রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৪ ২২:৩৬ পিএম
রাজধানী ঢাকার একটি বাড়িতে এক রকমের আবদ্ধ থেকে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে নির্যাতন সহ্য করে অবশেষে নিজ বাড়িতে পালিয়ে এসেছেন গৃহকর্মী রেখা আক্তার। গত শনিবার মধ্যরাতে নিজ বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের শিবগঞ্জ বাজার এলাকায় ফিরেছেন তিনি।
সাংবাদিকদের রেখা জানান, তার বয়স যখন ১৩ বছর, তখন অভাবের তাড়নায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ঢাকাপ্রবাসী মহসিন আলী তাকে ঢাকার ভাড়াবাসায় গৃহ পরিচারিকার কাজের জন্য নিয়ে যান। সেখানে তিনি এক বছর কাজ করেন। এ সময় প্রায়ই মহসিনের অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী রুনা আক্তার ও তার আত্মীয় লোটাস তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। বাড়িতে আসতে চাইলেও দিতেন না। নির্যাতন সইতে না পেরে কোনো এক সকালে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন।
রেখা আরও জানান, একসময় কোনো এক মহিলার কাছে কাজের সন্ধান চাইলে তাকে একটি বাড়িতে নিয়ে যান এবং সে বাড়িতে কাজ শুরু করেন।
রেখা তখনও জানতেন না এ বাড়িতে তাকে এক প্রকার আবদ্ধ থেকে দীর্ঘ এক যুগ নির্যাতন সহ্য করতে হবে। কাজে যোগ দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলে তিনি নিজ বাড়িতে আসতে চাইলে তাকে আসতে দেওয়া হয়নি। বরং বাড়ির কথা মুখে নিলেই লোহার রড, কাঠ দিয়ে শুরু হতো অমানবিক নির্যাতন। সেসব আঘাতের চিহ্ন এখনও শরীরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
রেখা বলেন, ‘আমাকে বন্দি করে রাখা হতো। বাসার ময়লা ফেলতে গেলেও সে বাড়ির লোকজন আমাকে পাহারা দিত যাতে আমি পালাতে না পারি। ভাবলেই বুক কাঁপে আমার। তারা আমাকে আমার বাড়িতে যোগাযোগ পর্যন্ত করতে দেননি। আমাকে তালা দিয়ে রাখা হতো।
ঢাকার কোন এলাকায় ছিলেন জানতে চাইলে রেখা বলেন, আমি লেখাপড়া জানি না। শুধু জানি ঢাকা যাওয়ার প্রথমদিকে ভূতের গলি নামের একটি জায়গার আশপাশে ছিলাম। পরবর্তীতে যে বাসায় কাজ নিয়েছিলাম, তার কোনো কিছুই আমি জানি না। ওই বাড়িতে ঢুকার পর আর বের হওয়ার বা কোনো মানুষের সাথে মেলামেশারও সুযোগ দেননি তারা। সারাক্ষণ ঘরবন্দি করে রাখতেন আর বাড়ির কথা মুখে নিলেই মারধর করতেন। কষ্টের বিষয় এই ১৩ বছরে আমাকে কাজের কোনো মজুরি দেননি তারা। এটুকু জানি সে বাড়ির মালিকের নাম ছিল মাহাবুব হোসেন ও তার স্ত্রীর নাম ঝরনা আক্তার। আমি সেখানে কাজ শুরুর কিছুদিনের মধ্যে মাহাবুব হোসেন আফগানিস্তানে চলে যান। তার স্ত্রী আমার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালান।
অবশেষে কীভাবে পালিয়ে এলেন জানতে চাইলে রেখা বলেন, সেদিন বাসার শোকেসের ওপর চাবি ছিল। আমি সে চাবি দিয়ে বাড়ির সদর দরজা খুলে পালিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি। এরপর এক বয়স্ক লোকের কাছে ঘটনা শুনিয়েছি। তিনি আমাকে ৬০০ টাকা সাহায্য তুলে দিয়ে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছতে সহযোগিতা করেন। তারপর বাসের কন্ডাক্টর আমাকে ঠাকুরগাঁও পৌঁছে দেন।
বাড়ি ফিরে কেমন লাগছে জানতে চাওয়া মাত্রই নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি রেখা। অশ্রুসিক্ত অবস্থায় রেখা বলেন, বাড়ি ফিরে জানতে পারলাম আমার বাবা ও চাচা আর পৃথিবীতে নেই। দুর্ঘটনায় মারা গেছে। বাড়ি ফেরার মধ্যে আনন্দ কাজ করলেও বাবা হারানোর কষ্ট আমাকে তাড়া করছে। শত নির্যাতনের পরও আমাকে যদি তারা বাড়িতে যোগাযোগ করার সুযোগ দিতেন, তাহলে অন্তত বাবা মারা যাওয়ার খবরটা জানতে পারতাম।
রেখার পরিবারে মাসহ আরও দুই বোন ও এক ভাই রয়েছে। যার মধ্যে রেখা সবার বড়।
ছোট ভাই লিটন আলী বলেন, আমরা শুধু জানতাম আমাদের এক বড় বোন আছে। যে ঢাকায় কাজ করতে গিয়ে আর ফেরেনি। সে বাড়ি ফিরে এসেছে। আমরা তাকে প্রথম দেখেছি। বোনের ফিরে আসাতে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।
রেখা ফিরে আসায় খুশি প্রতিবেশীরাও। তার ফিরে আসার খবর শুনে দলে দলে তাকে দেখতে ভিড় করছে মানুষ।
প্রতিবেশী নাজমা বেগম বলেন, যখন রেখা কাজের জন্য ঢাকা যায়, সে অনেক ছোট ছিল। পরে আর তাকে দেখা হয়নি। আমরা জানি সে হয়তো মারা গেছে। দীর্ঘ ১৩ বছর পর তাকে দেখে সত্যি ভালো লাগছে। তবে তার মুখে নির্যাতনের কথা শুনে খারাপ লাগছে। যারা তারা সাথে এমন অমানবিক নির্যাতন করছেন, তারা যেন শাস্তি পান, এটা আমাদের কামনা।
এদিকে রেখার মা আনোয়ারা বেগম মেয়ের ওপর এমন অমানবিক নির্যাতন ও গৃহে বন্দি রেখে পরিবারের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নের দায়ে দোষীদের শাস্তি দাবি করে বলেন, যারা আমার মেয়ের সরলতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘ এক যুগ গৃহবন্দি রেখে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে দেয়নি, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হোক। যেন আর কোনো মায়ের সন্তানের সাথে এমন না করে।
এ বিষয়ে মহসিন আলীর কাছে মোবাইলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১১ সালে আমার স্ত্রী গর্ভবতী থাকার কারণে ঘরের কাজের সহযোগিতার জন্য রেখাকে গ্রাম থেকে এনেছিলাম। সে কাউকে কিছু না বলে বছরখানেক পর বাড়ি থেকে চলে যায়। এ সময় তিনি রেখার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগও তোলেন এবং কলাবাগান থানায় একটি জিডিও করেন। এ ঘটনায় রেখার পরিবার আমাদের নামে অপহরণ মামলাও করেছিল। আদালত আমাদের খালাস দিয়েছেন। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে তৎকালীন চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে তার পরিবারের সাথে আমরা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে সমাধানও করেছি।
তবে রেখা চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বলেন, শুধু মহসিন আলীর নির্যাতনের কারণে তিনি ঘর ছেড়েছিলেন।
এ ঘটনায় তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির ঠাকুরগাঁওয়ের সদস্য সচিব ও সমাজকর্মী মাহাবুব আলম রুবেল বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর শুনছি। আসলে আমাদের দেশে গৃহকর্মী সুরক্ষা আইন করা জরুরি। অন্যান্য পেশাজীবীর একটা পরিচয়পত্র আছে। অথচ গৃহকর্মীরাও যে চাকরি করে, তার কোনো পরিচয়পত্র নেই। আমার কাছে মনে হয় এমন অসাবধানতার কারণে এসব ঘটনা ঘটছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেলায়াত হোসেন বলেন, পরিবারটি যদি আইনগত সহায়তা চায়, তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা করা হবে এবং এর জন্য কোনো টাকা-পয়সা খরচ করতে হবে না।