রেজাউল করিম, গাজীপুর
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৪ ১২:১০ পিএম
সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবে ময়লার স্তূপ আর কচুরিপানায় অস্তিত্ব সংকটে গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল রাজদীঘি। প্রবা ফটো
অবিভক্ত ভারতবর্ষের বাংলা প্রদেশের ভাওয়াল রাজ্য, যার বৃহৎ অংশই বর্তমানে গাজীপুর জেলা। গাজীপুর জেলার প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভাওয়াল রাজবাড়ি। রাজবাড়ির মূল ফটক ধরে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে সুন্দর একটি ভবন, যা বর্তমানে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। এ রাজবাড়ির পশ্চিম পাশেই রয়েছে বিশাল একটি দীঘি, যাকে রাজদীঘি বলা হয়। একসময় দীঘিটি নিয়ে গাজীপুরবাসীর গর্ব হলেও কালক্রমে এটি এখন ময়লার স্তূপ আর কচুরিপানায় অস্তিত্ব সংকটে। তবে সরকারিভাবে প্রশাসন তদারকি করলে রাজদীঘি হতে পারে গাজীপুরের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।
গাজীপুর জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে কালের সাক্ষী হয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন নিদর্শন ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ি। প্রায় ৫ একর জায়গার ওপর নির্মিত রাজবাড়িটি আয়তন এবং কক্ষের হিসাবে একটি বিশাল রাজবাড়ি। এ রাজবাড়ির পশ্চিম পাশে রয়েছে রাজদীঘি। ১৮৩৫ সালে সন্ন্যাসী রাজা রামেন্দ্র নারায়ণের পিতামহ জমিদার কালি নারায়ণ রায় চৌধুরী এটি খনন করেন। ঐতিহ্যবাহী দীঘিটি নিয়ে গাজীপুরবাসী একসময় গর্ব করলেও বর্তমানে এটি অযত্ন, অবহেলায় অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। পথচারী ও ভ্রাম্যমাণ শ্রমিক-মজুরদের যত্রতত্র মূত্রত্যাগ থেকে শুরু করে নগরীর বিভিন্ন স্থানের ময়লা-আবর্জনা ফেলায় ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে দীঘিটি। দীঘির চারপাশ আগাছায় ভরে গেছে, কচুরিপানায়ও ঢেকে গেছে। দূষণে কালো বর্ণ ধারণ করেছে দীঘির পানি। অথচ একসময় দীঘির স্বচ্ছ পানিতে স্থানীয়রা গোসল করত।
তবে একসময় ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী এই দীঘি ঘিরে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল স্থানীয়রা। বিশেষ করে দীঘির পাশের কবি গোবিন্দ দাস রাস্তাটি যখন ১০-১২ ফুট হতে ৩০-৩৫ ফুট করা হয়। ফলে ২০২২ সালের শেষের দিকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক আনিছুর রহমান বেদখল বা অবহেলায় পড়ে থাকা পুকুরগুলো পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি রাজদীঘিকে কেন্দ্র করে ভাওয়াল রাজার ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ইত্যাদি তুলে ধরে ও সংস্কার করে আধুনিক নতুন একটি দর্শনীয় স্থান তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ৬ মাসের মধ্যে কাজ শুরুর কথা থাকলেও পরে তা আর আলোর মুখ দেখেনি।
স্থানীয়দের দাবি সরকারি ব্যবস্থাপনায় দীঘিটিকে দেখভাল করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলে বিনোদনের কেন্দ্র করা হোক। দীঘিটির চারপাশে হাঁটার রাস্তা নির্মাণ, সৌন্দর্যবর্ধন, দর্শনার্থীদের জন্য ঝুলন্ত ব্রিজ করা যেতে পারে। এতে শহরের বাসিন্দাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে আসা পর্যটকদের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র হতে পারে এই ভাওয়াল রাজদীঘি।
বিলাশপুর এলাকার বাসিন্দা সানোয়ার হোসেন বলেন, আগে আমরা এই রাজদীঘিতে গোসল করতাম। কী স্বচ্ছ পানি ছিল, অনেকে এই দীঘির পানি ব্যবহারও করত। এখন গোসল তো দূরের কথা পানি দিয়ে দুর্গন্ধ বের হয়। কচুরিপানা পরিষ্কার করে না, যে যার মতো দীঘির পানিতে ময়লা ফেলে যেন ভাগাড়ে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মনির হোসেন বলেন, প্রশাসন ইচ্ছা করলে বর্তমান সমস্যাগুলো সমাধান করে রাজদীঘিকে সংস্কার করে আধুনিক ও একটি দর্শনীয় স্থান তৈরির মাধ্যমে গাজীপুর সিটিকে সারা বাংলাদেশের মধ্যে তুলে ধরতে পারেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও গাজীপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক হাসান ইউসুফ খান বলেন, শহরের মধ্যে রাজদীঘিসহ বেশ কয়েকটি পুকুর অব্যবস্থাপনায় পড়ে রয়েছে। এটি যেহেতু ডিসি অফিসের পাশে এজন্য পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের এগিয়ে আসার পাশাপাশি সাধারণ মানুষদের সচেতনতাও দরকার। তবে দ্রুত একটি কার্যকরী পরিকল্পনায় সৌন্দর্যবর্ধন এখন সময়ের দাবি।
গাজীপুর জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, স্থানীয়দের সচেতনতায় দীঘির পাশে কয়েকবার নোটিস দেওয়া হয়েছে, সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়েছে। তবুও মানুষ ময়লা-আবর্জনা ফেলে। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কথা বলে একটি স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা চলছে। আশা করি, দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।