চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৪ ২২:৪৯ পিএম
মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে লেখা বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরু বাঙালির ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও উল্লিখিত বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নামে রীতিমতো গালগপ্পো লেখা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মুক্তিযোদ্ধারা।
এমনকি চট্টগ্রাম শহরে সিরু বাঙালি যে অসংখ্য অপারেশনের বর্ণনা দিয়েছেন তার অন্তত একটি ঘটনাকে সত্য বলে প্রমাণ করতে তাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, এটা যদি তিনি পারেন তাহলে বইটির বাকি সব লেখা সত্য হিসেবে মেনে নেব।
বুধবার (২৬ জুন) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গ্রুপ কমান্ডার ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান। আরও উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ফেরদাউছ ইসলাম খান, এএইচএম নাছির উদ্দিন চৌধুরী, ইদ্রিচ আলী, দেওয়ান মাকসুদ আহমেদসহ অনেকে।
ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘উনি (সিরু বাঙালি) যদি গল্প-উপন্যাস লিখেন, সেটা নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করবেন, তা মেনে নেওয়া যাবে না। আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের দায় আছে।’
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বলাকা প্রকাশনীর প্রকাশক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক জামাল উদ্দিন। বইটিতে ইতিহাস বিকৃতির বর্ণনা তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইয়ের ২৬৬ পৃষ্ঠায় লেখক লিখেছেন তার নেতৃত্বাধীন ১৫১নং গ্রুপে প্রশিক্ষণ নেওয়া ১২ জনসহ মোট ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এই ১৩ জনের মধ্যে উনাইনপুরার বাসিন্দা মনোজ বড়ুয়ার নাম আছে। অন্য জায়গায় তিনি লিখেছেন, মানু তার গ্রুপ ছেড়ে আহমদ নবীর গ্রুপে চলে গিয়েছিল। পরে তিনিই আবার লিখেছেন, মানু তার গ্রুপে যুক্ত হয়ে যুদ্ধ করেছেন। বাস্তবতা হলো গ্রুপটি আহমদ নবীর। তার নয়। মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে মনোজ বড়ুয়া প্রকাশ মানু যে আবেদন করেছেন, সেখানে তিনি লিখেছেন, ১৫১নং গ্রুপের অধীনে যুদ্ধ করেছিলেন, আর তার কমান্ডার ছিলেন আহমদ নবী চৌধুরী। তিনি ছিলেন গৌরাঙ্গ প্রসাদের অবর্তমানে ওই গ্রুপের কমান্ডার। আবার গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্রকে ১৫১নং গ্রুপ কমান্ডার বা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সিরু বাঙালি স্বীকার করেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭১ সালের এপ্রিলে কালুরঘাটে হওয়া যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়ে সিরু বাঙালি তার বইয়ের ১৬৮ ও ১৬১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন তার কাছে রক্ষিত চারটি ৩৬-ই হ্যান্ড গ্রেনেড ও সেভেন পয়েন্ট সিক্সটিটু মিমি ২০০ রাউন্ড গুলি নিযে হামিদচরের ভেতর দিয়ে কর্ণফুলীর তীর বেয়ে গ্রামে পালিয়ে যান। কিন্তু ওই চারটি গ্রেনেড ও গুলি কার কাছ থেকে, কীভাবে পেলেন তা বইয়ে উল্লেখ করেননি লেখক। চট্টগ্রাম শহরের প্রায় বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা ‘সদ্য বিদ্রোহ করে বসা ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর বাহিনীর সঙ্গেই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর যুদ্ধটি হয়েছিল। তখনকার প্রেক্ষাপটে কালুরঘাট যুদ্ধে সিরু বাঙালির গ্রেনেড পাওয়া দূরে থাক, সেখানে তার যুক্ত হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। কারণ যুদ্ধটি ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনীর মধ্যকার।’
জামাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘সিরু বাঙালি তার গ্রন্থের ৭৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন চট্টগ্রামে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বলতে কিছু নাই। বিশেষ কাউকে চিনতেনও না। চট্টগ্রাম সম্পর্কে যার কোনো ধারণাই নাই; তিনি কীভাবে চট্টগ্রাম শহরে একের পর এক কথিত অপারেশন করেছেন?’
এমন কল্পকাহিনী লজ্জিত করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সিরু বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, গবেষকÑ যে নামেই তিনি পরিচিত হোন না কেন, তিনি যে মিথ্যাচার করছেন তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।’
এ বিষয়ে সিরু বাঙালি বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ দেওয়ার তারা কে? চ্যালেঞ্জের জবাব যদি দিতেই হয়, তা আমি আদালতে দেব। এখানে মূলত একটা চক্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদেরের কাছ থেকে টাকা খেয়ে এসব করছে। এর সঙ্গে মাহফুজ ভাই জড়িত নেই। তিনি সৎ মানুষ। জামাল উদ্দিনসহ কয়েকজন তাকে ব্যবহার করছে। উনার বয়স হয়েছে, কেউ কিছু বললেই দাঁড়িয়ে যান। সাকার বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই তাদের উদ্দেশ্য।’