হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৪ ১১:৫২ এএম
আপডেট : ০৫ জুন ২০২৪ ১৬:২২ পিএম
ছোট ও মাঝারি সাইজের গরু বেশি লালন-পালন করার পরও দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারিরা। প্রবা ফটো
চট্টগ্রামের সিক্স’স র্যাঞ্চ অ্যাগ্রো খামারে ২০২৩ সালে ৬০টি বড় গরু লালন-পালন করা হয়। এবার এই সংখ্যা কমে হয়েছে ৩০টি। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে খামারটিতে অর্ধেকে নেমে এসেছে বড় গরুর সংখ্যা।
সিক্স’স র্যাঞ্চ অ্যাগ্রো খামার মালিক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ইমরান বলেন, ‘করোনার পর থেকে কোরবানিতে বড় গরুর চাহিদা কমতে শুরু করেছে। গত বছর বড় গরুগুলো বিক্রি করতে আমাদের বেগ পেতে হয়েছে। ছোট ও মাঝারি আকারের গরু দ্রুত বিক্রি হয়। কিন্তু বড় গরু বিক্রির জন্য কোরবানির আগের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল গত বছর। তাই এবার বড় গরু লালন-পালনের সংখ্যা কমিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবার কোরবানির জন্য আমরা ১২০টি গরু প্রস্তুত করেছি। এর মধ্যে বড় গরু আছে মাত্র ৩০টি। বাকি ৯০টিই ছোট ও মাঝারি আকারের।’
শুধু সিক্স’স র্যাঞ্চ খামার নয়, চট্টগ্রাম নগরীর অন্য খামারগুলোর একই অবস্থা। যেসব গরুর দাম ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার বেশি, এমন গরু পালন কমিয়েছেন খামারিরা। আর্থিক মন্দাসহ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ কোরবানিতে ব্যয়সংকোচন করছেন। আগে বড় গরু দেখলে যেমন কার আগে কে কিনবেÑ এই প্রতিযোগিতা থাকত; কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই প্রতিযোগিতা খুব একটা নেই। তাই বাজারে বড় গরুর চাহিদাও কম। এজন্য বড় গরু লালন-পালন কমিয়ে দিয়েছেন খামারিরা।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার চট্টগ্রামে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ কোরবানির পশুর চাহিদা ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৭৬৫। এই চাহিদার বিপরীতে কৃষক ও খামার পর্যায়ে কোরবানির পশু প্রস্তুত আছে ৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৯টি। এর মধ্যে ষাঁড়, বলদ ও গাভি মিলে প্রস্তুত আছে ৫ লাখ ২৬ হাজার ৪৭৫টি। যার প্রায় ৮০ শতাংশই ছোট ও মাঝারি আকারের বলে জানিয়েছেন খামারিরা। সিক্স’স র্যাঞ্চ অ্যাগ্রোর খামারে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ গরু ২ থেকে ৩ লাখ টাকা দামের। তবে খামারটিতে বেশ বড় সাইজের গরুও আছে কয়েকটি। এর মধ্যে রোলেক্স নামে একটি গরু আছে খামারে। ওই গরুটির দাম হাঁকানো হচ্ছে সাড়ে ১৪ লাখ টাকা। শাহেন শাহ নামে আরেকটি বড় গরু। যেটির দাম চাওয়া হচ্ছে ১২ লাখ টাকা। এছাড়া এ খামারে এক থেকে দেড় লাখ টাকা দামের গরুও আছে কয়েকটি।
ছোট ও মাঝারি সাইজের গরু বেশি লালন-পালন করার পরও দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারিরা। ভারত থেকে চোরাই পথে গরু আসার খবরে তাদের মধ্যে এই দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। খামারিরা জানিয়েছেন, গোখাদ্যের দাম বাড়ায় বাংলাদেশে গরু লালন-পালনে খরচ বেশি। অন্যদিকে ভারতে তুলনামূলক খরচ কম। ফলে ভারত থেকে চোরাই পথে গরু এলে বাজারে দাম কমে যায়। যে কারণে লোকসানে পড়েন খামারিরা। এভাবে লোকসানে পড়ে গত কয়েক বছর চট্টগ্রামে অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে বলে তারা জানান। শাহ আমানত অ্যাগ্রোর মালিক আক্তার হোসেন জেকি বলেন, ‘আমরা শুনেছি কোরবানিকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে ভারত ও মিয়ানমার থেকে প্রচুর গরু এসেছে। ভারত থেকে এলে বাজারে গরুর সরবরাহ বেড়ে যায়। তখন কোরবানিতে বিক্রি করতে না পারলে পরে অনেক কম দামে গরু বিক্রি করতে হয়। এতে লোকসান হয়। গত দুই বছরে চট্টগ্রামে অন্তত ১৫-২০টি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। ভারত থেকে গরু এলে এবারও লোকসানের মুখে পড়তে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বড় গরু পালনে খরচ বেশি, কিন্তু কোরবানিতে বিক্রি না হলে ওই গরু নিয়ে বড় ধরনের লোকসানে পড়তে হয়। তাই আমরাও বড় গরু পালন কমিয়ে দিয়েছি। গত বছর ৬০টি বড় গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেছিলাম। এবার করেছি মাত্র ৪০টি।’
এসএনএম অ্যাগ্রোর মালিক আব্দুল্লাহ আল মাছুম বলেন, ‘সারা বছর গরুর মাংস বিক্রি হয় ৮০০ টাকা দরে। কিন্তু কোরবানিতে বিক্রি হয় বেশি দামে, তখন এক কেজি মাংসের দাম পড়ে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। দাম বেশি পাওয়ার আশায় কোরবানির গরুগুলোকেও সেভাবে পরিচর্যা করা হয়। একটি বড় গরুর পেছনে দৈনিক শুধু খাবার খরচই পড়ে ১ হাজার টাকার বেশি। কিন্তু কোরবানিতে না হলে পরে অনেক কম দামে বিক্রি করতে হয়। এ কারণেও এখন অনেক খামারি বড় গরু লালন-পালন কমিয়ে দিয়েছেন।’