শফিক সরকার, ময়মনসিংহ
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৪ ১১:৩০ এএম
হোসেন আলী। প্রবা ফটো
’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানÑ শেষে ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধ; বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের প্রতিটি সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি নাম হোসেন আলী সরকার। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে হটিয়ে মুক্তি লাভের পর ’৭৫-এর ট্র্যাজেডি কিংবা একের পর সামরিক শাসনে পর্যুদস্ত রাজনীতি, সমাজ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রব্যবস্থা– সবকিছুরই সাক্ষী এই হোসেন আলী। দেখেছেন স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। প্রতিষ্ঠালগ্নে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায় যে পাঁচজনকে নিয়ে দলের স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল, তাদেরই সারথি এই হোসেন আলী। সেই যে শুরু, এরপর কেটে গেছে কয়েক যুগ; শতবর্ষী এই আওয়ামী লীগ নেতা এখনও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উদ্বেলিত। বৃদ্ধ বয়সের দিনগুলো আশায় কাটে তারÑ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার প্রতিষ্ঠার।
পরিবার ও দলের স্থানীয় সূত্র জানায়, হোসেন আলী ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তিনি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন। হাঁটতে কষ্ট হয়। তবে দমে যাননি। দলের জন্য পুরোদমে সক্রিয়। শারীরিক অসুস্থতা ছাড়া বাদ পড়ে না কোনো কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ। লাঠির ভরে হাজির হন দলীয় কর্মসূচিতে।
প্রতিদিন সাইকেলে গ্রাম থেকে শহরে গিয়ে রাজনীতি
আওয়ামী লীগের প্লাটিনাম জয়ন্তী (৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী) উপলক্ষে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করেছেন ১০০ বছর ছুঁই ছুঁই হোসেন আলী। জানান, তারা যখন দলের কার্যক্রম শুরু করেন, তখনও তিনি গ্রামেই বসবাস করতেন। প্রতিদিন বিকাল হলেই বাইসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন দলের স্বার্থে। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে জড়ো হতেন মুক্তাগাছা শহরের চৌরঙ্গিমোড় এলাকায়। সেখানে একটি চায়ের দোকানেই চলত তাদের রাজনৈতিক আলাপচারিতা-পরিকল্পনা।
হোসেন আলী বলেন, দেশ স্বাধীনের আগে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু মুক্তাগাছায় এসেছিলেন। তখন বঙ্গবন্ধুকে প্রথম কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। নেতার বজ্রকণ্ঠের ভাষণ শুনলে এখনও উদ্বেলিত হয়ে পড়ি। এদেশ-জাতি নিয়ে কত-শত স্বপ্ন বুনেছিলেন জাতির পিতা। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটের আঘাত শেষ করে দিয়েছে সবকিছুই। বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টাকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে অন্ধকার দিনের সূচনা হয়েছিল, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। যে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু বুনেছিলেন, তা আঁকড়ে ধরে দেশ পরিচালনা করছেন প্রধানমন্ত্রী। তার নেতৃত্বেই এক দিন জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা হবে।
দলের স্বার্থে অসীম অবদান
হোসেন আলীর হাত ধরে যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন বডগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহান আলী সরকার। বডগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়াম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহান আলী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় হোসেন আলীর বাড়িতে আমরা আশ্রিত ছিলাম। আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থাসহ নানা সহযোগিতা করেছেন তিনি। তার হাত ধরেই আমার রাজনীতিতে পদার্পণ। তার নেতৃত্বে আমাদের ইউনিয়নে শক্ত অবস্থান সৃষ্টি হয় আওয়ামী লীগের।
সাবেক সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও মুক্তাগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কেএম খালিদ বলেন, বৃহত্তর ময়মনসিংহে তার মতো বরেণ্য প্রবীণ রাজনীতিবিদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। বৃদ্ধ বয়সেও লাঠিতে ভর দিয়ে যেকোনো প্রোগ্রামে হাজির হন তিনি। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার অবদান ছিল অনেক। দলের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বঙ্গবন্ধুর আর্দশ বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। বন্ধবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খবরে শোকে মরণাপন্ন অবস্থা ছিল তার। তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্রচণ্ড ভালোবাসেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এহতেশামুল আলম বলেন, এই বরেণ্য আওয়ামী লীগ নেতা কখনও দলীয় পদের বাইরে যাননি। এই বৃদ্ধ বয়সেও তিনি দলের জন্য সক্রিয়। তাকে এবার জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য (মুক্তাগাছা-৫ আসন) নজরুল ইসলাম বলেন, হোসেন আলী সরকার মুক্তাগাছার প্রবীণ রাজনীতিবিদ। এখনও তিনি দলীয় কর্মসূচিতে লাঠির ওপর ভর দিয়ে উপস্থিত হন। দলের জন্য তার অবদান অতুলনীয়। তার মতো একজন নেতা পাওয়া বড় কঠিন।