এম পলাশ শরীফ, মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট)
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৪ ১৬:৩১ পিএম
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৪ ২২:৫৩ পিএম
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের জলোচ্ছ্বাসে পানিবন্দি মানুষ। ঘূর্ণিঝড় রেমালের পরে পঞ্চকরণ ইউনিয়ন থেকে তোলা। ছবি : পলাশ শরীফ
পানগুছি নদীর তীরবর্তী বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার মানুষ, গবাদি পশু ও কৃষি জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। লবণাক্ততার কারণে ধান উৎপাদন বন্ধ রয়েছে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে। উৎপাদন কমেছে সকল মৌসুমি শাক-সবজির।
মোরেলগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ও পৌরসভাসহ নদীর তীরবর্তী সাতটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার বসতবাড়ি, গাছপালা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বহু জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট বিলীন হয়েছে পানগুছির ভাঙনে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীভাঙন ও লবণ পানির প্রভাবে মোরেলগঞ্জ উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে ভোগান্তির শিকার দেড় লাখ গবাদি পশু ও আড়াই লাখ হাঁস-মুরগি। লবণাক্ততার কারণে প্রাকৃতিক খাবার কমে গেছে এসব প্রাণীর। জলাবদ্ধতার কারণে গৃহপালিত পশুপাখি রোগ-বালাই ও অকাল মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। দেশীয় জাতের গরু, মহিষ, হাঁস-মুরগির সংখ্যা কমছে আশঙ্কাজনক হারে।
মাঠ ও খালবিল থেকে আত্মঘাতী ড্রিল ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন, নিয়ন্ত্রণহীন ইটভাটা, করাতকল, খাল ভরাট ও দখল করে মাছের ঘের করে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ায় ভয়াবহ ক্ষতির মুখোমুখি এ উপজেলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। এ উপজেলার বিভিন্ন খালের পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য সাতটি স্লুইসগেট রয়েছে। তবে এর একটিও সচল নেই। এ উপজেলায় আবাদি জমি রয়েছে ৩৩ হাজার ১৫০ হেক্টর। তবে লবণাক্ততার কারণে মোরেলগঞ্জ সদর, বহরবুনিয়া, বারইখালী ও জিউধরা ইউনিয়নে ফসল উৎপাদন কমে এসেছে। স্থায়ী বেড়িবাঁধ হলে কমপক্ষে এক হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে ধান আবাদ বৃদ্ধি পাবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল জাবির বলেন, উপকূলীয় এ উপজেলায় দুর্যোগ সহনীয় ৮৩টি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। এর সংখ্যা আরও বৃদ্ধির জন্য অধিদপ্তরে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে সরকারিভাবে পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম তারেক সুলতান বলেন, একশ বছরের পুরোনো খালগুলো ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে তালিকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ভরাট ও বেদখল থাকা খালগুলো অবমুক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। সুপেয় পানির উৎস্য, খাস পুকুরগুলো পুনঃখননের কাজ চলছে। এ বিষয়ে জেলা পরিষদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ও বিএডিসিসহ চারটি দপ্তরই মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে।
বারইখালী ইউপির সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান বিপু বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালে মিষ্টি পানির পুকুর ডুবে গেছে। পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে খাওয়ার পানি এনে খেতে হচ্ছে। স্থানীয়রা শরীফবাড়ির পুকুরের পানি ব্যবহার করত। সেটিতেও লবণ পানি ঢুকে খাবার অনুপযোগী হয়েছে। বর্তমানে সেচ দেওয়া হয়েছে। গ্রামের প্রায় এক হাজার মানুষ খাবার পানির জন্য হাহাকার করছে।
নিশানবাড়িয়ার ইউপি সদস্য আব্দুর রহিম মৃধা বলেন, আমাদের গ্রামে সুপেয় পানি পাওয়া এখন দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েকটি মিষ্টি পানির পুকুরের পানি ময়লা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ভাসছে বিভিন্ন প্রাণীর মরদেহ। পানি কিনে খেতে হচ্ছে।
ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্ফান, বুলবুল ও সর্বশেষ রেমালে মোরেলগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। অনাবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা দিনদিন বাড়ছে। ফলে ফসলহানি, সুপেয় পানির সংকট ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। নদীভাঙনে বদলে যাচ্ছে উপজেলার মানচিত্র। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে স্বাস্থ্যসেবাও রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। নদীভাঙনের ফলে কর্মসংস্থানের তাগিদে শহরমুখী হয়েছে কয়েক হাজার পরিবার।
বেসরকারি সংস্থা ডরপের ইভল্ভ প্রকল্প ২০২২ সাল থেকে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে কাজ করছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও হেলভেটাসের অর্থায়নে এই প্রকল্প চলছে। ইভল্ভ প্রকল্পের সমন্বয়কারী প্রতিভা বিকাশ সরকার জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে এখনই ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নীতিমালা অনুযায়ী চাহিদাভিত্তিক ও খাত বিভাজন করে অর্থ বরাদ্দ, যথাযথ বাস্তবায়ন ও শক্ত মনিটরিং প্রয়োজন। এ বিষয়ে সচেতনতার জন্য ইভল্ভ প্রকল্প উপজেলার মোরেলগঞ্জ সদর, খাউলিয়া, নিশানবাড়িয়া, বারইখালী, জিউধরা ও বহরবুনিয়া ইউনিয়নে কাজ করছে। পাশাপাশি সুশীল সমাজ দল ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে জেন্ডার-বান্ধব ও জলবায়ু সংবেদনশীল খাত বিভাজন করে বাজেট বরাদ্দ রাখার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম যেমনÑ ওয়ার্ড সভা, ইউনিয়ন উন্মুক্ত বাজেট সভা, গণশুনানি, কর ও সেবা মেলা, পরামর্শ সভা, মিডিয়ার সঙ্গে নাগরিক সংলাপ ইত্যাদি করছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সুপেয় পানি ব্যবহারে ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন না করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পানির ট্যাংক বিতরণ করা হচ্ছে। এই উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামে নিরাপদ পানি ব্যবহারের জন্য সরকারি বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি করে জলাধার স্থাপন করতে পারলে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে উপকূলের বাসিন্দারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে হলে এলাকাভিত্তিক বন্যা, খরা ও লবণসহিষ্ণু জাত ব্যবহার করতে হবে। পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো পুনঃখনন, পর্যাপ্ত স্লুইসগেট নির্মাণ, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, রবিশস্যের ফসলের জন্য ক্ষুদ্র পুকুর খনন, বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এ ছাড়া নালা পদ্ধতিতে উঁচু জমিতে চাষাবাদ বৃদ্ধি করতে হবে।
এসব বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম তারেক সুলতান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে ইতোমধ্যে উপজেলার চারটি ইউনিয়নে লজিক প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ কাজ করছে। ঘষিয়াখালী থেকে মোরেলগঞ্জ শহর হয়ে সন্ন্যাসী পর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প একনেকে পাস হয়েছে। বেড়িবাঁধ হলে লবণাক্ততা দূর হবে এবং ফসল উৎপাদন বাড়বে। এতে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসবে। আর বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে কাবিটা প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারের ২৫ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৩ সালে উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের রাস্তার দুই পাশে ১৫ হাজার তালের চারা রোপণ করা হয়েছে।