মিয়ানমারে সংঘাত
কক্সবাজার অফিস
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৪ ১১:৩৬ এএম
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৪ ১৩:১৭ পিএম
নাফ নদের ওপারে চলমান সংঘাতের জেরে এ পারের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ফাইল ফটো
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাতের জেরে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তবর্তী নাফ নদের ওপারে মংডু শহরে তুমুল লড়াই চলছে। রাতভর বিস্ফোরণের বিকট শব্দ সীমান্তের এপারে ভেসে এসেছে। এতে এপারের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (২৫ জুন) বিকালে শুরু হওয়া এ লড়াই চলছে বুধবার (২৬ জুন) বেলা ১১টা পর্যন্ত।
টেকনাফ সীমান্ত এলাকার মানুষ জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৪টার পর থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত মিয়ানমারের কাউয়ারবিল এবং পেরাংপুরু এলাকায় একের পর এক মর্টার শেল, ব্রাশফায়ার, রকেট লঞ্চার হামলা হয়েছে। এক ঘণ্টা বিরতির পর আবার বুধবার ভোর ৪টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চলছে এ লড়াই। এ রকম বিকট শব্দ আর কখনও শোনেনি তারা। সারা রাত কেউ ঘুমাতে পারেনি। ওপারে মুহুর্মুহু গুলি, বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে বাড়িঘর।
সাবরাং ইউপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ শরিফ বলেন, মঙ্গলবার বিকালের পর থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। রাতভর বিস্ফোরণ এর আগে এমন তীব্র ছিল না। সীমান্ত এলাকার মানুষ পুরো রাত ঘুমহীন ছিল।
শাহপরীর দ্বীপের বাজারপাড়ার ব্যবসায়ী নুরুল আমিন জানান, মিয়ানমারে সংঘাতের পর এমন প্রচণ্ড বিকট শব্দ আর শোনা যায়নি। সীমান্তের ওপারে সকালের পর যুদ্ধবিমানেরও দেখা মিলেছে। ঘুমহীন রাত অতিবাহিত হওয়ার পর সীমান্তের মানুষ আতঙ্কে রয়েছে।
সীমান্ত এলাকার লোকজন জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাতের জেরে নাফ নদের ওপারে মংডু শহরের নিকটবর্তী খায়েনখালী খালের পাশে রোহিঙ্গাবোঝাই নৌকা রয়েছে। তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সীমান্ত এলাকার লোকজন।
টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এবং সাবরাংয়ের পূর্বে নাফ নদের ওপারে মংডু শহর। ওই মংডু শহরের নাফ নদ দিয়ে প্রবেশপথ খায়েনখালী খালটি। ওই খালের মোহনায় মঙ্গলবার বিকালের পর থেকে রোহিঙ্গাবোঝাই কয়েকটি নৌকা দেখা গেছে। ওই সীমান্ত এলাকায় বিকালের পর থেকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী বিদ্রোহী আরাকান আর্মির দখলে থাকা এলাকা উদ্ধারের জন্য এমন গোলাগুলি বলে সীমান্ত এলাকার লোকজন মনে করছে।
তারা জানায়, নৌকায় অপেক্ষমাণ রোহিঙ্গারা মংডু শহরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়েছে। এদের বাংলাদেশে অনুপ্রেবশের চেষ্টার আশঙ্কা করছেন তারা।
টেকনাফ উপজেলার সীমান্ত এলাকার লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য বলছে, গত ১৮ জুন মঙ্গলবার সকালে মিয়ানমারের ওপার থেকে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ ভেসে আসতে শুরু করে; যা শনিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত থেমে থেমে অব্যাহত ছিল। এর আগে ১৫ জুন শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ছয়টি ও রাত সাড়ে ১২টার দিকে থেমে থেমে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল। ১৬ জুন রবিবার ও ১৭ জুন সোমবার (ঈদের দিন) আর কোনো শব্দ শোনা যায়নি। ঈদের পরদিন ১৮ জুন মঙ্গলবার থেকে আবারও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে থেমে। সর্বশেষ শুক্রবার থেকে মাঝরাতে মর্টার শেল ও শক্তিশালী গ্রেনেড বোমার বিস্ফোরণে ঘুম ভাঙল টেকনাফ সীমান্তে বাসিন্দাদের। শুক্রবার রাত দেড়টার পর থেকে মিয়ানমার সীমান্তের ওপার থেকে বিকট শব্দ ভেসে আসে। মাঝরাত থেকে শনিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত থেমে থেমে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শনিবারের পর থেকে বিস্ফোরণের শব্দ বন্ধ ছিল। মঙ্গলবার থেকে ফের শোনা যাচ্ছে।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর হোসেন বলেন, দুই দিন বন্ধ থাকার পর আবারও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। নাফ নদের ওপারে নৌকায় রোহিঙ্গাদেরও দেখা গেছে। অনুপ্রেবশ ঠেকাকে সীমান্ত এলাকার লোকজনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, মংডু শহরের খায়েনখালী খালটি নাফ নদের মোহনা। ওপারে মর্টার শেল, গ্রেনেড বোমার বিস্ফোরণের শব্দের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের অবস্থান শোনা যাচ্ছে। তবে নাফ নদ অতিক্রম করে মিয়ানমারের লোকজনের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় আছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ড। গোয়েন্দা নজরদারি, টহলও বাড়ানো হয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণ সংঘাতে আবারও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশ সীমান্তে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।