লোডশেডিং
আমানত উল্যাহ, কমলনগর (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৪ ১১:০২ এএম
প্রতীকী ছবি
মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি ভুতুড়ে বিলে দিশাহারা লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহকরা। গত দুই মাস ধরে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এ ছাড়াও সার্ভিস ড্রপের সরবরাহ বন্ধ এবং নতুন মিটার না থাকায় দেওয়া হচ্ছে না নতুন সংযোগও। অভিযোগ জানাতে গেলে গ্রাহকদের বলা হয় মিটার রিডিং ভিডিও করে আনার জন্য। সব মিলিয়ে নানা অভিযোগ রামগতি ও কমলনগর উপজেলা পল্লী বিদ্যুতের প্রতি। সমিতির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না তারা।
নষ্ট মিটার পরিবর্তনের আবেদন দীর্ঘদিন পড়ে থাকলেও পরিবর্তন হচ্ছে না মিটার। আবার গ্রাহককে না জানিয়েও পরিবর্তন করে লাগানো হচ্ছে পুরাতন মিটার বলে অভিযোগ। উপজেলার নুরিয়া হাজিরহাট এলাকার চা-দোকানি মো. বয়ান। দোকানে দুটি ফ্যান ও দুটি লাইট ব্যবহার করছেন। গত মে মাসে তার বিল আসে ২ হাজার ৭৯ টাকা। অভিযোগ জানাতে গেলে অফিস থেকে বলা হয়, মিটার নষ্ট তাই বিল বেশি আসতে পারে। মিটার পরিবর্তন করতে হবে। আগে কাগজে আসা বিল পুরোপুরি জমা দিতে হবে, তারপর অভিযোগ ও মিটার পরিবর্তনের আবেদন করতে হবে। অতিরিক্ত বিল দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফিরে আসেন তিনি।
মো. বয়ান বলেন, মাসে দুই-আড়াইশ টাকার বেশি বিল আসে আসে না। হুট করে মে মাসে বেশি বিল আসে। অফিসে গেলে বলা হয়, মিটার পরিবর্তন করা হয়েছে। এটি সমাধান করতে সময় লাগবে। না জানিয়ে মিটার কেন পরিবর্তন করা হয়েছেÑ এমন প্রশ্ন করলেও কোনো উত্তর পাইনি।
চররমিজ ইউনিয়নের চরমেহার গ্রামের বেলাল উদ্দিন জানান, বছরের শুরু থেকে অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ নিয়ে গেছেন অফিসে। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত বিল বাবদ ৩ হাজার টাকা জমা দিয়ে অভিযোগ করেন। মিটার পরিবর্তনের জন্য ২৭০ টাকা দিয়ে আবেদন করার তিন মাস পার হলেও পরিবর্তন হয়নি।
রামগতি পৌরসভার চর হাসান-হোসেন গ্রামের বাসিন্দা মো. কামাল উদ্দিনের এপ্রিলে ব্যবহৃত ইউনিট ছিল ১ হাজার ৮৯৫, মে মাসেও ব্যবহৃত ইউনিটও ১ হাজার ৮৯৫। কিন্তু মে মাসে বিল করা হয়েছে ৩৯৫ ইউনিটের। কামাল উদ্দিনের অভিযোগ বিগত দিনগুলোতে গড়ে ৪০ থেকে ৬০ ইউনিটের মধ্যে বিল এলেও মে মাসে অস্বাভাবিক বিল আসছে। অভিযোগ জানাতে গেলে আগে বিল পরিশোধ করে তারপর মিটার পরিবর্তনের আবেদন করতে বলা হয়। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু এখনও মিটার পরিবর্তন হয়নি।
সরেজমিনে রামগতি ও কমলনগর উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়ে দেখা গেছেÑ অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ এবং মিটার পরিবর্তনের আবেদন নিয়ে দৈনিক ৩০-৪০ জন গ্রাহক হাজির হচ্ছেন। অভিযোগ করতে আসা গ্রাহকদের সঙ্গে অফিস স্টাফদের বাকবিতণ্ডা হয়। অভিযোগ নিয়ে এসে বিড়ম্বনার কথা জানিয়ে চররমিজ ইউনিয়নের চরআফজল থেকে আসা আবদুল হালিম বলেন, অফিস থেকে বলা হচ্ছে মিটার রিডিং ভিডিও করে আনার জন্য। আমাদের তো ভিডিও করার মতো মোবাইল নেই। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। হঠাৎ করে আমাদের বিদ্যুৎ বিল বেশি আসছে তা জানি না। এত বিল দেওয়ার সামর্থ্য নেই।
রামগতি পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক শাহাদাত হোসেন, আশরাফ উদ্দিন আসিফ, শরীফ উদ্দিনসহ কয়েকজন জানান, লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় জীবনযাপন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একদিকে তীব্র গরমে ঘুমাতে পারছি না। অন্যদিকে অন্যান্য স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি বিল আসছে। এইচএসসি পরীক্ষার্থী সাবিনা ইয়াছমিন ও মো. মেজবাহ জানান, দৈনিক ৪ থেকে ৬ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। ৩০ জুন থেকে পরীক্ষা শুরু। পড়ালেখা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পরীক্ষা দেওয়াটাও কঠিন হবে।
রামগতি পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা ৬৫ হাজার। গ্রাহকদের বহুবিধ সুবিধার কথা মাথায় রেখে সাধারণ মিটারগুলোকে প্রিপেইড মিটারে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৩৮ হাজার গ্রাহকের জন্য প্রিপেইড মিটারের একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এ কাজ শুরু হবে। উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১৪ মেগাওয়াট। কিন্তু বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ৪ থেকে ৫ মেগাওয়াট। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পেলে লোডশেডিং কমবে।
সমিতির ডিজিএম রেজাউল করিম বলেন, রামগতি এলাকার পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহকরা সচেতন নয়। তারা বিলের সঙ্গে মিটার রিডিং মেলান না। এ ছাড়াও আমাদের মিটার রিডাররাও না দেখেই গড়পড়তা ইউনিট লিখে দেয়। যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করায় ইতোমধ্যে ১২ জন মিটার রিডারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কেউ অভিযোগ করলে সমাধান করে দেওয়া হচ্ছে।
নষ্ট মিটার পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বৈশ্বিক কারণে মিটার সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তাই মিটার পরিবর্তনে সময় লাগছে। এ ছাড়া অনেক গ্রাহকের ইউনিট বকেয়া রয়েছেÑ সেগুলো সমন্বয় করতে গিয়েই এখন বেশি ইউনিট দেখাচ্ছে।
কমলনগর উপজেলা ডিজিএম নিতীশ সাহা বলেন, উপজেলায় প্রায় ৫৬ হাজার গ্রাহক রয়েছে। বিদ্যুৎ চাহিদা ১০ মেগাওয়াট। কিন্তু আমরা পাচ্ছি মাত্র সাড় ৪ মেগাওয়াট। এত অল্প মেগাওয়াট দিয়ে শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।