প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৪ ১১:১৭ এএম
সাত দিন ধরে বন্যায় ডুবে আছে কুড়িগ্রামের উলিপুরের বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের দ্বীপ চর বালাডোবা গ্রাম। বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের চরম সংকটে গ্রামের শতাধিক পরিবার। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
দেশের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। পানি কমতে শুরু করেছে, তবে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বাসাবাড়ি ও রাস্তাঘাটের ক্ষতচিহ্ন ভেসে উঠছে। বিশেষ সংকট দেখা দিয়েছে গোখাদ্যের। এ ছাড়া জমে থাকা নোংরা পানি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে।
দুই দিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় ও উজানের পাহাড়ি ঢল থেমে যাওয়ায় সিলেটে বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি উন্নতির দিকে রয়েছে। গতকাল সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কোথাও বৃষ্টিপাতের খবর পাওয়া যায়নি। নদ-নদীর পানিও বাড়েনি। তবে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি চারটি পয়েন্টে এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া নগরীর ১৩টি ওয়ার্ড ও জেলার ৪ পৌরসভা এবং ১০৩ ইউনিয়নে ৯ লাখ ৬৪ হাজার ৪৬৫ জন এখনও বন্যা আক্রান্ত রয়েছেন বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।
এদিকে বন্যাকবলিত এলাকায় বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি, মৎস্য ও পশুর খামার তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বন্যার পানি তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল-কলেজে আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করায় চলমান ঈদের বন্ধের পর পাঠদান শুরু নিয়ে সংশ্লিষ্টরা চিন্তায় রয়েছেন। বিভিন্ন উপজেলায় বাড়িঘর রাস্তাঘাটের পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে পানি প্রবেশ করেছে। এতে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবাও বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে। জেলা প্রশাসনের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বন্যাকবলিত মানুষের পাশাপাশি উপদ্রুত এলাকার মানুষ তাদের গবাদিপশুও নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। গতকাল সকালে নগরীর যতরপুর, সোবহানীঘাট, শাহজালাল উপশহর, মীরাবাজার, তোপখানা, মেন্দিবাগ, জামতলা, টুকেরবাজারসহ আশপাশের এলাকায় বাসাবাড়ি ও রাস্তা থেকে পানি অনেকটা কমেছে। সরজমিনে পরিদর্শনকালে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পানি কমেছে। তবে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের জাঙ্গাইল গ্রামের বাসিন্দা জাবেদ হোসেন বলেন, বাড়ির ভেতরের পানি কমলেও গ্রামের চারদিকে শুধু পানি আর পানি। রাস্তাঘাট পানির নিচে রয়েছে। একমাত্র নৌকা দিয়ে চলাচল করে গ্রামবাসী। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। খাদ্যের অভাবে গবাদিপশু দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া এই এলাকার মানুষ আর্থিকভাবে অনেকটা দুর্বল। এ অবস্থায় বারবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনেকেই নানামুখী সমস্যায় রয়েছেন।
কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের দ্বীপ চর বালাডোবা গ্রাম। এ গ্রামে শতাধিক পরিবারের বসবাস। সাত দিন ধরে বন্যায় ডুবে আছে চরটি। ঘরবাড়ি গবাদিপশু নিয়ে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। নিম্নাঞ্চল হওয়ায় গত সাত দিন ধরে পানির মধ্যে বসবাস করছে এ এলাকার মানুষজন। বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের চরম সংকটে এসব পরিবার। এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে চর বালাডোবার মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি কেউÑ এমন অভিযোগ করছে চরবাসী।
বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ৪ কিমি দূরে চরবালা ডোবার অবস্থান। চারপাশে ব্রহ্মপুত্র নদ বেষ্টিত এই চরটিতে নৌকা ছাড়া যাওয়ার উপায় নেই। পানিতে ভাসা এই চরটির মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সাত দিন ধরে পানির মধ্যে বসবাস করছে তারা। অনেকেই ঘরবাড়ি তালা দিয়ে লোকালয়ের বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র, স্কুল ও স্বজনদের বাড়িতে ঠাঁই নিয়েছে। যারা বাড়িতেই আছে তাদের কষ্টের সীমা নেই। ঘরে-বাইরে পানি থাকায় খাটের মধ্যে একদিকে চুলা আর একদিকে কোনোরকম থাকার ব্যবস্থা করে দিন কাটাচ্ছে তারা। এ ছাড়া গবাদিপশু নিয়ে পড়েছে চরম বিপাকে। নেই উঁচু জায়গা, বন্যার আগে কোনো রকম ছোট ভিটা উঁচু করে সেখানে গরু-ছাগল নিয়ে দিন কাটছে তাদের। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে চর বালাডোবা গ্রামের শতাধিক পরিবারের মাঝে। এমন দুর্ভোগে দেখার কেউ না থাকায় সরকারি বেসরকারি সহযোগিতা আশা করছে তারা।
কথা হয় চর বালাডোবা গ্রামের জিন্নাত আলী-রঙমালা দম্পতির সঙ্গে। জিন্নাত আলী বলেন, ‘হামরা গত সাত দিন ধরে ঘরে পানি। খাওয়ার কষ্ট, একবেলা রান্না করে দুবেলা খাওয়া ছাড়া উপায় নাই। কোথাও যাওয়ার উপায় নাই। গরু বাচুর নিয়ে খুব বিপদে আছি।’
বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাবলু মিয়া বলেন, চর বালাডোবা গ্রামের চারদিকে পানি। ওখানকার পরিবারগুলো খুব কষ্টে আছে। আমরা নদীভাঙন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা উপজেলা প্রশাসনের নিকট জমা দিয়েছি। আশা করছি দ্রুত চর বালাডোবা গ্রামের মানুষজন সহযোগিতা পাবে।
লালমনিরহাট
তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চল ও লোকালয় থেকে এখনও পুরোপুরি সরে যায়নি পানি, এর ফলে বন্যার্তরা রয়েছেন চরম দুশ্চিন্তায় ও ভোগান্তিতে। লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার প্রায় ১ হাজার পরিবার এখনও পানিবন্দি রয়েছেন। এরা প্রত্যেকেই নদী তীরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা। বন্যায় ভেঙে গেছে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট, নষ্ট হয়েছে ফসলি জমি। পানি কমতে শুরু করলেও এখনও তলিয়ে আছে রাস্তাঘাট। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার ও পানির সংকট। পাশাপাশি পশুখাদ্যেরও চরম সংকট অব্যাহত আছে।
বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিস্তার পানি বাড়ায় লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার পাটগ্রামের দহগ্রাম, হাতীবান্ধার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান ইউনিয়নের নিজ শেখ সুন্দর, সিঙ্গামারি ইউনিয়নের ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, শৈইলমারী, নোহালী, চর বৈরাতি, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, পলাশী ও সদর উপজেলার মোগোলহাট ফলিমারীর চর, খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকুণ্ডা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়।
ঘরবাড়িতে পানি ঢোকায় কয়েক দিন ধরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে বিভিন্ন চরাঞ্চলের মানুষ। এসব অঞ্চলের শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়া চলাচল কষ্টকর হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। বয়স্ক ও শিশুরা রয়েছে অনেক কষ্টে।
এদিকে বন্যার্তদের মধ্যে কিছু শুকনো খাবার বিতরণ করলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন বানভাসি লোকেরা।
মোগলহাট ইউনিয়নের চর ফলিমারির কৃষক মফিজুল ইসলাম বলেন, ধরলার পানি ঘরে ঢুকেছে তাই খুব কষ্টের মধ্যে পড়েছি। রান্নাবান্না করতে পারিনি। শুকনো খাবার খেয়ে আছি। পানিতে তলিয়ে গেছে টিউবওয়েল। ঘরে খাবার পানিও নেই। দুদিন ধরে খুব কষ্টে আছি, আমাদের এলাকায় একটি বন্যা আশ্রয়ণ কেন্দ্র (মুজিব কেল্লা) নির্মাণ হতে না হতেই নদী ভাঙতে শুরু করায় সেটির নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারিভাবে এখনও কিছু পাইনি, সীমান্ত এলাকা হওয়ায় তেমন কেউ খোঁজখবরও নিচ্ছে না।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়া গাছের বানভাসিরা বলেন, নদীর পানি ঘরবাড়িতে ঢোকায় ভোগান্তি বেড়েছে। ঘর থেকে বের হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সবকিছুই তলিয়ে গেছে।
তিস্তা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের বানভাসি লোকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, তিস্তা নদীর পানি হঠাৎ কমে ও বেড়ে যায়, তাই বন্যার সময় হলেই আমরা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাই। আমরা এরকম পরিস্থিতি থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি চাই।
নেত্রকোণা
নেত্রকোণায় গত ৪৮ ঘণ্টায় তেমন ভারী বৃষ্টি না হওয়ায় কমতে শুরু করেছে জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি। এতে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার উব্ধাখালী নদীর পানি কলমাকান্দা পয়েন্টে ২১ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল এবং সোমেশ্বরী, কংস, মগড়া ও ধনু নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে বইছে।
তবে নদ-নদীর পানি কমলেও কমছে না জেলার পাঁচটি উপজেলার অন্তত লক্ষাধিক পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ। বানভাসি লোকজন বিশুদ্ধ পানিসহ খাদ্যসংকটে ভুগছে। বিশেষ করে শিশু ও গবাদিপশু নিয়ে তারা চরম বেকায়দায় রয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার জেলার মোহনগঞ্জ ও গত শুক্রবার কলমাকান্দা উপজেলায় দুই শিশুর মৃত্যু হওয়ায় শিশুদের নিয়েও চরম দুশ্চিন্তায় সময় পার করছে পানিবন্দি পরিবারগুলো।
এ ছাড়া জেলার নিম্নাঞ্চলের অন্তত শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ রাস্তাঘাট বানের পানিতে প্লাবিত হওয়ায় যাতায়াত ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। এতে পানিবন্দি লোকজনের ঘর থেকে বের হওয়ার একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাড়ায় চালিত ডিঙি নৌকা। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় পানিবন্দি গ্রামগুলোর লোকজন প্রয়োজনের তাগিদে বাধ্য হয়েই তারা অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করে যাতায়াত করছে।
জেলায় পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি কলমাকান্দা উপজেলায়। এ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭টিই প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে এ উপজেলার অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছে সিলেট অফিস, কুড়িগ্রাম প্রতিবেদক, লালমনিরহাট প্রতিবেদক ও নেত্রকোণা প্রতিবেদক)