গাঁয়ে গাঁয়ে রেমালের ক্ষত
আমানত উল্যাহ, কমলনগর (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৪ ১১:১১ এএম
ঘুর্ণিঝড় রেমালে ভেঙ্গে পড়ে বসতঘর। ছবি : সংগৃহীত
ঘূর্ণিঝড় রেমাল তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার মেঘনা নদীর উপকূলীয় এলাকায়। কমলনগর উপজেলার চরফলকন ইউনিয়নের মাতব্বরহাট এলাকার বাসিন্দা ৬৫ বছরের বৃদ্ধা বিবি কহিনূর। ছেলে, ছেলের বৌ, মেয়ে ও নাতিসহ পাঁচজন মিলে যে ঘরে থাকতেন, সেই ঘরটি লন্ডভন্ড করে দিয়েছে ঘূর্ণিঝড় রেমাল। ফলে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে পরিবারটি। শূন্য ভিটায় এখন কোনো রকমে অস্থায়ীভাবে দুটো টিন দিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছেন। কিন্তু ঘর তৈরি করার মতো সামর্থ্য নেই এ পরিবারটির।
একই এলাকার গৃহবধূ শামসুন নাহারের ঘরটিও ভেঙে লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেছে রেমাল। সে ঘরটি তিনি ধারদেনা করে মেরামত করে নিচ্ছেন। কারণ ঘরে থাকা বিবাহ উপযুক্ত দুই মেয়েকে নিয়ে তো অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই ঘরের খুব কাছে নদী থাকায় জোয়ারের পানি থেকে রক্ষা পেতে ঘরের নিচের অংশে মাচা তৈরি করে সংস্কার করে নিচ্ছেন তিনি। একই বাড়ির মো. জাহাঙ্গীরের ঘরটিও লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। একাংশ মেরামত করে কোনো রকম বসবাস করছেন, বাকি অংশ মেরামতের মতো অর্থ তার কাছে নেই।
ওই বাড়ির এক বিধবা নারীর বসতভিটাসহ ঘরটি নদীতে তলিয়ে গেছে। তিনি এখন আশ্রয়হীন হয়ে বাড়ি ছেড়েছেন। কারণ বসতভিটা যে স্থানে ছিল, ওই স্থানটি এখন উত্তাল নদীর অংশ।
কমলনগর উপজেলার মাতাব্বরহাট, লুধুয়া, নবীগঞ্জ, সাহেবেরহাট, নাছিরগঞ্জ, পাটারীরহাট ও মতিরহাট এবং রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার, বাংলাবাজার, জনতাবাজার, আসলপাড়া, চররমিজ, চরআলগী, বড়খেরী ও চরগাজী ইউনিয়নের মেঘনা নদীর তীরসংলগ্ন এসব এলাকার বাসিন্দাদের অধিকাংশই ঘর হারিয়েছে ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাব ও মেঘনা নদীর সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে। মেঘনা নদীর তীরবর্তী হওয়ায় বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত নদীভাঙন ও অতিরিক্ত জোয়ারে ক্ষতির মধ্যে বসবাস করছেন। নদীর সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস কারও বসতভিটাসহ ঘর কেড়ে নিয়েছে, কারও বসতঘর ভাসিয়ে নিয়েছে। আবার কারও ঘর ভেঙে দিয়েছে। এদের মাঝে নেই কোনো ঈদের আনন্দও।
এসব পরিবারের কারও মনে এখন ঈদের আনন্দের খবর নেই। সবাই ব্যস্ত নিজ নিজ বাড়িঘর ও বসতভিটা তৈরি নিয়ে। টেনশনে দিনাতিপাত করছেন সবাই।
রামগতি ও কমলনগর উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রামগতি উপজেলাতে ২৫৩টি বসতঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ৮৪টি। কমলনগরে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৪৫টি, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৮০টি।
ঘূর্ণিঝড় রেমালে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এদের অনেকেই কৃষক কিংবা জেলে। প্রতিনিয়ত এরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য পড়ে সর্বহারা হচ্ছেন। যাদের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা, তাদের পক্ষে এসব দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। আর ক্ষতিগ্রস্ত এসব বাসিন্দার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সহযোগিতা করা হয়নি।
জনপ্রতিনিধিরা কোনো কোনো এলাকা পরিদর্শন করে গেলেও সহযোগিতার আশ্বাস দেননি। আর অর্থকড়ি না থাকায় নতুন বসতি স্থাপন বা ঘর মেরামতের উদ্যোগ নিতে পারছেন না উপকূলের ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারছেন না তারা।
যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ আসেনি, তাই সহায়তা করা যাচ্ছে না।
কমলনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা পরিতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ আমজাদ হোসেন বলেন, এ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা আমরা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে প্রেরণ করেছি। বরাদ্দ এলে দেওয়া হবে।