসব কথা বলেন।
চায়না খাতুনের ঘর ভাঙার প্রতিবাদে মানববন্ধনের আয়োজন করেন লালন অনুসারী বাউলরা।
চায়না বেগম বলেন, ‘আমাকে নতুন কোনো জায়গায় ঘর তুলে দিলে সেখানে আমি থাকব না, আমি আমার স্বামীর কবরের পাশেই থেকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চাই। তিনি বেঁচে থাকতে বলে গেছেন, তার কবরের পাশে থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা প্রদীপ দিতে, আরাধনা করতে। আমার স্বামীর কবরের পাশে আমার ঘর যারা ভেঙেছে তাদের ওই স্থানে ঘর তুলে দিতে হবে। এলাকার মেম্বার মাতবররা আমাকে নতুন জায়গায় ঘর করে দিয়ে সমাধানের কথা বলেছে। সেটাতে আমার মত ছিল না। এই সমাধান আমি মানি না।’
এ সময় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন চায়না বেগমের গুরু মা আম্বিয়া খাতুন, ছোট বোন আছিয়া বেগম, ভাই আমজাদ, লালনভক্ত হরফ মণ্ডল, সিরাজ শাহ প্রমুখ। এরপর কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসকের কাছে তারা স্মারকলিপি জমা দেন।
গত ২৬ জুন সকালে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল ইউনিয়নের টাকিমারায় ৮০ বছর বয়সি লালনভক্ত চায়না বেগমকে অনৈসলামিক ঘোষণা দিয়ে স্বামীর কবরের পাশে নির্মাণ করা ঘর ভেঙে দেন স্থানীয় মেম্বার ও মাতবররা। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে লাঞ্ছিতও হন তিনি। শেষমেশ অভিযোগ জানান কুষ্টিয়া মডেল থানায়। চায়না বেগম এলাকার সাবেক ইউপি মেম্বার এনামুল হক, মাতবর মোশারফ হোসেন, আনার মণ্ডল ও সাইদুল হাজির নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে বাড়িঘর ভাঙচুর করে লক্ষাধিক টাকার ক্ষতিসাধনের অভিযোগ আনেন। এরপর থেকে পোড়াদহ রেলস্টেশনে দিন যাপন করছেন তিনি।
এদিকে অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২৮ জুন, শুক্রবার থানায় বৈঠকে অন্য জায়গায় নতুন ঘর তৈরি করে দেওয়ার শর্তে সমঝোতা হয়েছে। মীমাংসায় চায়না বেগম ও তার বোনের স্বামী সাধু শাহাবুদ্দিন সাবুসহ স্থানীয় কাউন্সিলর, মাতবর ও অভিযুক্তরা উপস্থিত ছিলেন। তবে চায়না বেগমের দাবি তার মতের বিরুদ্ধে এই মীমাংসা হয়েছিল।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক এহতেশাম রেজা জানান, চায়না বেগম ও লালনভক্ত অনুসারীরা স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। তার নতুন ঘরের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া আইনগত পদক্ষেপ নিতে পুলিশ সুপারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হবে।
এদিকে বাউলদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ ও তাদের নিরাপত্তার দাবিতে বিবৃতি দিয়েছেন ৫৬ জন সংস্কৃতিকর্মী ও সাহিত্যিক। তারা বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে মানবতাবাদী এই মানুষদের ওপর নির্যাতনের বা আগ্রাসনের ঘটনা কাম্য নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন সময়ে আমরা লক্ষ্য করি যে বাউল, ফকির, সাধকদের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া, তাদের ঘরবাড়ি ও বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করা, তাদেরকে বিতাড়িত করা, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করাসহ নানান রকমের আগ্রাসন ঘটে।
বিবৃতিতে চারটি দাবি জানানো হয়েছে। এগুলো হলো- বাউল, ফকির, বয়াতি ও লালন অনুসারীদের নিরাপত্তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ, তাদের ওপর যে কোনো আক্রমণ বা নির্যাতনের দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা, তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা না দিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া, সাধারণ জনগণের মধ্যে বাউল, ফকির, বয়াতি ও লালন অনুসারীদের সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি।
বিবৃতিতে সই করেন অটমনাল মুন, আহমেদ হাসান সানি, আলতাফ শাহনেওয়াজ, আমিরুল রাজিব, আরিফুর রহমান, আরমীন মূসা প্রমুখ।