সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৪ ১১:১২ এএম
আপডেট : ১৩ জুন ২০২৪ ১২:২৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
চট্টগ্রাম উত্তরের সাত উপজেলা পরিষদে নির্বাচন শেষ হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতবিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগই। এর বাইরে কিছু ব্যবসায়ী ও সুধীজন নির্বাচনে অংশ নেন। তবে প্রায় সবকটি উপজেলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নিজ দল ও অঙ্গসংগঠনের প্রার্থীদের হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন। ফলে বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থী-সমর্থকদের মধ্যে সম্পর্কে ‘টানাপড়েন’ দেখা দিয়েছে। এমনকি একাধিক উপজেলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি এবং দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলার আওতাধীন মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি উপজেলায় ইতোমধ্যে নির্বাচন শেষ হয়েছে। এই সাত উপজেলার মধ্যে রাউজান উপজেলায় চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের তিনটি পদেই একক প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচন হয়নি। রাঙ্গুনিয়া উপজেলায়ও চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থীর কারণে শুধু ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাকি পাঁচ উপজেলায় নির্বাচন শেষে আওয়ামী লীগের ভেতরকার দ্বন্দ্ব সামনে আসছে।
মিরসরাই : গত ৮ মে অনুষ্ঠিত মিরসরাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমানকে হারিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন একই কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এনায়েত হোসেন নয়ন। রাজনীতির মাঠে তারা দুজন গুরু-শিষ্য হিসেবে পরিচিত।
শেখ আতাউর রহমান প্রবীণ রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের আস্থাভাজন। তবে স্থানীয়দের তথ্য মতে, নির্বাচনে শেখ আতাউর রহমান পরাজিত হওয়ার মূল কারণ মোশাররফ হোসেনের ছেলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মাহবুব উর রহমান।
তার পছন্দের প্রার্থী এনায়েত হোসেন নয়ন। ছেলের পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে মোশাররফ হোসেন কৌশলী ভূমিকা নেওয়ায় শেখ আতাউর রহমান পরাজিত হয়েছেন। ফলে মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা আতাউর রহমান নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর থেকে মিরসরাই রাজনীতিতে নতুন করে গ্রুপিং শুরু হয়েছে।
সীতাকুণ্ড : সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আরিফুল আলম চৌধুরী রাজু। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য মহীউদ্দীন আহমেদ মঞ্জুকে হারিয়ে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। প্রচারণা চলাকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য এসএম আল মামুন সীতাকুণ্ডের সব উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে ডেকে নগরীর একটি ক্লাবে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে আরিফুলের পক্ষে কাজ করার জন্য এমপি মামুন সবাইকে নির্দেশনা দেন বলে অভিযোগ তুলেছিলেন মঞ্জু। স্থানীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনে রাজুর পক্ষ থাকায় মঞ্জু কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং নির্বাচনে পরাজিত হয়। এরপর থেকে সীতাকুণ্ড আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দিয়েছে।
সন্দ্বীপ : সন্দ্বীপে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। বর্তমান সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা দ্বিতীয় দফা মনোনয়ন পেলে তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি জামাল উদ্দিন চৌধুরী। নির্বাচনে উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটির প্রায় সবাই মিতার পক্ষে থাকলেও ৮০-৯০-এর দশকে সন্দ্বীপের মাঠে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরা প্রায় সবাই জামাল উদ্দিনের পক্ষে ছিলেন। তবে জাতীয় নির্বাচনে ডাক্তার জামাল পরাজিত হওয়ার পর অনেকটাই চুপচাপ আছেন তারা।
এর মধ্যে উপজেলা নির্বাচনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাইন উদ্দিন মিশনকে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম আনোয়ার হোসেন। দুজনই মিতার বলয়ের নেতা হিসেবে পরিচিত। তবে উপজেলা নির্বাচনে মিশন এমপি মিতার সমর্থন পাননি বলে প্রচার রয়েছে। এরপর থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিশনের সঙ্গে সংসদ সদস্য মিতার মুখ দেখাদেখি অনেকটা বন্ধ। সর্বশেষ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাতেও নির্বাচনে সহকর্মীদের বৈরী আচরণ নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন মিশন। এর মাধ্যমে সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে।
ফটিকছড়ি : ফটিকছড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য বখতিয়ার সাঈদ ইরানকে হারিয়ে নির্বাচিত হন ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন মুহুরী। নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী ইরানের পক্ষ ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনি। এমপি বলয়ে না থেকেও নির্বাচনে জয় পেয়েছেন নাজিম উদ্দিন মুহুরী। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ এমপি সনির বিরোধিতা করে। এবার উপজেলা নির্বাচনের পর আরেক দফা গ্রুপিং হওয়ায় এই উপজেলায় আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব-বিভেদ এখন অনেকটাই প্রকাশ্য।
হাটহাজারী : হাটহাজারী উপজেলায় বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। টানা চতুর্থবার তিনি জোটের কারণে আওয়ামী লীগের কাঁধে ভর করে এ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে হাটহাজারীতে আওয়ামী লীগ অনেকটাই কোণঠাসা। তবে উপজেলা চেয়ারম্যানের পদটি ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সব সময় তৎপর থাকেন। কিন্তু এবারের উপজেলা নির্বাচনে হাটহাজারীতে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
নির্বাচনে বর্তমান চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবলীগের সভাপতি এসএম রাশেদুল আলমকে হারিয়ে এবার নির্বাচিত হয়েছেন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ইউনুছ গনি চৌধুরী। এ দুজন ছাড়াও নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হাসান চৌধুরী। তিনজনই হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনের পর থেকে হাটহাজারী আওয়ামী লীগ এখন তিন ভাগে বিভক্ত।
তবে আওয়ামী লীগ যেহেতু বড় দল সেহেতু গ্রুপিং থাকতেই পারে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আবার ঠিকও হয়ে যায় বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ সালাম। তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাচনে যেহেতু দলীয় প্রতীক ছিল না তাই অনেকেই প্রার্থী হয়েছেন। দল সবাইকে নির্বাচনের সুযোগ দিয়েছে। এ কারণে তৃণমূলে নেতাকর্মীদের মধ্যে একটু বিভাজন তৈরি হয়েছে। তবে সেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার ঠিক হয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে জেলা ও উপজেলা কমিটির সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল, তখন বলেছিলাম- নির্বাচনে যেহেতু দলীয় প্রতীক থাকবে না। তাই যাচাইবাছাই করে অন্তত একজনকে দলের সমর্থন দেওয়ার জন্য। নানা কারণে তা হয়নি। তবে আগামী দুই বছর পর দেশজুড়ে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। সেখানে দলের একটা গাইডলাইন থাকাটা জরুরি। নয়তো দলের জন্য ক্ষতি হবে। বিষয়টি ভাবা জরুরি।’