× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দূষণ ও লোভে বিপন্ন হালদা

এস এম রানা, চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৪ ১০:২৬ এএম

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৪ ১২:২৩ পিএম

কাটাখালী খাল থেকে কারখানার বর্জ্য মিশ্রিত দূষিত পানি গিয়ে পড়ছে হালদা নদীতে। প্রবা ফটো

কাটাখালী খাল থেকে কারখানার বর্জ্য মিশ্রিত দূষিত পানি গিয়ে পড়ছে হালদা নদীতে। প্রবা ফটো

কারখানার বর্জ্য, বিষ দিয়ে শাখা খালের মাছ নিধন, ড্রেজারের আঘাত, চোরাইভাবে বড়শি দিয়ে মাছ শিকারিদের লোভের ফাঁদে পড়ে বিপন্ন হতে বসেছে হালদা নদীর মা মাছ। গত এক সপ্তাহে তিনটি বড় আকারের মা মাছ এবং একটি বড় ডলফিনের মৃত্যুর পর হালদা দূষণের বিষয়টি পুনরায় সামনে এসেছে। যদিও সরকার হালদা রক্ষায় একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে এবং এর কিছু সুফল পাওয়া গেছে। 

কিন্তু এখন হালদা ঘিরে দূষণ, দখল, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনসহ নানা ধরনের অপকর্ম বেড়েছে। ফলে মা মাছের মৃত্যু হচ্ছে। চলতি বছর ডিম পাওয়া গেছে মাত্র ১ হাজার ৬৮০ কেজি। অথচ ২০২৩ সালে পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ১৪ হাজার কেজি। এ বছর ডিমের জোঁ শেষ হয়েছে। তবে বজ্রবৃষ্টির সময় জুলাই মাসেও ভাগ্যজোরে কিছু ডিম পাওয়া গেলেও যেতে পারে। ২৯ জুন পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য জোঁ শেষ হওয়ায় বলা যায়, গত বছরের চেয়ে চলতি বছর ডিম কম আহরিত হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কেজি।

হালদা বিশেষজ্ঞ ড. মো. শফিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘হালদা এবং শাখা নদীগুলোতে এখন দূষণ বাড়ছে। শিল্পকারখানার বিষাক্ত বজ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। সঙ্গে যোগ হচ্ছে পোল্ট্রি, গৃহস্থালি ও মানববর্জ্য। অন্যদিকে হালদা নদীর অংশে অনেক বালু জমেছে। কিছু লোক অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে। এতেও নদী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শাখা নদীগুলোতে অনেক সময় বিষ দিয়ে মাছ মারা হয়। এই বিষের একটি অংশ মিশছে হালদায়। ফলে সেখানে মাছ মরছে।’ তিনি বলেন, ‘এটা সত্য নদীর কিছু অংশে বালু জমেছে। সেখান থেকে বালু উত্তোলন করতে হবে সরকারি নিয়মনীতি মেনে পরিকল্পিত উপায়ে। ব্যবহার করতে হবে অযান্ত্রিক পদ্ধতি। কিন্তু এখন অসাধু ব্যক্তিরা ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করছে।’ 

গত ২৫ জুন হাটহাজারীর কাটাখালী এলাকা পরিদর্শনের সময় এই গবেষক দেখেন, কাটাখালী খালের পানির বিভিন্ন কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য মিশে কালো বর্ণ ধারণ করেছে। সেই পানির গন্তব্য হালদা। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হালদা নদীর সঙ্গে বিভিন্ন শাখা খাল যুক্ত। এসব খালের পাশাপাশে বিভিন্ন ধরনের কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারকাখানায় ইটিপি ব্যবস্থা চালু নেই। ফলে কারখানা কর্তৃপক্ষ সময়ে সময়ে বিষাক্ত পানি খালে ছেড়ে দেয়। সেই পানি গিয়েই পড়ে হালদায়। এতে মা মাছের প্রজনন সমস্যাসহ নানা সমস্যা হয়। 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ জুন বিকালে হালদা থেকে একটি মরা ডলফিন উদ্ধার হয়। এটির ওজন প্রায় ৯০ কেজি। এই ডলফিনটির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করেন হালদা নদী বিশেষজ্ঞ শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক ওজনের একটি ডলফিন ৯০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এটি প্রাপ্ত বয়স্ক। শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই। এই কারণে সর্বশেষ মারা যাওয়া ডলফিনটির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর আগে মারা যাওয়া একাধিক ডলফিনের মুখে কারেন্ট জাল ছিল। কয়েকটি ডলফিনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাই ধারণা করা যায়, ওসব ডলফিন কারেন্ট জালে আটকে এবং ড্রেজারের প্রপালারের আঘাতে আহত হয়ে মারা গেছে।’ ডলফিন উদ্ধার-পরবর্তী সপ্তাহ না ঘুরতেই তিনটি মা মাছের মৃত্যুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি মা মাছের শরীরে বড়শির আঘাত ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এটি বড়শির সঙ্গে লেগেছিল। পরে বড়শি থেকে নিজকে মুক্ত করতে গিয়ে মুখের একাংশ ছিঁড়ে গেছে এবং পরে মারা যায়। বাকি দুটি মাছ বেশি পচে যাওয়ায় শরীরের আঘাত চিহ্নিত করা সম্ভব  হয়নি। মাছ দুটি মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।’ 

বাংলাদেশে মিঠাপানির মা মাছের পোনা উৎপাদনের জন্য হালদা একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন উৎস। এই খাল থেকে আহরিত ডিম থেকে পোনা উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। মিঠাপানির প্রাকৃতিক প্রজননস্থলটি রক্ষায় সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এর বেশকিছু সুফল ইতোমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। হালদা ঘিরে সরকারি প্রকল্পের সুফল পাওয়ার বিষয়ে চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকারি প্রকল্পের বেশ সুফল পাওয়া গেছে। এখন জেলেরা অনেক বেশি সচেতন। তারা মা মাছ শিকার করেন না। বলা যায়, মা মাছ শিকার প্রায় বন্ধ। হালদা নদীর আশপাশে বেশকিছু ইটভাটা বন্ধ হয়েছে। এছাড়া হালদায় এখন ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলে না। এসব দৃশ্যমান সাফল্য। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ দেশে একটি প্রকল্প শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। সেই হিসেবে এখনও কিছু জেলে চোরাইভাবে বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন। এতে মা মাছ আহত হয়ে মারা যাচ্ছে বা সরাসরি জেলের হাতে ধরা পড়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির বিরূপ আচরণের কারণেও হালদায় মা মাছ ডিম দিচ্ছে না। এর সঙ্গে দূষণের দায় তো অবশ্যই আছে। আবার কর্ণফুলী নদীর মোহনার দিকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়। সেখানে ড্রেজারের আঘাতে মাছ এবং ডলফিন আহত হয়। আহত মাছ ও ডলফিনের মৃত্যুও হচ্ছে।’ 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় প্রতি বছরই মৃত ডলফিন পাওয়া যাচ্ছে হালদা নদীতে। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে এই সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ৯০টিতে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরও হালদাকে দূষণমুক্ত করতে না পারা দুঃখজনক উল্লেখ করে আলীউর রহমান বলেন, ‘হালদা রক্ষায় আরও কার্যকর এবং সুসমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে। না হলে হালদা নদীর মা মাছ মারা যাবে।’ তিনি বলেন, ‘সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। দূষণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব কারখানায় ইটিপি নেই, সেগুলোতে ইটিপি স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা