সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র
শরীফুজ্জামান ফাহিম, সাভার (ঢাকা)
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৪ ১২:০১ পিএম
আপডেট : ১২ জুন ২০২৪ ১৬:২২ পিএম
শয্যা আছে, সেবা নেই সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আইসিইউ ইউনিটে। প্রবা ফটো
জার্মানিতে পিএইচডি করতে গিয়ে বৈশ্বিক মহামারি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ঘটেছিল গবেষক সাবরিনা কামাল তন্বীর। যে টাকা দিয়ে তার চিকিৎসা করানোর কথা ভাবা হয়েছিল, সেই টাকা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার না করে দরিদ্রদের চিকিৎসায় ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেন তন্বীর মা ঢাকা কলেজের ইতিহাস বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাসরিন বেগম। এ লক্ষ্যে সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৫ শয্যাবিশিষ্ট নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) চালু করতে ওই পরিবারের পক্ষ থেকে ৫০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়।
কিন্তু অনুদান নিলেও হাসপাতালটিতে কোনো আইসিইউ চালু করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। কর্তৃপক্ষ বলছেন, হাসপাতালটিতে আইসিইউ-এর চাহিদা থাকলেও নানা কারণে তা চালু করা যাচ্ছে না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘সাবরিনা কামাল তন্বী নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র’ নামে আইসিইউ কেন্দ্র নামকরণের শর্তে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালকে ৫০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এটি স্থাপনের জন্যে তন্বীর মা নাসরীন বেগম এবি ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ২টি চেকে ২৫ লাখ করে মোট ৫০ লাখ টাকা দেন। তৎকালীন সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান সমন্বয়ক মঞ্জুর কাদির ওই ৫০ লাখ টাকা উত্তোলন করে ‘সাবরিনা কামাল তন্বী নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র’ স্থাপনের ব্যবস্থা নেন।

পরে ২০২১ সালের ২৯ অক্টোবর তৎকালীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ কেন্দ্রটির উদ্বোধনও করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেখানে আর আলোর মুখ দেখেনি সাবরিনা কামাল তন্বী নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রটি। এ পর্যন্ত সেখানে একজন রোগীকেও চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রের কক্ষটিতে পাঁচটি শয্যা আর কিছু সরঞ্জাম থাকলেও হিসাব নেই অনুদানের ৫০ লাখ টাকার। কোথায়, কীভাবে সে টাকা খরচ হয়েছে তারও হিসাব নেই কর্তৃপক্ষের কাছে।
সরেজমিনে ‘সাবরিনা কামাল তন্বী নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র’
শনিবার (৮ জুন) সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ‘সাবরিনা কামাল তন্বী নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র’ নামে একটি কক্ষ থাকলেও সেখানে কোনো কার্যক্রম নেই। নেই কোনো চিকিৎসক কিংবা যান্ত্রিক ভেন্টিলেটর। পাঁচটি শয্যা আর দুটি কার্ডিয়াক মনিটর দেখা গেলেও পুরো আইসিইউজুড়ে রয়েছে কেবল কেমিক্যাল ড্রাম। কেন্দ্রটিতে ইন্ট্রাভেনাস লাইনের একটি ওয়েব, ফিডিং টিউবসহ নানা যন্ত্রপাতি থাকার কথা থাকলেও সেসবের কিছুই নেই সেখানে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, অনুদানের ৫০ লাখ টাকা কোথায় গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ডা. মঞ্জুর কাদির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকার সময় খেয়ালখুশিমতো কাজ করতেন। আইসিইউ-এর জন্য দেওয়া অনুদানের কী হয়েছে, সেটি উনিই ভালো জানেন। আইসিইউ সাভার গণস্বাস্থ্যে কখনও ছিল না, এখনও নেই। তবে ‘সাবরিনা কামাল তন্বী নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র’ নামের একটি কক্ষ রয়েছে।
অনুদানের টাকা দিয়ে কী করা হয়েছে, তা জানার জন্যে খোঁজ করেও কোনো নথি মেলেনি। হিসাব শাখা থেকে ডা. মঞ্জুর কাদিরের রিসিভ করা এবি ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ২টি চেকের মোট ৫০ লাখ টাকার চেকের ফটোকপি ও চুক্তিনামা পাওয়া গেলেও অন্য কোনো ডকুমেন্ট মেলেনি। খরচের কোনো ক্যাশমেমো কিংবা খরচের হিসাব কাছে নেই বলে জানান হিসাব কর্মকর্তা।
সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু তাহের বলেন, ‘ওই সময় ডা. মঞ্জুর কাদির প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। এটার সবকিছু তিনিই করেছেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী একটা হিসাব থাকার কথা। কিন্তু তেমন কিছু আসলে নেই।’ হিসাব না থাকার মানে তো কোনো টাকা খরচ করা হয়নি- প্রতিদিনের বাংলাদেশের এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘এই টাকার আসলে কী হয়েছে, সেটা তৎকালীন কর্মকর্তাই ভালো বলতে পারবেন।’
যোগাযোগ করা হলে ডা. মঞ্জুর কাদির আহম্মেদ বলেন, ‘আমি শুধু সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলাম। পরে কী হয়েছে বা অনুদানের টাকার কী হলো, সে বিষয়ে আমার আর কিছু জানা নেই। আমি জানি, সম্পূর্ণ টাকা ডায়ালাইসিস সেন্টারে আইসিইউ স্থাপনের জন্য অনুদান এসেছিল। সেখানে তা স্থাপন করা হয়েছিল। আমি ২০২৩ সালে কক্সবাজারে দায়িত্ব নিয়ে চলে এসেছি। পরে কী হয়েছে আমার জানা নেই।’ তিনি থাকা অবস্থায় কোনো রোগী কেন ভর্তি করা হয়নিÑ জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবরিনা কামাল তন্বীর মা অধ্যাপক নাসরিন বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি গরীব রোগীদের চিকিৎসার জন্য টাকাগুলো দিয়েছিলাম। কিন্ত কয়েকজন মিলে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। আমি তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ডা. মঞ্জুর কাদির আহম্মেদকে অভিযুক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমি উদ্বোধনের দিনও তাদের সঙ্গে ডাক্তার নিয়োগের বিষয়ে কথা বলেছি। কিন্ত পরে জানতে পেরেছি, আইসিইউ-এর জন্য স্পেশাল কোনো ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ করা হয়নি। আমার টাকার অপব্যবহার করা হয়েছে।’