প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৪ ১২:১০ পিএম
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কাঞ্চন পৌরসভার নির্বাচন আগামী ২৬ জুন। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন ভোটাররা। তারা কী ঠিকমতো ভোট দিতে যেতে পারবেন, ভোট কী সুষ্ঠু হবে, ভোট দিতে গিয়ে আবারও হামলার শিকার হবেন কি না- এ রকম হাজারো প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মনে। ভোটারদের এসব আতঙ্কের মূলে রয়েছে বর্তমান মেয়র রফিকুল ইসলাম রফিকের ছোট ভাই রূপগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী শফিকুল ইসলাম শফি ও রফিকের আরেক সহযোগী আমিনুল হক খোকন। এই দুজনই কাঞ্চন এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, দস্যুতাসহ এক ডজনের বেশি মামলা রয়েছে। এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে অস্ত্র, টাকাপয়সা দিয়ে সহযোগিতা করে আসছে ক্যাসিনো জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত হত্যাসহ বহু অপকর্মের হোতা মেয়র রফিকের আরেক ভাই তারিকুল ইসলাম মোঘল।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মেয়র রফিক তার নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য তার ভাই শীর্ষ সন্ত্রাসী শফি ও সহযোগী আমিনুল হক খোকনের মাধ্যমে ঢাকার চারপাশের এলাকা থেকে একদল ভাড়াটে সন্ত্রাসী এনে কাঞ্চন এলাকায় আতঙ্ক তৈরি করেছেন। সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহড়া দিচ্ছে। দলবেঁধে এলাকায় মিছিল করছে। তারা ভোটারদের এই বলে হুমকি দিচ্ছে যে, মেয়র রফিককে ভোট না দিলে তাদের এলাকাছাড়া করা হবে। বসতভিটা দখল করে নেওয়া হবে। বিশেষ করে সন্ত্রাসীদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে এলাকার সংখ্যালঘু পরিবারের ৩ হাজার ভোটার। তাদেরকে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, মেয়র রফিককে ভোট না দিলে পরিণতি ভয়াবহ হবে।
এলাকার ভোটার পরিমল সাহা আতঙ্কিত কণ্ঠে এ প্রতিবেদককে জানান, মেয়র রফিকের পুরো পরিবার একটি সন্ত্রাসী পরিবার। ভয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ কখনও প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। দীর্ঘ ১০/১৫ বছরে রফিক ও তার ভাইয়েরা এলাকার নিরীহ মানুষের জমিজমা, ভিটেমাটি দখল করে ভূমিদস্যুদের কাছে বিক্রি করে দিয়ে আজ কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মজিবর মিয়া জানান, একসময় মেয়র রফিকের পরিবারের কিছুই ছিল না। রফিকের বাবা মৃত হারুন একজন সাধারণ শ্রমিক ছিলেন। বাবার দেখানো পথে তাঁত কারখানায় কাজ করে ভাত জুটত রফিকুল ও শফিকুল ওরফে শফি পরিবারের।
শ্রমিক থাকা অবস্থায় স্থানীয় শ্রমিক নেতা মোক্তার দেওয়ানকে প্রকাশ্যে দিনেদুপুরে কুপিয়ে হত্যা করে আলোচনায় আসে রফিক। এরপর নিজেই হয়ে যায় শ্রমিক নেতা। রফিক ছোটবেলা থেকে হিংস্র প্রকৃতির পাশাপাশি টাউট প্রকৃতির একজন মানুষ। শ্রমিক নেতা হওয়ার পর সে শ্রমিকদের দিয়ে বিভিন্ন নেতার জনসভায় ভাড়ায় লোক পাঠাত। এ সময় বিভিন্ন নেতার সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে রফিকের। একসময় নেতাদের আশীর্বাদে কাঞ্চন পৌরসভা আওয়ামী যুবলীগের সভাপতির পদটি বাগিয়ে নেন। এরপরই বড় অপরাধ জগতের পথে হাঁটতে থাকেন রফিক। এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে নিজস্ব একটি বলয় গড়ে তোলেন। বখাটেদের নিয়ে গড়ে তোলেন একটি অস্ত্রধারী গ্রুপ। যাদের কাজই ছিল বিভিন্ন এলাকায় টহল দিয়ে নিরীহ মানুষদের তুলে এনে ভয়ভীতি দেখানো ও নির্যাতন চালানো। এলাকায় রফিক ও শফিকুলের রয়েছে একাধিক টর্চার সেল। মিলকারখানা থেকে চাঁদা ওঠানো, নামমাত্র মূল্যে জমি কেনা, বড় বড় শিল্প গ্রুপের পক্ষে ভাড়ায় লোকজন খাটানো- এসব পথেই মোটা অঙ্কের টাকা কামিয়েছে রফিক। তাদের আরেক ভাই দেশের শীর্ষ ক্যাসিনো জুয়াড়ি তারিকুল ইসলাম মোঘল। দুবাইয়ের ক্যাসিনো পাড়ায় এক নামে তাকে চেনেন ক্যাসিনো ব্যবসায়ীরা। নর্তকীর নাচের তালে তালে লাখ লাখ দিরহাম ছুড়ে আনন্দ উল্লাস করে এই ক্যাসিনো জুয়াড়ি তারিকুল মোঘল। বর্তমানে দেশের এক শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের ৪২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এরপরেই সে দেশ থেকে পালিয়ে যায়। তবে পালিয়ে গেলেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে রূপগঞ্জের অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন মোঘল। তার ভাই রফিককে মেয়র পদে পুনরায় নির্বাচিত করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তার নিজেরও রয়েছে আলাদা একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। এই বাহিনীর কাছেও দীর্ঘদিন জিম্মি হয়ে আছে কাঞ্চন তথা তার আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষ।
মোঘল, রফিক ও শফির বিরুদ্ধে এলাকার সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, তিনজনই এতটা দুর্ধর্ষ যে দিনেদুপুরে যে কাউকে গুলি করতে একটুকুও দ্বিধাবোধ করে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, শ্রমিক নেতা মোক্তারকে হত্যার পর ২০১০ সালে শফির বাহিনী কাঞ্চন টোল প্লাজার সামনে ডাকাতি করতে গিয়ে এক ট্রাক ড্রাইভারকে গুলি করে হত্যা করে। ২০১২ সালে শফি-খোকনের নেতৃত্বে কাঞ্চন পৌর মহিলা লীগের সভাপতি সামসুন্নাহার নীলার ছেলে ও ছাত্রলীগ নেতা রাসেলকে বাড়ির ভেতরে মায়ের সামনে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ২০১৪ সালে কাঞ্চন পৌর নির্বাচনে প্রার্থী হয় রফিকুল ইসলাম। নির্বাচনের দিন পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের তারৈল এলাকায় প্রতিপক্ষ প্রার্থী দেওয়ান আবুল বাশার বাদশার এক কর্মীকে ভোটকেন্দ্রের সামনেই হত্যা করে শফি। যে কারণে ওই নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটে রফিকের। এরপরেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের তেলবাজি শুরু করে রফিক। নানা কারণে স্থানীয় কিছু আওয়ামী লীগ নেতাও তাকে শেল্টার দিতে শুরু করে। আওয়ামী লীগের ওপর ভর করে ২০১৯ সালে পৌর মেয়র নির্বাচিত হয় সে। এর পরপরই বেড়ে যায় রফিক, মোঘল ও শফি বাহিনীর অপকর্ম। তারা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জমি দখল, পণ্যবাহী ট্রাক আর শীতলক্ষ্যা নদীতে চলাচলরত জাহাজ ও বালুবাহী বাল্কহেডে চাঁদাবাজি, নদীর মাটি কাটা, কৃষকের জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি, বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠান আর বালি ভরাটের ড্রেজারে চাঁদাবাজি, পাইন চুরি, মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসা করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়ে যায় তিনজনই। নিজেরাই গড়ে তোলে পূর্বাচল হোম টাউন নামে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠান। তাদের এমন নজিরবিহীন অপকর্মের হাত থেকে বাঁচতে বর্তমান নির্বাচনে কাঞ্চন পৌরসভার ভোটাররা রফিককে প্রত্যাখ্যান করে সাবেক মেয়র দেওয়ান আবুল বাশার বাদশার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ভোটারদের মনোভাব বুঝতে পেরে নির্বাচন বানচাল করতে উঠেপড়ে লেগেছে শফি-খোকন বাহিনী। তারা প্রতিদিন বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করার পাশাপাশি সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে পৌর এলাকায় মোটরসাইকেল মহড়া দিচ্ছে। ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে রফিককে ভোট দেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে। এরই মধ্যে ভোট দিতে অস্বীকার করায় পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের রানীপুরা এলাকায় বাদশার সমর্থক মোক্তার হোসেনকে প্রকাশ্যে গুলি করে শফি। তা ছাড়া ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কলাতলী এলাকায় মেয়র প্রার্থী বাদশার ভাতিজা দেওয়ান বাবুলসহ ৮ জনকে কুপিয়ে জখম করে এই সন্ত্রাসী বাহিনী।
বর্তমানে কাঞ্চন পৌর নির্বাচনে ভোটারদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শফি-খোকন বাহিনী। তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাখা না হলে নির্বাচন প্রভাবিত হবে বলে আশঙ্কা সাধারণ ভোটারদের।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (গ-সার্কেল) হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, নির্বাচনে যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সক্রিয় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর অভিযুক্ত উভয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। তাদের পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।