× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অবকাঠামোগত ত্রুটির সুযোগ নেন চার কয়েদি

মোহন আখন্দ ও অরূপ রতন, বগুড়া

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৪ ১৪:২৭ পিএম

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৪ ১৪:৪২ পিএম

বগুড়া জেলা কারাগার। ফাইল ফটো

বগুড়া জেলা কারাগার। ফাইল ফটো

১৮৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বগুড়া কারাগারের কনডেম সেল রয়েছে পাঁচটি। এর মধ্যে একটিতে ছিলেন গত মঙ্গলবার রাতে পালিয়ে যাওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি। তারা পালানোর সুযোগ পেয়েছেন কারাগারের অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে। ঘটনা তদন্তে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নেপথ্যের কারণ চিহ্নিত করেছে। পালানোর মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে পুলিশের হাতে ধরা পড়া চার কয়েদিকে গত বুধবার রাতে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। সাজা হিসেবে তাদেরকে ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়েছে। রাখা হয়েছে জঙ্গি ও ভয়ংকর অপরাধীদের জন্য নির্ধারিত সেলে। ঘটনার দিন দায়িত্ব অবহেলার কারণে এক ডেপুটি জেলারসহ পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। বিভাগীয় মামলা হয়েছে কারা-সংশ্লিষ্ট তিনজনের বিরুদ্ধে। বাড়ানো হয়েছে কারাগারের ভেতর-বাইরের নিরাপত্তা। প্রতিটি সেলের সামনে দুজন করে কারারক্ষী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

চার কয়েদি হলেন- বগুড়ার কাহালু পৌরসভার মেয়র আব্দুল মান্নান ওরফে ভাটা মান্নানের ছেলে জাকারিয়া, বগুড়া সদর উপজেলার কুটুরবাড়ি পশ্চিমপাড়ার ইসরাইল শেখের ছেলে ফরিদ শেখ, নরসিংদীর মাদবদী উপজেলার ফজরকান্দি গ্রামের মৃত ইসরাফিল খাঁর ছেলে আমির হামজা ওরফে আমির হোসেন ও কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার দিয়াডাঙ্গা গ্রামের মৃত আজিজুল হকের ছেলে নজরুল ইসলাম মজনু।

মঙ্গলবার রাত ৩টা ৫৫ মিনিটের দিকে কারাগারের ২ নম্বর জাফলং সেলের ছাদ ফুটো করে পালিয়ে যান ওই চার ফাঁসির আসামি। ১৫ মিনিটের মাথায় শহরের চেলোপাড়া এলাকা থেকে ভোর ৪টা ১০ মিনিটে পুলিশের কাছে তারা ধরা পড়েন। তাদের বিরুদ্ধে বুধবার বগুড়া সদর থানায় মামলা করেছেন বগুড়া কারাগারের জেলার ফরিদুর রহমান রুবেল। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে কারা অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের পৃথক কমিটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল শেখ সুজাউর রহমানের নেতৃত্বে অধিদপ্তরের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি দিনভর কারাগারের ভেতর অনুসন্ধান চালিয়েছে। বিকালে কারাগারে প্রবেশ করেন বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিএম ইমরুল কায়েসের নেতৃত্বে গঠিত প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বগুড়া সদর পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক সুজন মিয়া বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কারাগারের ভেতর তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তদন্তের স্বার্থে তিনি ঘটনাস্থলের কিছু স্থিরচিত্র ধারণ করেছেন।

অবকাঠামোগত ত্রুটি

নজিরবিহীন ঘটনা সম্পর্কে জানতে বগুড়া কারাগারের কয়েকজন প্রবীণ কারারক্ষীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ। তাদের তথ্যমতে, কারাগারের উত্তর-পূর্বদিকে প্রধান ফটকের পাশে অবস্থিত পাঁচ কক্ষবিশিষ্ট কনডেম সেল ভবন। এটি একসময় কারা কর্মকর্তার বাসভবন ছিল। পরে কনডেম সেলে রূপান্তর করা হয়। ভবনের উত্তরদিকে নিজস্ব দেয়াল নেই; কারাগারের সুউচ্চ সীমানাপ্রাচীরই দেয়াল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। সেলের ছাদ ফুটো করে মঙ্গলবার রাত ১টা থেকে ৩টা ৫ মিনিটের মধ্যে চার কয়েদি ছাদে ওঠেন। তারা নিজেদের ব্যবহৃত বিছানার চাদর গিঁট দিয়ে রশি বানিয়ে ছাদসংলগ্ন লোহার গ্রিলের সঙ্গে বাঁধেন। উত্তরদিকে দেয়াল হিসেবে ব্যবহৃত সীমানাপ্রাচীরের বাইরে এই রশি ঝুলিয়ে তারা পালানোর সুযোগ নেন।

তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কারারক্ষীরা জানান, সীমানপ্রাচীরই সেলটির একপাশের দেয়াল হওয়ায় কয়েদিরা খুব সহজেই সামান্য উঁচুতে লাফ দিয়ে (ছাদ থেকে দেয়াল বা সীমানাপ্রাচীরের উচ্চতা ৩-৪ ফুট বেশি) প্রাচীরের ওপর উঠে পড়েন। তারপর রশি ধরে একে একে নিচে অর্থাৎ কারাগারের বাইরে চলে যান। সেলগুলো সীমানাপ্রাচীর থেকে দূরে থাকলে কয়েদিরা এভাবে পালানোর সুযোগ পেতেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারা কর্মচারী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কনডেম সেলগুলোর অবস্থান সীমানাপ্রাচীর থেকে অন্তত ১০০-১৫০ ফুট দূরে অবস্থান হলে কয়েদিরা পালানো তো দূরের কথা, এটা নিয়ে ভাবতেও না।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জানান, মানবিক কারণে প্রতিটি সেলে ঘড়ি রয়েছে। কয়েদিদের পক্ষে সময় দেখাও সহজ হয়েছিল। তাছাড়া ঘনঘন লোডশেডিংও তাদের পালাতে সহায়তা করে।

দীর্ঘ কারাবাসের অভিজ্ঞতায় পরিকল্পনা

আচরণগত বৈশিষ্ট্য, কারাবাসের অভিজ্ঞতা ও মামলার বিবরণ পর্যালোচনা করে পালানোর ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক সুজন মিয়া নিশ্চিত হয়েছেন- কয়েদি নজরুল ইসলাম মজনু ও আমির হোসেন ওরফে আমির হামজা কারাগার থেকে পালানোর পরিকল্পনা করেন। তাছাড়া বগুড়া কারাগার এবং এর পরিস্থিতি সম্পর্কে পালানোর এই দুজনের অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে।

প্রায় সাড়ে ১০ বছর আগে ২০১৪ সালের ১৪ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার দিয়াডাঙ্গা গ্রামে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার অভিযোগে মজনু ও আমির হামজাকে তাদের সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তারা দেশের বিভিন্ন কারাগারে ছিলেন। প্রায় আট বছর আগে তাদেরকে বগুড়া কারাগারে আনা হয়। এখানে অবস্থানকালেই কুড়িগ্রামের আদালত ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মজনু ও আমির হামজাসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। ঘোষণার দিন মজনু আদালতের এজলাস ভাঙচুর করেন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ধরা পড়ার সময় তাদের কাছ থেকে প্লাস্টিকের রশি প্যাঁচানো ৪ দশমিক ৩ ইঞ্চি লম্বা স্টিলের পাত এবং ৭ ইঞ্চি লম্বা স্ক্রু ড্রাইভার জব্দ করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে তারা লোহার বালতির হাতল এবং স্কেলের মতো দেখতে স্টিলের পাত কাজে লাগিয়ে ১৪০ বছরের পুরোনো টালিযুক্ত ছাদ কেটে ফুটো করে ফেলেন। ছাদটি ফুটো করার জন্য তারা ছাদের নিচে কাঠের খাটিয়াও সরিয়ে নেন।

মজনু ও আমির হামজার বগুড়া কারাগার সম্পর্কে অভিজ্ঞতার বিষয় উল্লেখ করে তদন্ত কর্মকর্তা সুজন মিয়া বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে ওই দুজন একই সেলে বসবাসরত অন্য দুই কয়েদি জাকারিয়া ও ফরিদ শেখের সঙ্গে পালানোর পরিকল্পনা করেন। তাদের কাছ থেকে যে স্ক্রু ড্রাইভার পাওয়া গেছে, সেটি তারা কারাগার থেকে বের হওয়ার পর কুড়িয়ে পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন। স্ক্রু ড্রাইভারটি তারা নিরাপত্তার স্বার্থে নিজেদের কাছে রেখেছিলেন। এছাড়া গণমাধ্যমে যে খবর প্রচার হয়েছেÑ চার কয়েদির কাছে অনেক টাকা ও বিপুল সিগারেট ছিল; আদতে এমন কিছুই পাওয়া যায়নি। তাদেরকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চেয়ে আদালতে তোলা হবে।

নিরাপত্তায় ঘাটতি

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের সেলের নিরাপত্তায় মোতায়েন থাকেন দুজন কারারক্ষী। তবে ঘটনার দিন সেখানে একজন কারারক্ষী ছিলেন। সীমানাপ্রাচীরের বাইরেও একই সময় রক্ষী ছিলেন না। কয়েদি পালানোর পর সতর্কতামূলক পদক্ষেপ ‘পাগলা ঘণ্টা’ বাজানো হয়নি। কারাগারের বাইরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নৈশকালীন নিরাপত্তায় পুলিশসহ অনেক প্রহরী থাকেন। পাগলা ঘণ্টা না বাজার কারণে কয়েদি পালানোর ঘটনা তারাও জানতে পারেননি।

ডেপুটি জেলারসহ পাঁচজন বরখাস্ত

কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বুধবার রাতে কারাগারে ফেরত আনার পরপরই চার কয়েদিকে শাস্তিস্বরূপ ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়। জঙ্গিসহ ভয়ংকর অপরাধীদের জন্য নির্ধারিত ‘আত্রাই’ সেলে পৃথকভাবে তাদের রাখা হয়েছে।

জেল সুপার আনোয়ার হোসেন জানান, দায়িত্বে অবহেলার কারণে একজন ডেপুটি জেলারসহ পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া আরও তিনজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে।

বরখাস্তরা হলেন- ডেপুটি জেলার হাসানুজ্জামান, সর্বপ্রধান কারারক্ষী ফরিদ উদ্দিন, প্রধান কারারক্ষী দুলাল হোসেন, হাবিলদার আব্দুল মতিন ও কারারক্ষী আরিফুল ইসলাম।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য

ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কারা অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল শেখ সুজাউর রহমান। কারাগারের অবকাঠামোগত ত্রুটির বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সীমানাপ্রাচীর থেকে সেলগুলোর নিরাপদ দূরত্ব রাখা উচিত ছিল। কিন্তু বগুড়া কারাগার ১৪০ বছর আগে নির্মিত। যখন এটি নির্মাণ করা হয়, তখন হয়তো এগুলো সেভাবে ভেবে দেখা হয়নি। এগুলো বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে।

চার কয়েদি কীভাবে পালানোর সুযোগ পেলেন, ভেতর ও বাইরের কেউ জড়িত কি-না বিষয়গুলোর প্রাধান্য দিয়ে তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন। তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিএম ইমরুল কায়েস জানান, এ ধরনের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেসব বিষয় মাথায় রেখেই তারা তদন্ত শুরু করেছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সীমানাপ্রাচীরের সঙ্গে কারাগারে প্রবেশের যে সড়ক রয়েছে, যেটি দিয়ে প্রতিদিন অনেক মানুষ চলাচল করে, সেটিও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি অন্য আর কী কী বিষয় কারাগারের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলো তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা