রাসেলস ভাইপার
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৪ ২২:৪৪ পিএম
আপডেট : ২৪ জুন ২০২৪ ২৩:০২ পিএম
রাসেলস ভাইপার, বাংলায় চন্দ্রবোড়া। মানুষের মুখে মুখে রাসেলস ভাইপার নামে পরিচিত এই সাপ দেশে এখন এক আতঙ্ক। সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা গুজবও। সাপের ছবিসহ ভয়ংকর ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও। সাপের কামড়ে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বাচ্চাসহ প্রত্যন্ত এলাকায় রাসেলস ভাইপার সাপ উদ্ধার হওয়ায় মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। আতঙ্কের কারণে যেকোনো সাপ দেখলেই মেরে ফেলছে লোকজন। সাপে কাটলে ওঝার কাছে না গিয়ে সরাসরি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ ছাড়া আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আমাদের প্রতিবেদকদের পাঠানো খবর…
কুষ্টিয়ায় সাপের কামড়ে মৃত্যু
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় সাপের কামড়ে আরজিনা নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (২৪ জুন) সকালে ধরমপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর বানুতলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আরজিনা খাতুন ওই গ্রামের সিদ্দিক মণ্ডলের স্ত্রী। বিষয়টি নিশ্চিত করেন ভেড়ামারা থানার ওসি জহুরুল ইসলাম।
স্থানীয়রা জানায়, আরজিনা খাতুন টয়লেটে যাওয়ার সময় সাপে কামড় দেয়। ঘটনার প্রায় আধা ঘণ্টা পর যন্ত্রণা শুরু হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে ওই বাড়িতে স্থানীয় একজন ওঝা (সাপুড়ে) এসে একটি গোখরা সাপ উদ্ধার করে।
দিনাজপুরে সাপের কামড়ে নারীর মৃত্যু
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় সাপের কামড়ে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দুপুরে উপজেলার শীবতলী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। মৃত ভাদুরী বেওয়া ওই গ্রামের মৃত জিতেন চন্দ্র রায়ের স্ত্রী।
স্থানীয়রা জানায়, দুপুর ১২টার দিকে ডেইর গ্রামের ফাঁকা মাঠে ছাগলকে ঘাস খাওয়াতে যান ভাদুরী বেওয়া। এ সময় তাকে সাপে দংশন করলে বিষ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ফাইয়াজ ইজতিহাদ জানান, দুপুর দেড়টার দিকে ওই নারীকে হাসপাতালে আনা হয়। তবে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। পায়ে দাগ দেখে বোঝা গেছে তাকে বিষধর সাপে দংশন করেছে।
ঘটনা জানতে পেরে (ইউএনও) ডালিম সরকার ভাদুরী বেওয়ার বাড়িতে যান। খোঁজখবর নিয়ে তার পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করেন।
ভাইবোনকে সাপের দংশন
রাজবাড়ী পদ্মার তীরবর্তী চরে একাধিক রাসেলস ভাইপার সাপ মেরেছে কৃষক ও স্থানীয়রা। পাংশায় এ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে মধু বিশ্বাস নামে এক কৃষক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত রবিবার রাতে দুই ভাইবোনকে সাপে কামড়ানোর খবর পাওয়া গেছে। তাদের পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। তারা হলো উপজেলা সুবর্ণখোলা গ্রামের উজির মণ্ডলের ছেলে রিফাত ও মেয়ে জান্নাতি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শারমিন আহমেদ তিথী বলেন, ‘রাতে দুই ভাইবোনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিষধর হোক বা না হোক, সাপের কামড়ের চিকিৎসার জন্য ওঝা নয়, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে।’
পটুয়াখালীতে কৃষকের জালে রাসেলস ভাইপার
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নূর হাওলাদার নামে এক কৃষকের জালে পাঁচ ফুট দৈর্ঘ্যের রাসেলস ভাইপার সাপ ধরা পড়েছে। সোমবার বেলা ১১টায় উপজেলার ধুলাসার ইউনিয়নের বৌলতলী গ্রামের নূর হাওলাদারের বাড়ির পুকুরের জালে সাপটি আটকে যায়।
পরে ওই কৃষক সাপটি লাঠি দিয়ে আঘাত করে আহত অবস্থায় প্লাস্টিকের বড় কৌটায় সংরক্ষণ করেন। এ সময় সাপটিকে একনজর দেখতে ভিড় জমায় ওই এলাকার উৎসুক জনতা। সাপটি উদ্ধারের চেষ্টা করে অ্যানিমেল লাভারস অব পটুয়াখালীর কলাপাড়া টিমের সদস্যরা। টিমের সদস্য বায়জিদ মুন্সী জানান, সাপটি উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বন বিভাগকে হস্তান্তর করা হবে।
নূর হাওলাদার জানান, সাপটি জালে আটকা পড়লে আমার স্ত্রী দেখে। পরে লাঠি দিয়ে আঘাত করে প্লাস্টিকের কৌটায় সংরক্ষণ করেছি।
হাতিয়ায় মাছঘাটে রাসেলস ভাইপার
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার একটি মাছঘাটে রাসেলস ভাইপারের দেখা মিলেছে। আক্রমণ করতে আসলে তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষায় সাপটি মেরে ফেলে স্থানীয়রা। গত রবিবার রাত ২টায় উপজেলার তমরদ্দি ইউনিয়নের তমরদ্দি ঘাটে এ ঘটনা ঘটে।
মাছঘাটের দায়িত্বে থাকা আলাউদ্দিন ও মেহেরাজ বলেন, রাত দেড়টার দিকে একজন নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে বাজারে যাচ্ছিল। তখন রাসেলস ভাইপার সাপটি আক্রমণ করার জন্য এলে চিৎকার করে। পরে স্থানীয়রা পিটিয়ে সাপটি মেরে ফেলে।
অজগর পিটিয়ে মারল স্থানীয়রা
সীমান্তবর্তী নেত্রকোণার দুর্গাপুরে রাসেলস ভাইপার সাপ মনে করে একটি অজগরের বাচ্চা পিটিয়ে মেরেছে স্থানীয়রা। গত রবিবার রাতে উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ফারংপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানায়, ফারংপাড়া গ্রামের রাস্তায় একটি মোটরসাইকেলের চাকার নিচে পড়ে একটি সাপ। পরে এলাকাবাসী রাসেলস ভাইপার ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পিটিয়ে মারে। পরে এটি অজগরের বাচ্চা বলে চিহ্নিত করে।
গত ১৯ জুন উপজেলার ফেচিয়া উত্তরপাড়া গ্রামে মাছ ধরার জালে একটি অজগর সাপ ধরা পড়ে। পরে স্থানীয়রা সেটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। এর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাসেলস ভাইপার বলে ভাইরাল করে। এতে অনেকের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
লালমনিরহাটে সচেতন হওয়ার পরামর্শ
লালমনিরহাটে যেকোনো সাপ দেখলেই রাসেল ভাইপারস (চন্দ্রবোড়া) ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে স্থানীয় লোকজন। কেউ কেউ মেরেও ফেলছে বাস্তুতন্ত্র তথা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী এসব প্রাণী। ভারতীয় সীমান্তবর্তী হওয়ায় জেলাজুড়ে রাসেলস ভাইপার সাপের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন ও সাবধান হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত রবিবার সন্ধ্যায় পাটগ্রামের সেটেলমেন্ট মসজিদের পাশে থেকে একটি সাপ রাসেলস ভাইপার ভেবে পিটিয়ে মেরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসায় নিয়ে যায় স্থানীয়রা। পরে ইউএনও নুরুল ইসলাম স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হন সেটি রাসেলস ভাইপার সাপ নয়।
সোমবার দুপুরে কালীগঞ্জ উপজেলায় রাসেলস ভাইপার ভেবে একটি নোনাডোরা সাপকে পিটিয়ে মারে স্থানীয় জেলেরা। উপজেলার ভোটমারী ইউনিয়নের শৌলমারী চরাঞ্চলে এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। জেলার কোথাও রাসেলস ভাইপারের খোঁজ পাইনি। তবে আতঙ্কিত হয়ে অনেকে অন্য সাপ মারছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
গোপালগঞ্জে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান
রাসেলস ভাইপারসহ যেকোনো সাপ নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে গোপালগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগ। সিভিল সার্জন মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আতঙ্কিত হবেন না। রাসেলস ভাইপারসহ বিষধর সাপের ওষুধ হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত মজুদ আছে। সাপে কাটলে ওঝার কাছে না গিয়ে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে আসবেন।’ সোমবার দুপুরে সিভিল কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সচেতনতামূলক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের উপপরিচালক জিবিতোষ বিশ্বাস, শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আব্দুল লতিফ, সহকারী রেজিস্ট্রার নাঈমুল ইসলাম মুনহাজ, সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার দীবাকর বিশ্বাসসহ পাঁচ উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, নার্স ও স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।