মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৪ ০৯:৩৫ এএম
আপডেট : ২১ জুন ২০২৪ ১০:৪৩ এএম
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পূর্ব ইচলীতে বালুর বাঁধ নির্মাণ করে পাঁচটি গ্রাম রক্ষার চেষ্টা করছে এলাকাবাসী। প্রবা ফটো
উজানের পাহাড়ি ঢলে স্রোতস্বিনী হয়ে উঠেছে তিস্তা নদী। এতে ভয় ও আতঙ্ক বাড়ছে নদীপারের মানুষজনের। এবারও বালুর বাঁধ মেরামত করে গ্রাম, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে গঙ্গাচড়ার পাঁচ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ। উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের মানুষজনের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে নির্মাণ করা হয়েছিল এই বাঁধ। নির্বাচন এলেই তিস্তার বামতীরে বাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দেন জনপ্রতিনিধিরা। কিন্তু এবারের বর্ষায়ও সেই কাঙ্ক্ষিত বাঁধ পায়নি এলাকাবাসী। তাই নদীভাঙন ও বন্যার মধ্যে স্বেচ্ছাশ্রমে গড়ে তোলা ওই বালুর বাঁধই শেষ ভরসা তাদের।
উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর তীব্র স্রোত ধেয়ে এলে ২০১৭ সালে গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের ভেতর থেকে তিস্তা নদীর নতুন শাখাও তৈরি হয় ওই বছর। ফলে ঘরবাড়ি, ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ অবস্থায় তিস্তা নদীর এসব প্রবাহ বন্ধে ২০১৮ সালে মহিপুর শেখ হাসিনা সেতু-সংলগ্ন চর শংকরদহ থেকে লালমনিরহাট কাকিনার রুদ্রেশ্বর গ্রাম পর্যন্ত স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ৬ কিলোমিটার বালুর বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে ২০১৯ সালে তিস্তা নদী এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমে যায়। তবে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তার তীব্র স্রোতে পূর্ব ইচলীতে বালুর বাঁধ ভেঙে যায়। এতে শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। তিস্তার পানিতে ডুবে যায় ফসলি ক্ষেত, রাস্তাঘাট। আকস্মিক সেই বন্যায় লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পূর্ব ইচলী গ্রামের বৃদ্ধা নয়া মিয়া ভেসে যান পানির তোড়ে। এরপর তার লাশ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পরবর্তী সময় গ্রামবাসীরা আবারও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাঁধটি মেরামত করে। কিন্তু গত বছর তিস্তার পানির তোড়ে আবারও পূর্ব ইচলীতে বাঁধ ভেঙে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে ঘরবাড়িসহ পাকা ও আধা পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ বছরও তিস্তা নদী থেকে বালু তুলে স্বেচ্ছাশ্রমের বাঁধ নির্মাণ করে এলাকাবাসী। ফলে রক্ষা পায় চর পূর্ব ইচলী, চর জয়রামওঝা, ইশোরকোল, চর চল্লিশসাল, চর শংকদহের সহস্রাধিক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি।
সরেজমিনে দেখা যায়, চলতি বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে শংকরদহ থেকে পূর্ব ইচলী গ্রামের কিছু এলাকায় বাঁধের ক্ষতি হয়েছিল। এলাকাবাসী বালু ফেলে সেই বাঁধ উঁচু করার পাশাপাশি পূর্ব ইচলীতে ভাঙনের শিকার বাঁধটিও মেরামত করছে। শ্যালোমেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে বালু ফেলে উঁচু করা হচ্ছে বাঁধটি। তিস্তা নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় চরের পুকুরে বাঁশ ও জাল দিয়ে ঘেরা দিচ্ছিল এলাকার মৎস্যচাষিরা। সেই সঙ্গে পাকা বোরো ধান ও পাট কেটে ঘরে তুলছে কৃষকরা।
শংকরদহ এলাকার কৃষাণি আমিনা বেগম (৬২) বলেন, ‘তিস্তা নদীত পানি বাড়তোছে। সকাল করি ঘরের ভেতরোত পানি সোন্দায়, আর বিকাল হইতে পানি কমি যায়। নদীত যে স্রোত যে কোনো সমায় হামার ঘরবাড়ি পানিত ডুবি যাইতে পারে। সেই জন্তে বাঁধের উপরোত একটা ছাপড়া তুলছি। পানি বাড়লে ওটে গরু-ছাগল নিয়া থাকমো।’
পূর্ব ইচলীর রঞ্জন বর্মন (৪৭) বলেন, ‘লেটে বোরো ধান লাগাইছিনু। কাটি ঘরোত তুলছি। বাঁধের কোন কোন ইস্টিশন নাই। যে কোনো সময় ভাঙ্গি যাবার পায়। পাটগুলাও কাটি নেমো। সরকার একটা বাঁধ দিলে হামার অনেক উপকার হইল হয়। সবাই ভোটের আগোত কয় বাঁধ দেমো, কিন্তু ভোট শ্যাষ হইলে কায়ো আর খোঁজ রাখে না।’
পূর্ব ইচলীর খোকন সরকার (২৫) বলেন, ‘গ্রামের ভেঙে যাওয়া বাঁধ এবারও আমরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মেরামত করেছি। এই বাঁধ না থাকলে আমাদের ৫ থেকে ৬টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের ক্ষতি হবে। তিস্তার পানিতে আমাদের ফসলের ক্ষেত ও ঘরবাড়ি ভেসে যাবে। আমরা চাই এখানে স্থায়ী বাঁধ দেওয়া হোক।’
একই গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এই বাঁধ ভাঙ্গি তিস্তার পানি ঢুকি পড়ায় কয়েক বছর আগোত নয়া মিয়া নামের এক মানুষ ভাসি গেইছে। পরে তার লাশও পাওয়া যায় নাই। এই বাঁধ হামার সউগ কিছু টিকায় রাখছে। হামরা চাই এটে দ্রুত বাঁধ দেওয়া হোক।’
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, ‘প্রতি বছর তিস্তার বন্যা ও নদীভাঙনে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তার চেয়েও কম টাকা ব্যয় করে বিনবিনা থেকে মহিপুর শেখ হাসিনা সেতু পর্যন্ত সরকার একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে পারবে। আমরা দীর্ঘদিন এ দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এতে করে আমার ইউনিয়নের মানুষজন প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার হচ্ছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। আমি নিজে অর্থায়ন করে শংকরদহ থেকে রুদ্রেশ্বর পর্যন্ত বালুর বাঁধ নির্মাণ করেছি।’
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তিস্তার নদী নিয়ে বড় ধরনের কাজ চলমান নেই। তবে বন্যা ও নদীভাঙন থেকে রক্ষায় আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। যেখানে ভাঙন দেখা যাচ্ছে, আমরা সেখানে কাজ করছি।’